প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বাংলাদেশের নদী

ম. ইনামুল হক: নদী বাংলার ইতিহাস, নদী বাংলার ঐতিহ্য, নদী বাংলার সংস্কৃতি। বাংলার সর্বপ্রাচীন লিপিবদ্ধ ইতিহাস পাওয়া যায় গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের সঙ্গে আগত সভাসদদের রচিত পুস্তকগুলোতে। তাদের বর্ণনায় জানা যায়, আলেকজান্ডার সিন্ধু অববাহিকা জয় করার পর গঙ্গা নদীর অববাহিকায় প্রবেশ করতে দ্বিধান্বিত হন। কারণ তিনি খবর পান যে, তার সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য ‘গঙ্গারিডাই’ ও ‘প্রাসিয়ই’ নামক দুটি শক্তিশালী রাজ্য সম্মিলিত বাহিনী প্রস্তুত করছে। ওই সময় গঙ্গা নদীর মোহনায় বদ্বীপ অঞ্চলে ‘গঙ্গে’ নামের এক বন্দর ছিল ও গঙ্গার উপনদী অঞ্চলে ‘পাটলিপুত্র’ নামক নগরী ছিল। অতএব ধারণা করা যায়, গ্রিক ঐতিহাসিকদের বিবরণের ‘প্রাসিয়ই’ ছিল গঙ্গার উপনদী অঞ্চলের অববাহিকার ‘প্রাচ্য’ বা ওই নামের অর্থবহ একটি রাজ্য এবং ‘গঙ্গারিডাই’ ছিল ‘গঙ্গারাঢ়ী’ বা ‘গঙ্গা’ এবং ‘রাঢ়ী’ নামের অর্থবহ ভাটি অঞ্চলের একটি রাজ্য।

দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরাঞ্চলে আর্যদের অবস্থান ও আধিপত্য সম্পর্কে অনেক কিছুই আমরা নানা ইতিহাস-পুস্তকের মাধ্যমে জানি। আর্যদের আধিপত্যের একটি পর্যায়ে আমরা ‘ষোড়শ মহাজনপদ’ নামে খ্যাত ষোলটি রাজ্যের ইতিহাসও পাই। খ্রিস্টের জন্মের প্রায় এক হাজার বছর আগে থেকেই রাজ্যগুলোর পরিবৃদ্ধি হয়েছে। ওই সময়ের ইতিহাসে বর্তমান বাংলা অঞ্চলে অঙ্গ, বঙ্গ, রাঢ় প্রভৃতি রাজ্যেরও উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীর সময়ের ঘটনার গ্রন্থ ‘মহাভারত’-এ উত্তরবঙ্গের নদী ‘করতোয়া’র নাম আছে। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে আলেকজান্ডারের নেতৃত্বে গ্রিকরা যখন এই অঞ্চল জয় করতে আসে, তখন তারা ‘সিন্ধু’ নদের পূর্বদিকে অবস্থিত এই বিশাল দেশকে ‘ইন্ডিয়া’ নামে অভিহিত করে। দীর্ঘকাল এই ভূখণ্ডটি ‘সিন্ধু’ নামের অপভ্রংশ ‘হিন্দু’ তথা ‘হিন্দুস্তান’ নামেই পরিচিত ছিল। গুপ্ত আমলে রচিত পুরাণগুলোয় একে ‘ভারতবর্ষ’ বলা হয়েছে। তবে ব্রিটিশ আমলে ‘ভারতবর্ষ’ বলতে ব্রহ্মদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে বোঝানো হতো।

গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকার একটি বিশেষত্ব হলো এর ষড়ঋতুভিত্তিক জলবায়ু। বিশেষ করে বর্ষাকালে প্রায় অর্ধবছর উত্তর-দক্ষিণ বরাবর এক বিশাল এলাকা জলাকীর্ণ থাকে। অতএব প্রাকৃতিক কারণেই এই অববাহিকার পূর্বাঞ্চল মূল উপমহাদেশ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন থাকে এবং তাই এর ইতিহাস ভিন্নভাবে এগোতে থাকে। তবে প্রাকৃতিক কারণেই এই উপমহাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসে এ এলাকার তথ্য অনেক অস্পষ্ট। তাহলেও আমরা জানতে পারি, সুদূর অতীতকালে এই এলাকা মঙ্গোল বর্ণভুক্ত কিরাত, কোচ ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর অধীনে ছিল। আর্য আধিপত্যের পরবর্তী পর্যায়ে পশ্চিমের পারস্য ও উত্তর-পশ্চিমের মধ্য এশিয়া থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতি-জনগোষ্ঠী দ্বারা দক্ষিণ এশিয়া আক্রান্ত হয়েছে। এসব আক্রমণকারীর মূল উদ্দেশ্য ছিল লুটপাট। তবে এ লুটপাটকারীরা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ফিরে গেলেও অনেকে রয়ে যায় এবং মূল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে যায়। এ উপমহাদেশে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে যেসব আক্রমণ হয়, তা ব্রহ্মপুত্র-বরাক উপত্যকা ও সমতট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে। আক্রমণকারীদের অনেকে ওইসব স্থানেই স্থায়ী অবস্থান গ্রহণ করে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলেমিশে পরিবৃদ্ধি লাভ করতে থাকে। এ কারণে বৃহত্তর বাংলার সমতলের মানুষের ভেতরে আংশিক হলেও পূর্ব ও পশ্চিমের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর রক্তের ধারা বহমান আছে বলা যায়।

গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী বাংলার সমতলকে স্পষ্টত চারটি ভাগে যথা—পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, পূর্ববঙ্গ ও মধ্যবঙ্গ হিসেবে ভাগ করেছে। নৃতাত্ত্বিক দিক থেকেও এবং অতি প্রাচীনকাল থেকেই এই চারটি ভাগের জনগোষ্ঠী চারটি বিশেষ ধারা তথা মিশ্রণের পরিচয় বহন করছে। পশ্চিমবঙ্গ এলাকার বিস্তার ছোট নাগপুর উচ্চভূমি ও রাঢ় সমভূমি এলাকা। এই এলাকার কোল, মুণ্ডা, সাঁওতাল প্রভৃতি মানুষরা অস্ট্রোলয়েড ধারার। উত্তরবঙ্গের বিস্তার মধ্যবঙ্গের উচ্চভূমি থেকে কুশী নদী পর্যন্ত ধরা যায়। এই এলাকার মানুষ মধ্য এশিয়া ও তিব্বতীয় কিরাত ধারার মিশ্র সংস্কৃতির বাহক। মেঘনা অববাহিকার পূর্ববঙ্গ এলাকার মানুষ চীন তথা মঙ্গোলীয় ও অস্ট্রোলয়েড ধারার মিশ্র সংস্কৃতির বাহক। মধ্যবঙ্গ এলাকা জঙ্গলময় ও রহস্যময় হলেও এর নদী তীরবর্তী অঞ্চলে বিশেষ করে সমুদ্র তটবর্তী এলাকার আশপাশে নানা দেশের মানুষ বাস করতো। এদের মধ্যে ছিল ইউরোপীয় যবন, আফ্রিকার হাবশী বা খস এবং উত্তরের দেশগুলো তথা তিব্বত ও চীন দেশের ম্লেচছ (সূত্র মহাভারত)।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান নদী গঙ্গার সমগ্র অববাহিকা প্রধানত দুটি সমতল অংশে বিভক্ত। যথা—এক. উজানের সব উপনদীর উৎস থেকে রাজমহলের খাঁড়ি পর্যন্ত অংশ এবং দুই. রাজমহল থেকে ভাটিতে গঙ্গার সব শাখানদীর মোহনা পর্যন্ত অংশ। বাংলার উত্তর-পশ্চিম সীমানায় অবস্থিত রাজমহল পাহাড় এবং উত্তর-পূর্বের তুরা পাহাড়ের মধ্যবর্তী বরেন্দ্র উচ্চভূমি বাংলার সমতলকে স্পষ্ট দুই ভাগে ভাগ করেছে। এই দুই ভাগের উজানের অংশ হলো গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর উপনদীগুলোর বন্যাবিধৌত অঞ্চল আর ভাটির অংশ হলো গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদীবাহিত পলি দিয়ে সমুদ্র তলদেশ থেকে জেগে ওঠা বদ্বীপ অঞ্চল। বাংলার সমতল গঠনে পূর্বদিকের লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন অন্যান্য নদীর পলিরও ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমে পাহাড়ি নদীগুলোর মোহনায় সমুদ্রের তটরেখা বরাবরও বাংলার দুটি সমতল ভূমি রয়েছে।

বিশেষ ভূ-প্রাকৃতিক গঠন ও পরিবেশের জন্য সুদূর অতীত থেকেই বঙ্গীয় সমতল এলাকার মানুষের মধ্যে একটি নিজস্ব জীবনধারা গড়ে উঠেছিল। এই জীবনধারায় বাংলার ঋতুবৈচিত্র্য, জলাভূমি ও নদীনালার প্রভাব ছিল, তা বলাই বাহুল্য। তবে রাঢ়বঙ্গে প্রাপ্ত পুরাতাত্ত্বিক ধ্বংসাবশেষ থেকে জানা যায়, এসব এলাকার মানুষ সুদূর অতীত থেকেই উন্নত গৃহস্থালি সংস্কৃতি, ধাতু ও জাহাজ শিল্পের অধিকারী ছিল এবং তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যথেষ্ট সম্পৃক্ত ছিল। বদ্বীপ অঞ্চলেও এই সংস্কৃতির বিস্তার লাভ হয়েছিল বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু সমৃদ্ধ জনপদগুলো সাধারণত নদীর পাড়ে ছিল; সেগুলো ভাঙনের শিকার হয়ে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তাই আমাদের বড় নদীগুলোর আরেক নাম হয়েছে ‘কীর্তিনাশা’।

 

