মত-বিশ্লেষণ

বহমান বর্ণবাদের দক্ষিণ আফ্রিকা

মঞ্চে উঠে দৃষ্টিটা ছড়িয়ে দিয়েছিলাম সামনে। সবাই উম্মুখ হয়ে আছে ‘নাদিম গর্ডিমার স্মারক বক্তৃতা’ শোনার জন্য। বছর তিনেক আগে কেপটাউনে যাওয়া ওই লক্ষ্যেই। অবশ্য একই সঙ্গে ‘মানব সক্ষমতা ও উন্নয়ন পর্ষদের’ বার্ষিক সভায় আমন্ত্রিত হয়েছিলাম ‘মাহবুবুল হক স্মারক ভাষণ’ দেয়ার জন্যও। সে বছর ওই পর্ষদের বার্ষিক সভারও স্থান ছিল কেপটাউন।

‘নাদিন গর্ডিমার স্মারক বক্তৃতা’র স্থান ছিল ১৫০ বছরের পুরোনো কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরাট মিলনায়তন। ওপরে মাঝারি আকারের দু’সারি ঝাড়বাতি, মধ্যিখানেরটি বিশালাকৃতি। নিচে ৭০০ আসন, ওপরে অর্ধ চন্দ্রাকৃতি বেষ্টনীর মধ্যে আরও ৩০০ আসন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবিদ্বেষকালে ওই বেষ্টনীর মধ্যে বসত কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী। নিচের মূল আসন বসার অধিকার ছিল শুধু শ্বেতাঙ্গদের। কত বছর আগের কথা? বেশিদিনের নয়Ñবড় জোর বছর তিরিশেক আগের কথা।

মিলনায়তন উপচে পড়েছিল লোকে। উদ্যোক্তারা বলেছিলেন হাজারের বেশি লোক। কাছাকাছি তিনটে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা এসেছিলÑতার মধ্যে দুটো দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষার্থীদের জন্য। দলে দলে এসেছিল তারা‘একবিংশ শতাব্দীর দক্ষিণ আফ্রিকা’ কেমন হবে, তার রূপরেখা তারা জানতে চায়। এসেছিলেন রাজনীতিবিদরা, উন্নয়নকর্মী, শিক্ষকরা, সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি সংস্থার লোকজন, প্রচারমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। কে নেই সেখানে সবাই উম্মুখ হয়েছিলেন ২০১৭ সালের নাদিম গর্ডিমার স্মারক বক্তৃতা শোনার জন্য।

‘মাতিয়ে দেবে, বুঝেছ’বলেছিলেন কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ম্যাক্স প্রাইস। প্রায় চল্লিশ বছর আগে সতীর্থ ছিলাম আমরা কানাডার ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। বক্তৃতার আগের রাতে ওর বাড়িতে নৈশভোজের আমন্ত্রণ ছিল। সেখানেই তার ওই ‘মাতিয়ে দেয়ার’ উস্কানি। আমি হেসে ফেলেছিলাম। ‘মাতিয়ে দেব কি? আমি কি চটুল গানের গায়ক না কি’? ‘তাতিয়ে দেবে’, দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের অন্যতম নেতা ম্যাক্স প্রাইস আমাকে তাতানোর চেষ্টা করেছিলেন। ‘না পারলে ঠেঙ্গিয়ে দেবো’। তা আমাকে ঠ্যাঙানোর কথা ম্যাক্স বলতেই পারেন।

বলার শুরুতেই তাই এই বিশাল দর্শক-শ্রোতার দিকে দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়েছিলাম। সামনের সারিগুলোতে বসেছিলেন ধনাঢ্য ক্ষমতাবান মানুষরা যাদের পোশাকের চাকচিক্য আর চেহারার চেকনাই দেখলেই বোঝা যায়। তার মধ্যে শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গ দুই-ই ছিলেন। তারপর অন্যরা। বেষ্টনীঘেরা সারিগুলোয় সবাই প্রায় কৃষ্ণাঙ্গ। মনটা আমার কেমন করে উঠেছিল। তাহলে দক্ষিণ আফ্রিকায় বদলালোটা কী?

বদলেছে অনেক কিছু তবে ভালোর দিকে নয়, মন্দের দিকে। চূড়ান্ত অসমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের একটা অংশ রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। সাধারণ কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। দুর্নীতি, লুটপাট ও শোষণের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে সমাজ ডুবে যাচ্ছে। কৃষ্ণাঙ্গদের মুখে কোনো হাসি নেই জীবনের জাঁতাকলে তারা নিপিষ্ট। সাদা-কালো মিশ খায়নি। শহরের প্রান্তে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর বসবাস। কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত জনপদে সাধারণ সেবাগুলোও নেই। অথচ ওই জায়গা থেকে তিন মাইল এগোলেই মনে হবে ইংল্যান্ডের অ্যাসেক্সের কোনো এলাকায় আছি।

কেপটাউনের অদূরে সেই লাঙ্গাÑদক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে পুরোনো কৃষ্ণাঙ্গ জনপদ। ওই লাঙ্গা থেকেই তো দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম সংগ্রামী মিছিল বেরিয়ে এসেছিল ১৯৮৯ সলে। শ্বেতাঙ্গ পুলিশের গুলিতে দুই ঘণ্টায় এক হাজার ৩০০ লোক প্রাণ হারিয়েছিল।

ততক্ষণে আমি আমার বক্তব্যের প্রথম লাইন পেয়ে গিয়েছিলাম। ‘কে বলেছে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ নিঃশেষিত হয়েছে? বর্ণবাদ এ সমাজে এখনও আছে।’ এ কথা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ এক হাজার দর্শক-শ্রোতার সারা মিলনায়তন নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল একটা পিনপতনের শব্দও শোনা যাবে সেখানে। ‘আপনাদের গাত্র-বর্ণভিত্তিক বর্ণবাদ তো যায়ইনি, বরং অর্থ-সম্পদের রংভিত্তিক এক বর্ণবাদ আপনারা সৃষ্টি করেছেন। ফলে সমাজে নতুন এক বিভাজনের তৈরি হয়েছে।’ সামনের সারিতে বসা গণ্যমান্যদের মাঝে এক ধরনের অস্বস্তি আমি টের পাইÑতারা নড়েচড়ে বসছেন। খুব সুখকর নয় ব্যাপারটি তাদের জন্য।

কিন্তু আমি থামি না। রাস্তাঘাটে দেখা আমার পর্যবেক্ষণ, বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার পরিস্থিতি, তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আমি আমার যুক্তিকে ধারালো করি, আমার বিশ্লেষণকে শানিত করি এবং আমার উপসংহারকে দুর্ভেদ্য করি। ‘এটা ২০১৭ সাল। তাকিয়ে দেখুন, কারা বসে আছে ওই বেষ্টনীঘেরা আসনগুলোতে।’ টের পাই, রুদ্ধশ্বাসে শুনছে আমার কথাগুলো ওখানে বসা শ্রোতা-দর্শকরা।

মাদিবার স্বপ্নের কথা বলিÑউল্লেখ করি অনতিদূরের রবেন দ্বীপের কথা, যেখানে ওই মানুষটি জীবনের ২৬ বছর বন্দিজীবন কাটিয়েছেন একটি খুপরিতে। কেন? দক্ষিণ আফ্রিকার নিপীড়িত মানুষদের মুক্তির জন্য। এভাবে চললে আপনারা একবিংশ শতাব্দীতে নয়, আপনারা ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফেরত যাবেন। এক অশনিসংকেতের কথা বলে বক্তব্য শেষ করি।

বক্তব্য শেষে সারা মিলনায়তন দুই সেকেন্ড নিশ্চুপ। বুঝতে পারি আবেগ সামলাচ্ছেন দর্শক-শ্রোতারা। তারপর সারা মিলনায়তন উদ্বেলিত হয়ে পড়ে। দাঁড়িয়ে গিয়েছেন সবাই। এ আমি আশা করিনি। লাফ দিয়ে মঞ্চে চলে আসে ম্যাক্স। উষ্ণ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে বলে, ‘ফাটিয়ে দিয়েছ হে।’ যাক্ বাবা, ঠ্যাঙানোর হাত থেকে এ যাত্রা বেঁচেছি। কিন্তু আমি নিচুস্বরে ওকে বলি, ‘আমি কিছুই ফাটাইনি। তোমরা একটা তাজা বোমার ওপর বসে আছো। এটাই একদিন ফাটাবে তোমাদের।’

ওপরের বেষ্টনী থেকে দলে দলে নানা বয়সী মানুষ এগিয়ে আসেন। হাত ধরে, কথা বলে, জানতে চান অনেক কিছু। একটু বয়স্ক যারা, তারা তাদের আশাভঙ্গের কথা বলছিলেন, সংগ্রামের দিনগুলোকে স্মরণ করছিলেন, হারানো সঙ্গীদের কথা বলছিলেন। কোথায় যেন তাদের সঙ্গে মেলাতে পারি, কোনো জায়গায় যেন সুতোর গাটছড়া বাঁধা দেখতে পাই, বুঝতে পারি একই রকম পথ পেরিয়েই আমরা এসেছি।

তরুণরা বলেন, কাল নিয়ে যাবেন লাঙ্গায় কৃষ্ণাঙ্গ জনপদে। যাব, নিশ্চয়ই যাব। এতদূর এসে তীর্থস্থলে না গেলে কি চলে? লাঙ্গায় যাওয়া! সে এক অন্য গল্প।

ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন

দপ্তর ও দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ

উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..