মত-বিশ্লেষণ

বলকান মুসলিম তাড়ানোর পথ খুলতেই ইমানুয়েল ম্যাখোঁর ভেটো

হামজা কারসিক: ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভেটো দিলেন। তার মানে ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্বের দেশগুলোতে বাস করা উল্লেখযোগ্য মুসলিমের ভবিষ্যৎ সমুদ্রের দিকে জোর করে ঠেলে দেওয়া হলো।

এ বিষয়ে সারাজেভোর এক অধ্যাপক বিশেষ মূল্যায়ন লিখেছেনÑ“আমি কয়েক ডজন মাস্টার্স গবেষণা নিয়ে বসলাম। এর সবই ইউরোপীয় ইউনিয়ন একত্রীকরণে বসনিয়ার পথকেই সমর্থন করে। যখন শিক্ষার্থীরা ইউরোপীয় ইউনিয়নে সদস্যপদের সুফল নিয়ে প্রশংসা করছেন এবং বসনিয়ার চ্যালেঞ্জ এগিয়ে যাচ্ছে বলে পুলকিত হচ্ছেন, তখন আমি খুব কষ্টেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদিচ্ছা দেখতে পাচ্ছি। ইমানুয়েল ম্যাখোঁ এখানে ‘না’ বলে দিলেন দুই সপ্তাহ আগে। ফলে উত্তর ম্যাসেডনিয়া ও আলবেনিয়ার খোলাখুলি আলাপে আসার দুয়ার বন্ধ হয়ে যায় এবং একই সঙ্গে এই অঞ্চল ঘিরে গভীর হতাশা পুঞ্জীভূত হয়। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের এই ভেটোয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের এমন এক সম্প্রসারণবাদ প্রতীকী রূপ লাভ করল, যা হওয়ার কথা ছিল না।”

ম্যাখোঁর ভেটোতে আসলে তিনটি বার্তা পরিষ্কার হলো প্রথমত, ভেটো দেওয়ার পেছনে যেসব দাফতরিক কারণ দেখানো হয়েছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্করণ ইস্যুটি যেমন নতুন নয়, তেমনি উত্তর ম্যাসেডনিয়া ও আলবেনিয়া সংযোজন আলোচ্যও এখানে ঝুলে থাকে না। ২০০৪ ও ২০০৭ সালের প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ছিল সম্প্রসারণকে সহজ করতে। ২০১৩ সালের ক্রোয়েশিয়ার সদস্যপদ, ২০১২ সালের মন্টেনেগ্রোর সংযোজন আলোচনার দুয়ার উম্মোচন এবং ২০১৪ সালের সাইবেরিয়ার ভেটো ক্ষমতা না দেওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনার ক্ষেত্রে দেশগুলোকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্করণে অনির্দিষ্ট ও অস্পষ্ট বলে অভিহিত করা হয়।

ম্যাখোঁর ভেটো দ্বিতীয় যে বার্তা দেয়, তাতে বোঝা যায় প্রো-ইইউ সংস্করণে কোনো ফায়দা আসেনি। ২০০৩ সালের থেসালনিকি সম্মেলনের পর থেকে জোরেশোরে একটি বক্তব্য ভেসে বেড়াচ্ছিল। তাতে বলা হতো, পশ্চিম বলকানের দেশগুলোকে যদি সদস্যপদ দেওয়া হয় তবে তাদের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। গত গ্রীষ্মে ম্যাসেডনিয়া ২৭ বছরের পুরোনো বিবাদ মীমাংসা করতে সক্ষম হয়েছে। বিবাদটি ছিল গ্রিসের সঙ্গে। তারা ন্যাটো ও ইইউতে যোগ দেওয়ার জন্য নাম পরিবর্তন করে নিল।

উত্তর ম্যাসেডনিয়ার সঙ্গে উম্মুক্ত সদস্যপদ লাভের আলোচনা প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে ম্যাখোঁ আসলে ইইউ’র দরকষাকষির সুযোগ রুদ্ধ করে দিলেন। ফলে এই অঞ্চলের বাকি অংশগুলোও সংস্করণের ফলে সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। এই সদস্যপদের তালিকা যতই ক্ষীণ হয়ে আসবে, পশ্চিম বলকানে ইইউ’র আর্থ-সাংস্কৃতিক ক্ষমতাও ক্ষয় হতে থাকবে। সার্বিয়া-কসোভো সমঝোতা কিংবা বসনিয়া সংস্করণের অগ্রগতিও গতি হারাচ্ছে। ইউক্রেন ও জর্জিয়ায় ইইউ’র আর্থ-সাংস্কৃতিক ক্ষমতার গতিহীনতা বেড়ে চলেছে। আঞ্চলিক রাজনীতিবিদদের কাছে ইউরোপিয়ান মানদণ্ডে ইউরোক্র্যাটসের প্রচারের যুগ কাক্সিক্ষত উপায়ে পরিসমাপ্তির দিকে আসছে।

এর তৃতীয় বার্তাটি এখন পর্যন্ত সব গবেষণাতেই অব্যক্ত রয়ে গেছে। আর এটা হলো বলকান মুসলিমদের বিতাড়িত করা। আলবেনিয়া ও উত্তর ম্যাসেডনিয়ার সদস্যপদ লাভের আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়েই সদস্যপদ প্রাপ্তির পথ উš§ুক্ত হয়েছিল। এভাবে একটি দশক অতিক্রম করল। কিন্তু সে পথ এখন যে একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেল, এটা যেকোনো সাধারণ হিসাবেই বলা চলে। এই সময়ানুক্রমের এখানেই পরিসমাপ্ত হলো।