নদী ও জীবন

পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে পানিই সবচেয়ে আদি ও অফুরান। কারণ প্রতি বছর প্রাকৃতিক চক্রে পানি সাগর থেকে বাষ্পীভূত হয়ে বৃষ্টির আকারে ভূমিতে পতিত হয় এবং নদীতে প্রবাহিত হয়ে আবার সাগরে যায়। ক্রমবর্ধমান মানুষের সংখ্যা পৃথিবীর জীব ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। অন্য পশুপাখির আহার খেয়ে ফেলছে সর্বভুক মানুষ। মানুষ এর পরও যা করছে, তা হলো নিজেদের ভোগলিপ্সার জন্য কৃত্রিমভাবে খাদ্য ও ভোগসামগ্রী উৎপাদন করতে গিয়ে সুপেয় পানির জোগানে হস্তক্ষেপ। মানুষ ড্যাম নির্মাণ করে নদীর পানি আটকাচ্ছে, ব্যারাজ নির্মাণ করে সেচ প্রকল্পে ও শহরে নিয়ে যাচ্ছে, নদীর পানি তুলে নিয়ে শিল্পে ব্যবহার করে তরল বর্জ্য ফিরিয়ে দিচ্ছে। ফলে দিকে দিকে নদীগুলো শুকিয়ে ও দূষিত হয়ে সুপেয় পানির অভাব সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু মানুষের সভ্য জীবনযাপন ও তথাকথিত উন্নয়নের জন্য পানির প্রয়োজন।

বাংলার অতীতকালে এখানকার মানবজীবন কেমন ছিল, তা নিয়ে গবেষণা করলে মানুষের পোশাক, অলঙ্কার, খাবার-দাবার, চাষবাস প্রভৃতির নানা রূপ ভেসে উঠতে পারে। তবে বাংলার মানুষ যে নদীনির্ভর ছিল, তা বলাই বাহুল্য। বিল ও জলাভূমি, হাওর ও নদী এবং মোহনা ও সাগর সবই বাংলার মানুষের জীবনের ওপর প্রভাব ফেলেছে এবং পরিচালিত করেছে। বর্ষার বন্যা ছিল সাংবাৎসরিক ও স্বাভাবিক ব্যাপার। তাই মানুষের বাড়িঘর নির্মিত হতো এমনভাবে, যাতে স্বাভাবিক বন্যার পানি ঘরে ঢুকতে না পারে। বসতবাড়ির ভিটা তৈরি করা হতো উঁচু মাটির ঢিবির ওপর, তার ওপরে মাটির ঘরগুলো হতো উঁচু মেঝের ওপর। প্রতিটি বাড়ির সঙ্গে পাশের নদী বা পার্শ্ববর্তী জলায় একটি করে নৌকা থাকতো বাহন হিসেবে।

নদী ও জলাভূমি ছিল সবার, যেখানে প্রধানত জেলে সম্প্রদায় মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। দেশের বড় বড় নদী, মোহনা ও সাগরে ছিল মাছের বিচরণক্ষেত্র। তবে সাগরে ছিল জলদস্যুদের আনাগোনা। নিকট অতীত ও মধ্যযুগে পর্তুগিজ এবং মগ জলদস্যুরা বঙ্গোপসাগর ও সুন্দরবন এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে বাংলার নারী-পুরুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে ক্রীতদাস হিসেবে বিভিন্ন দেশে চালান করতো। তখন কি সাগর, কি ভূমি সমগ্র বাংলা ছিল বিদেশিদের করতলে। এখনও তটবর্তী দ্বীপগুলোয় এবং সুন্দরবন অঞ্চলে জলদস্যুদের প্রকোপ আছে। এরই মধ্যে বাংলায় নানা ধরনের নৌকা এবং ওইসব নৌকার মাঝিমাল্লাকে নিয়ে নানা কথা, গান ও রূপকথার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলার ভাটিয়ালি গান মূলত নৌপথে যাতায়াতকে কেন্দ্র করেই রচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের বড় নদীগুলোয়, মোহনা ও সাগরে জেলেরা মাছ ধরে এবং সেখানে আছে অফুরন্ত মাছের বিচরণক্ষেত্র। হাওর ও নদীগুলো বাংলাদেশের অনেক প্রজাতির মাছের অভয়াশ্রম ও প্রজননক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অনেক বিল আছে। এসব বিল মাছের ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জে যে বিশাল হাওর এলাকা আছে, সেখানে ফসলের মাঠ বছরের ছয় মাস পানিতে ডুবে থাকে। হাওরের গ্রামগুলো বর্ষার সময় সাগরের মধ্যে এক একটি দ্বীপের মতো দেখায়। হাওরের জমি প্রধানত একফসলি, যেখানে শীতকালে নদীর পানি নেমে গেলে বোরো চাষ করা হয়। হাওরের যেসব অংশে সারা বছর পানি থাকে, সেখানে শীতকালীন পরিযায়ী পাখি বিচরণ করে। হাওর অঞ্চলে আরও পাওয়া যায় মাছ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা মূল্যবান বালু। এই বালু সারা দেশে নির্মাণ কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহার হলেও বিপুল পরিমাণ বালু নদী ও হাওরগুলোর মধ্যে পড়ে অনেক হাওর ভরাট হয়ে যাচ্ছে।

 

লেখক: প্রকৌশলী ও জল পরিবেশ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক