দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বহুমুখী সংকটে মৃতপ্রায় তুং হাই নিটিং

দায় এড়াতে পারে না বিএসইসি

পুঁজিবাজারে স্মরণকালের ভয়াবহ ধসের পর ২০১১ সালে পুনর্গঠন করা হয় বিএসইসি। বাজার ভালো হবেÑএ প্রত্যাশায় কমিশনকে নতুন করে সাজানো হয়েছিল; কিন্তু উল্টো এ সময় দুর্বল কোম্পানিগুলো বেশি তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সে রকম কিছু কোম্পানি নিয়ে শেয়ার বিজের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ শেষ পর্ব

মুস্তাফিজুর রহমান নাহিদ: একসময় তুং হাই নিটিংয়ের শেয়ারের চাহিদা ছিল বেশ ভালো। লেনদেন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ক্রেতা-বিক্রেতাদের মধ্যে শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ের দর নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন আর এই শেয়ার ক্রয়ের প্রতিযোগিতা লক্ষ করা যায় না। উল্টো প্রায় ক্রেতাশূন্য দেখা যায় এ শেয়ার, যার জের ধরে শেয়ারদর নেমে গেছে দুই টাকা ২০ পয়সায়।

আর্থিক অবস্থার অবনতি, নেতৃত্ব সংকট, বিদেশিদের (বায়ার) বিমুখ আচরণ, সর্বোপরি উৎপাদন বন্ধসহ বিভিন্ন কারণে বর্তমানে মৃতপ্রায় প্রতিষ্ঠানটি।

জানা যায়, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর থেকে ধারাবাহিকভাবে আয় ও মুনাফা কমছে বস্ত্র খাতের কোম্পানি তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডায়িংয়ের। কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর নেতৃত্বসংকট ও শ্রমিকদের সঙ্গে দ্বন্দ্বের জের ধরে কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই এরই মধ্যে চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন বিদেশি ক্রেতারাও। এ প্রেক্ষাপটে মূলধন সংকটের কারণে দুই বছর আগে কারখানার মজুত কাঁচামাল ও যানবাহন বিক্রি করে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হয়েছে।

২০১৬-১৭ আর্থিক বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের শুরু থেকে তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডায়িংয়ের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ব্যাংকঋণের বোঝা, বকেয়া বেতন-ভাতা নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, যে কারণে কর্মরত কয়েক হাজার শ্রমিক, কোম্পানিটির নির্বাহী পরিচালক, জেনারেল ম্যানেজার, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কোম্পানি সচিবসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। বর্তমানে সাভারের জিরানীতে অবস্থিত কারখানা ও মিরপুরের টেকনিক্যালের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকাণ্ড বন্ধ রয়েছে। কয়েকজন নিরাপত্তা প্রহরী ছাড়া আর কারও দেখা পাওয়া যায় না। অফিসে আসেন না কোম্পানির চেয়ারম্যান আরজুমান আরা খানম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফরীন মাহবুব।

এদিকে কয়েক বছর ধরে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে না প্রতিষ্ঠানটি। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরের তিন প্রান্তিক পর্যন্ত সময়ের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ছয় কোটি ৫৪ লাখ টাকা পরিচালন মুনাফা দেখিয়েছে। আর শেয়ারপ্রতি আয় দেখানো হয়েছে ৬১ পয়সা। এর পর প্রতিষ্ঠানটি আর আর্থিক কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

অন্যদিকে আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিটির বার্ষিক সাধারণ সভাও (এজিএম) হয়নি। এমনকি কোম্পানিটির উৎপাদন বন্ধের তথ্যও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জানায়নি কোম্পানিটি। অন্যদিকে কিছুদিন আগে ডিএসইর একটি প্রতিনিধিদল কোম্পানি পরিদর্শনে গেলে কারখানা বন্ধ থাকায় তারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেনি।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রতিষ্ঠানের কারও সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। কথা হয় কোম্পানির এক সাবেক কর্মকর্তার সঙ্গে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, আমি অনেক আগেই চাকরি ছেড়ে চলে এসেছি। প্রতিষ্ঠানের অবস্থা খারাপ দেখে আরও অনেকেই এ পথ অনুসরণ করেছেন। আমার জানামতে, কোম্পানির আর্থিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে।

তুং হাই গ্রুপের মালিকানায় থাকা একসময়কার স্বনামখ্যাত সোয়েটার উৎপাদনকারী তুং হাই নিটিং অ্যান্ড ডায়িং কোম্পানির স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মাহবুবুর রহমান। ২০১৩ সালের ৮ মে কারখানায় রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান তিনি। তার মৃত্যুর পর নেতৃত্ব সংকটে পড়ে কোম্পানিটি। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ২০১৪ সালে পুঁজিবাজারে আসে কোম্পানিটি। ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ, মূলধনি বিনিয়োগ বাড়ানো ও চলতি মূলধন জোগানোর জন্য পুঁজিবাজার থেকে ৩৫ কোটি টাকা তুলেছে কোম্পানিটি।

আইপিওর অর্থের কারণে তালিকাভুক্তির পরের বছর মুনাফা বেড়েছিল। কিন্তু মূল মালিকের মৃত্যুর পর নেতৃত্ব সংকট ও অন্য কারখানায় সাবকনট্রাক্টে পোশাক তৈরি করানোর তথ্য ফাঁসের পর ‘স্টোর টোয়েন্টি ওয়ান’, ‘নিউ লুক’, ‘ইনডিটেক্স’ ও ‘পয়েন্ট জিরো’সহ অন্য বিদেশি ক্রেতারা তুং হাই নিটিং থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এরপর অন্য কোম্পানি থেকে সাবকনট্রাক্টে পোশাক তৈরির কাজ নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু এভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি কোম্পানিটি।

তালিকাভুক্তির পরই কোম্পানিটির সংকট বাড়তে শুরু করে। প্রকৃত অবস্থা আড়ালে রাখতে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ আর্থিক বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ১০ শতাংশ হারে বোনাস লভ্যাংশ দিয়েছে। তবে কোম্পানিটির অবস্থা সুবিধাজনক না হওয়ায় তালিকাভুক্তির দুই বছর পরই কোম্পানিটির শেয়ার অভিহিত মূল্যের নিচে নেমে যায়। এখন সেই অবস্থা আরও নাজুক। এখন এ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মিলছে দুই টাকা ২০ পয়সায়। প্রতিষ্ঠানের মোট শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে ৬৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ শেয়ার। এছাড়া পরিচালকেরা ৩০ দশমিক শূন্য চার শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে রয়েছে পাঁচ দশমিক ৬২ শতাংশ শেয়ার।

এদিকে এ ধরনের কোম্পানির তালিকাভুক্তি পুঁজিবাজারের জন্য সুখকর নয় বলে মন্তব্য করেন পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কিছু কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। তাই তারা তালিকাভুক্তির পর কোম্পানি কিংবা বিনিয়োগকারীদের কথা ভাবেন না। ফলে ভোগান্তিতে পড়েন বিনিয়োগকারীরা।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম শেয়ার বিজকে বলেন, একটি কোম্পানির পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকে। এদের সবাইকে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর সঙ্গে ইস্যু ম্যানেজার, অডিট ফার্ম ও স্টক এক্সচেঞ্জ জড়িত রয়েছে। তবে সর্বোপরি কাজটি করতে হয় বিএসইসিকে। তাই তারা কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। কোম্পানির অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের আরও যাচাই-বাছাই করার সুযোগ থাকে।

একই প্রসঙ্গে পুঁজিবাজারবিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দুর্বল কোম্পানির পরিচালকেরা বেশিরভাগ সময় নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে দিলে তার নিজের স্বার্থ শেষ হয়ে যায়, যে কারণে কোম্পানির আর্থিক উন্নয়নে তাদের মন থাকে না। আর সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এসব শেয়ারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ফলে শেয়ারদরও তলানিতে চলে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের গভীরতাও নষ্ট হয়।

এ ধরনের কোম্পানির তালিকাভুক্তি প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ করা হলে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান শেয়ার বিজকে বলেন, আমরা কোম্পানির কাগজপত্র দেখে সবকিছু সঠিক মনে হলে তবেই এর অনুমোদন দিই। না হলে কোনো কোম্পানির অনুমোদন মেলে না। অনুমোদন পাওয়ার পরবর্তীকালে কোম্পানিটি কেমন হবে, তা আমাদের জানা থাকে না। তাই এটা নিয়ে আমাদের প্রশ্ন করলে আমরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..