মত-বিশ্লেষণ

বহুমুখী সংকটে থাকা নদী রক্ষা কার্যক্রম ব্যর্থ হচ্ছে কি?

তৌহিদুর রহমান:ছোটবেলার বড় একটা সময় কেটেছে নানাবাড়িতে। সেখানে রয়েছে মনে রাখার মতো অনেক স্মৃতি। এর মধ্যে বড় একটা অংশ রয়েছে কপোতাক্ষ নদকে কেন্দ্র করে। জেলেদের মাছ ধরা দেখেছি, সাঁতার কেটেছি, দু-একবার মাছও ধরেছি। নদীর তীরে খেলাধুলা করা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সে সময় দেখেছি, নদীতে বছরের প্রায় পুরোটা সময়ই স্রোত বইত, নৌকা চলত। মাত্র ১৭-১৮ বছর আগের কথা এগুলো। এখন সেই কপোতাক্ষ নদের পাড়ে গেলে মনটা হাহাকার করে ওঠে। নদীতে আগের মতো পানি নেই। অনেক অংশ শুকিয়ে গেছে, হেঁটে পার হওয়া যায়। পানির অভাবে নৌকাও চলতে পারে না। মাছও মেলে না আগের মতো। বর্ষা মৌসুমে পানি হলে কিছুদিন নদীর স্বাভাবিক চেহারা ফিরে আসে।

শুধু কপোতাক্ষ নদই নয়, দেশের ছোট-বড় প্রায় সব ধরনের নদীরই এখন এ অবস্থা। বড় নদীগুলোয় কিছুটা নাব্য থাকলেও দখলে-দূষণে সেগুলোও ধুঁকছে। নদী নিয়ে তাই সচেতন মানুষের হতাশার যেন শেষ নেই। নদী রক্ষা করতে সামাজিক আন্দোলন ক্রমেই দানা বাঁধছে। নানা ধরনের উদ্যোগও নেয়া হচ্ছে। এমনকি নদী রক্ষার বিষয়টি আইন-আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। সরকারিভাবেও নানা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু এসব কর্মকাণ্ডে আসলে কাজ হচ্ছে কতটা? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নদী রক্ষা কার্যক্রমের সুফল মিলছে সামান্যই। নদীগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

একসময় নদীমাতৃক বাংলাদেশ হিসেবে পরিচয় থাকলেও এখন তা মিলিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এমনিতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীর্ষ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখা যাচ্ছে বনভূমি ও জলাধারের ক্ষেত্রে। নদীগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য এসেছে। এখন আর আগের মতো স্রোতও দেখা যায় না নদীতে। বিশেষত ছোট নদীগুলো ক্রমেই নাব্য হারিয়ে মরা খালে পরিণত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় নদীগুলো পরিণত হবে আবাসস্থল কিংবা ফসলি জমিতে।

জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও আমাদের নানা ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড নদীর বড় ক্ষতি করছে। ফলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নেওয়া নানা পদক্ষেপ বাস্তবে তেমন কাজে আসছে না। বিচার বিভাগকেও নদী রক্ষায় বারবার এগিয়ে আসতে হচ্ছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত সুফল মেলেনি বলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়। হারিয়ে যাওয়ার পথে থাকা নদীগুলো রক্ষায় কঠোর অবস্থান না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে বলে অনেকের আশঙ্কা। এসব নদ-নদী আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ অনেক কিছুরই বড় অংশ ধারণ করে আছে সন্দেহ নেই। অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক নদী নিয়ে কালজয়ী সব সৃষ্টি করে গেছেন। হাজার হাজার মানুষের জীবনের অনেক সুখ ও দুঃখগাথা এই নদীকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আমাদের সেই গর্বের নদীগুলোই আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। একসময়কার প্রমত্তা অনেক নদীকে এখন মরা খাল বললেও ভুল হবে না সম্ভবত।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ছোট-বড় প্রায় ৭০০টি নদ-নদী বয়ে গেছে। এর মধ্যে ভারতের সঙ্গে অভিন্ন নদী রয়েছে ৫৪টি। আর মিয়ানমারের সঙ্গে রয়েছে তিনটি। কাগজে-কলমে এত নদীর নাম থাকলেও বাস্তবে কতগুলো টিকে আছে, তা গবেষণার বিষয়। এর অর্ধেকও টিকে রয়েছে কি না তা বের করতে খুব বেশি বেগ পাওয়ার কথা নয়। কাগজে-কলমে নদ-নদীকেন্দ্রিক ২৪ হাজার কিলোমিটারের অধিক নদীপথ রয়েছে। এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশে এটি বিশাল পাওয়া সন্দেহ নেই। এটিকে কাজে লাগিয়েই প্রাচীনকাল থেকে এ দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং যাত্রী ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কিন্তু এখনকার বিভিন্ন তথ্যমতে, সব মৌসুমে কমবেশি পাঁচ হাজার কিলোমিটারেরও কম নদীপথ ব্যবহারোপযোগী থাকে।

ইলিশসহ প্রাকৃতিক মৎস্যের বড় উৎসও আমাদের নদীগুলো। বিপুলসংখ্যক জীববৈচিত্র্যের আবাসস্থলও। নদীগুলো হারিয়ে যাওয়ায় প্রাকৃতিক উৎসের মৎস প্রাপ্তি ক্রমেই কমছে। বিশেষ করে দেশি প্রজাতির মাছ এখন দেখা মেলে কালেভদ্রে। অনেক মাছ বিলুপ্ত হয়ে স্থান করে নিয়েছে বইয়ের পাতায় কিংবা জাদুঘরে। অথচ ‘মাছে ভাতে বাঙালি’ এদেশের মানুষের একটি চিরাচরিত পরিচয়। প্রাচীনকাল থেকেই নদীকেন্দ্রিকভাবে জীবিকানির্বাহ করে আসছেন লাখো মানুষ। তাদের সেই জীবিকাতেও আজ টান পড়েছে নদীগুলো হারিয়ে যাওয়ার পথে থাকায়। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে নদী থেকে জীবিকা আহরণের পরিমাণ আরও কমবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বরং আমরা সে পথেই আছি বলা চলে।

প্রাকৃতিক কারণ ছাড়াও নদীগুলো হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ কিন্তু আমরাই। বেশি দায় প্রভাবশালীদের। প্রায়ই দেখা যায়, নদীর জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে অট্টালিকা। বালু দিয়ে ভরাট করে কারখানা গড়ে তোলাও এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বড় শহরগুলোর নিকটবর্তী বিশেষত রাজধানী ঢাকার আশেপাশের জেলার নদীগুলোয় এ ধরণের দখলের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। গত কয়েক বছরে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও ব্যাপক উৎসাহে নদী দখলের প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যাচ্ছে। গণমাধ্যমে তাদের দখলের প্রতিযোগিতা নিয়ে সংবাদ প্রচার হতেও দেখেছি আমরা। দেশের স্বনামধন্য শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হয়েও তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নদী রক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়াই বরং তাদের জন্য সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত।

নদনদীকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা হয়েছে। নদীকে পণ্য পরিবহন করার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু নদী দখল করে অবকাঠামো নির্মাণ গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ সেটিই করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে প্রভাবশালীদের প্রচ্ছন্ন সমর্থন। ফলে দখল-দূষণে বেশিরভাগ নদনদী আজ মৃতপ্রায়। নদীপথে পণ্য পরিবহন সহজলভ্যতার কথা চিন্তা করে পাড়ঘেঁঁষে অসংখ্য ছোট-বড় কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে এটি ভালো দিক। কিন্তু দু-ধারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে নদীর জায়গা দখল করার পাশাপাশি বর্জ্য ও কেমিক্যাল ফেলা কোনো দায়িত্বশীল আচরণ হতে পারে না। এতে নদীর জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে। অনেক নদী এরই মধ্যে মাছশূন্য হয়ে গেছে। ঢাকার আশেপাশের বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও তুরাগ নদীই যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। এছাড়া বড় শহর ও শিল্পাঞ্চলের আশেপাশের প্রায় সব নদীরই একই অবস্থা। এভাবে নদীগুলোর ধ্বংস ডেকে আনা কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ অবস্থায় উদ্বিগ্ন দেশের সর্বোচ্চ আদালত নদী নিয়ে ‘কানামাছি’ বন্ধ করার কথা বলেছেন। এমনকি দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা করতে নদীকে ‘লিগ্যাল পারসন’ ঘোষণা করা হয়। ফলে মানুষের মতো নদীর ক্ষেত্রেও কিছু মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হবে। তারপরও দখলদার ও দূষণকারীদের থাবা থেকে নদীকে রক্ষা করা যাচ্ছে না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের ভবিষ্যৎ বলে কিছুই থাকবে না। একটি বিষয় কিন্তু স্পষ্ট, নদীর দুরবস্থা নিয়ে সব মহল উদ্বিগ্ন। কিন্তু দখলদাররা প্রভাবশালী হওয়ায় বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

প্রাচীনকাল থেকেই নদীকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ মানুষের জীবিকানির্বাহ হয়ে আসছে। পণ্য পরিবহন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এসেছে গতি। এটি প্রাকৃতিক মাছের বড় উৎসও বটে। তবে ক্রমেই নদীগুলো হারিয়ে যাওয়ায় নদীকেন্দ্রিক সুবিধা কমে আসছে। ২০০৯ সালে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে নদী রক্ষা জাতীয় কমিশন করা হয়েছে। কিন্তু এ কমিশনের কার্যকারিতাও এখন প্রশ্নবিদ্ধ। নদী দখলের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতা কিংবা প্রভাবশালীরা বেশি জড়িত। তাদের কাছে থেকে নদী দখলমুক্ত করার পাশাপাশি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

আমাদের মনে রাখতে হবে, নদী রক্ষায় অনেক দেরি হয়ে গেলেও এখনও সব শেষ হয়ে যায়নি। তবে এখনই পদক্ষেপ না নেওয়া গেলে তা মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমরাও নানাভাবে ময়লা আবর্জনা ও প্লাস্টিক পণ্য ফেলে প্রতিনিয়ত দখলে ভূমিকা রাখছি। এসব ময়লা-আবর্জনা তিলে তিলে জমা হয়ে একসময় নদী ভরাট করে ফেলছে। হয়তোবা প্রভাবশালীদের দখলেরও সুযোগ করে দিচ্ছি। অথচ নদীতে আবর্জনা না ফেলে সঠিক স্থানে সেগুলো ফেলার ব্যবস্থা করলে নদীগুলো হয়তো এভাবে দখল নাও হতে পারত।

নদী দখলমুক্ত করতে চলতি বছরও সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে। পরবর্তীকালে আবার সেগুলো দখল হয়ে যাওয়ার কথাও শোনা যায়। অনেক স্থানে নদীভাঙন রোধে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও তারও সুফল মিলছে সামান্যই। এ কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগও বিস্তর। আসলে এসব গতানুগতিক পদ্ধতিতে অটল থাকলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। অবশ্য করণীয় কী হতে পারে, বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে আরও ভালো বলতে পারবেন। তবে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে পারি, বিদ্যমান পদক্ষেপে লাভ কিছু হচ্ছে না। নদী বাঁচাতে সবার আগে প্রভাবশালী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। তারা কথা না শুনলে কঠোর ব্যবস্থা নিতেও পিছপা হওয়া যাবে না। কারণ প্রশ্নটা এখানে ভবিষ্যতের। এছাড়া তাদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

আমাদের মতো সাধারণ মানুষকেও আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এ ভূমি বাসযোগ্য করে যাওয়ার দায়িত্ব আমাদেরই। সেটি যদি করতে না পারি, তার দায় ভবিষ্যৎ প্রজš§ আমাদের ওপরই চাপাবে। এজন্য যার যার নিজ অবস্থান থেকে নদী রক্ষায় ভূমিকা রাখতে হবে, কোনো কারণে নদীর ক্ষতিসাধন হয় এমন কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসতে হবে। আর প্রভাবশালী বা অন্য কোনো শক্তিশালী গোষ্ঠীর দ্বারা নদীর ক্ষতি হলে তাও সবাই মিলে রুখে দিতে হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার, নদী প্রকৃতির দান। তবে একবার এগুলো হারিয়ে গেলে আর কখনোই তা ফিরে পাওয়া যাবে না।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

সর্বশেষ..