বসনিয়া ও কসোভো এখন পিছিয়ে পড়ল। এমনকি আগের পশ্চাৎ দশা থেকেও তাদের অবস্থান এখন আরও পেছনে। তার মানে হলো, ইউরোপের দক্ষিণ-পূর্বে দেশগুলোতে বাস করা উল্লেখযোগ্য মুসলিমের ভবিষ্যৎ সমুদ্রের দিকে জোর করে ঠেলে দেওয়া হলো। তারা অতিশয় অন্ধকারের মধ্যে নিপতিত হবে। কার্যত এই ভেটো সেসব দেশকে ইইউ’র সদস্যপদ থামিয়ে দিল, যেসব দেশের রাজনৈতিক শক্তি মুসলিমরাই নিয়ন্ত্রণ করত।

এখানে আরও দুটি উদাহরণ মাথায় আসে। কেন্দ্রীয় ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর প্রবেশাধিকার ভেটো ছাড়াই এগিয়ে গেল, যেক্ষেত্রে ইইউ তাদের গোলপোস্ট তুরস্ক পর্যন্ত বিস্তৃত করেছে।

২০০৪ সালে তুর্কি সাইপ্রাসবাসীরা আন্নান পরিকল্পনা দ্বারা অতিমাত্রায় সমর্থিত। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশাধিকার প্রাপ্তিতে দ্বীপগুলোকে একত্রিত করার বাজি ধরেছিল। কিন্তু তারা এখনও একঘরে হয়ে রয়েছে, কেননা ইইউ তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এই ভেটো যদিও সরাসরি উত্তর ম্যাসেডনিয়া ও আলবেনিয়ার বিরুদ্ধে গেছে, তবুও তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে বসনিয়া ও কসভোর ওপর। অবশ্য এই সিদ্ধান্ত এক দিনের নয়। কয়েক বছর ধরেই বসনিয়ার মুসলিমদের বিপক্ষ করে তুলতে কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কোলিন্ডা গ্রাবার-কিতারোভিক এ কাজে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি বসনিয়ার মুসলিমদের কলঙ্কিত করার জন্য একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। তিনি এটা করেছিলেন মূলত তার রাজত্বের আইনি বৈধতাপ্রাপ্তির জন্য। গত মাসে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয় করলেন অস্ট্রিয়ান লেখক পেটার হ্যান্ডকে। তিনি বসনিয়ার গণহত্যাকে প্রবলভাবে অস্বীকার করা ব্যক্তি। সুইডিশ অ্যাকাডেমিকে খাটো করার জন্য সেøাবোদান মিলোসেভিকের পক্ষে যিনি ক্ষমা চেয়ে সাহায্য করেছেন, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

ভেটোর পরে ৯ নভেম্বরে দ্য ইকোনোমিস্টের সঙ্গে ম্যাখোঁর সাক্ষাৎকারটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে, কিন্তু বসনিয়াতে আরও বেশি অত্যাচার ছড়িয়ে পড়েছে। ম্যাখোঁ দাবি করেছেন, বসনিয়া ছিল একটি টাইমবোমা, যা প্রতিনিয়ত সংকেত দিচ্ছে…। জিহাদিদের ফিরে আসার সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাদের। ফলে এ ব্যাপারে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। অথচ বসনিয়ার ইসলামিক কমিউনিটির মুখপাত্র মুহাম্মাদ জুসিক জানিয়েছেন, ‘৩০০ জনের মতো কিছু বসনিয়ান নাগরিক সিরিয়া ও ইরাকের যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়েছিল। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল নারী ও শিশু। অথচ সেই তুলনায় ফরাসিদের মধ্য থেকে এসব যুদ্ধে অংশ নিয়েছে এক হাজার ৯০০ জন।’

ম্যাখোঁর এই ভেটো গভীরভাবে ত্রুটিযুক্ত। একেবারেই ধারণা বা সন্দেহনির্ভর ভিত্তিহীন দাবিতে তিনি ভেটো দিয়েছেন। ফলে পশ্চিম বলকান ও তার পেছনের এলাকাটিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুবিধাদি যাচ্ছেতাইভাবে নয়-ছয় করা হয়েছে। যদিও বলকান অঞ্চলগুলোতে শান্তির সুফলা তরী নোঙর করেছিল, তবুও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁর এমন আচরণে অঞ্চলটিতে শিগগিরই অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার পূর্বাভাস সৃষ্টি করা হলো। এমনকি ভেটো-পরবর্তীকালে তিনি যে ব্যাখ্যা দিলেন, তা কেবল ঝুঁকিকে আরও ত্বরান্বিত করে এবং ধ্বংসযোগ্য সংগঠিতও হয়ে গেল। ‘মানি না’ বা অস্বীকৃতি প্রস্তাবের ভেতর দিয়ে তিনি যে হামলাটি চালিয়েছেন, তাতে খুব সহজেই এই পশ্চিম বলকান অঞ্চলের গতিবেগ ও আঞ্চলিক চাঞ্চল্য থামিয়ে দিতে তিনি সক্ষম হলেন।

সহযোগী অধ্যাপক, পলিটিক্যাল সায়েন্স অনুষদ ইউনিভার্সিটি অব সারাজেভো

ডেইলি আল সাবাহ থেকে ভাষান্তর

মিজানুর রহমান শেলী

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..