দিনের খবর শেষ পাতা

বর্ধিত সময়েও অনিয়ম অনুসন্ধানে ব্যর্থ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর ও বর্তমান নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমের দুর্নীতিসহ তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম অনুসন্ধানে গঠন করা হয়েছিল ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং (কারণ উদ্ঘাটন) কমিটি। কিন্তু চার মাস পর হলেও এ কমিটি কোনো রিপোর্ট দিতে পারেনি। বাকি কাজ সম্পন্ন করতে আরও এক মাস সময় চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। দুর্নীতি অনুসন্ধানে কর্মকর্তাদের গড়িমসি রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ‘অনিয়ম-দুর্নীতিতে’ ডুবতে বসার ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করার পাশাপাশি দায় নিরূপণ করতে কমিটি করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। ২০০২ সাল থেকে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেখভালের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়ও নিরূপণ করবে কমিটি। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর এমডি, প্রয়োজনে চেয়ারম্যান, সাবেক ডিজি এসকে সুর ও শাহ আলমকে জিজ্ঞাসাবাদও করেছে এ কমিটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর একেএম সাজেদুর রহমান খানকে সভাপতি ও বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মো. সারোয়ার হোসেনকে কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে। কমিটিতে সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক একেএম ফজলুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি ডিপার্টমেন্টের মহাব্যবস্থাপক মো. কবির আহাম্মদ ও ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ-৪-এর মহাব্যবস্থাপক মো. নুরুল আমীন। আর আদালত যে দুজনকে কমিটিতে যুক্ত করেছেন, তারা হলেন সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মহিদুল ইসলাম ও সাবেক সচিব নুরুর রহমান।

ওই তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড (বিআইএফসি), পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড। আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, এ তিনটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের সঙ্গে কমিটির কোনো সদস্য জড়িত থাকলে বা কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে সেই সদস্য দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন। তদন্তের প্রয়োজনে এই তিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট যে কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে কমিটি।

জানা গেছে, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ অন্তত পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার)। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এসব অর্থ লোপাটের তথ্য চাপা দিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিম। এসব অনিয়মের সহায়তা করতেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী ও নির্বাহী পরিচালক শাহ আলম। বিনিময়ে পেতেন আর্থিক সুবিধা। ঘুষের বিনিময়ে এসব অনিয়মে সহায়তা করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও কিছু কর্মকর্তা।

পিকে হালদারের অন্যতম সহযোগী ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রাশেদুল হকের আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। গত ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সিএমএম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন রাশেদুল হক।

আদালতে জবানবন্দিতে রাশেদুল হক বলেন, ‘আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম চাপা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন কর্মকর্তাদের পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা করে দিত রিলায়েন্স ফাইন্যান্স ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক শাহ আলমকে প্রতি মাসে দেয়া হতো দুই লাখ টাকা করে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম-দুর্নীতি ‘ম্যানেজ’ করতেন সাবেক ডেপুটি গভর্নর এসকে সুর চৌধুরী।’

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেন, ‘২০০২ সালের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে যারা এজিএম-ডিজিএম ছিলেন, তারা বসে বসে মধু খেতেন। তাই তারা চুপ থাকতেন।’

এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক শাহ আলমকে ‘চোর’ ও ‘ডাকাত’ বলেও উষ্মা প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আসা এসব অভিযোগে সমালোচনার ঝড় তোলেন অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা। এর পরই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টনক নড়ে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি পাঁচ সদস্যের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং (কারণ উদ্ঘাটন) কমিটি গঠন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কমিটি গঠনের তিন মাস পর নতুন করে এক মাস সময়ে চাওয়া হয়। অনুসন্ধানের সুবিধার্থে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছিল তদন্ত দলকে। কিন্তু অতিরিক্ত এক মাসসহ মোট চার মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। তদন্তে গড়িমসি চলছেÑএমন অভিযোগ করেছেন অনেকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের বেশিরভাগ কর্মী দক্ষতা ও সততার সঙ্গে কাজ করেন। দু-একজন কর্মকর্তার জন্য সবার বদনাম গ্রহণযোগ্য নয়। তাই যাদের বিরুদ্ধে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে, সঠিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কিন্তু আমরা দেখছি প্রথম থেকেই বিষয়টি নিয়ে গড়িমসি চলছে। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। এভাবে অনিয়মের অভিযোগ এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতে অন্য কর্মকর্তারাও অনিয়মে জড়িয়ে পড়বেন বলে তারা জানান।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, গড়িমসি নয়, চলমান লকডাউনের কারণে তদন্তে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে বলেন, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি এখনও প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। কারণ লকডাউনের মধ্যে ঠিকঠাকভাবে কাজ করতে পারেনি কমিটি। কাজ শেষ হলে শিগগির প্রতিবেদনটি প্রকাশ করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

এদিকে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের তদন্তে গড়িমসি আর্থিক খাতের জন্য উদ্বেগজনক বলে জানান অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টরা। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সুশাসন নিশ্চিত করতে দ্রুত দুর্নীতির তদন্ত শেষ করা দরকার। পাশাপাশি অভিযুক্তরা দায়ী থাকলে তাদের আইনের আওতায় এনে ব্যবস্থা নেয়া জরুরি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..