সাক্ষাৎকার

‘বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব খুব ইতিবাচক’

বার্জার পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুপালী চৌধুরী। বহুজাতিক এ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ দায়িত্ব তিনি ১০ বছর ধরে সফলভাবে পালন করে আসছেন। সম্প্রতি শেয়ার বিজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তানিয়া আফরোজ

শেয়ার বিজ: এদেশের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রথম নারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক আপনি। নিজের নেতৃত্বের কৌশল সম্পর্কে যদি কিছু বলেন!

রুপালী চৌধুরী: নেতৃত্বের অবস্থানে আসাটা কষ্টসাধ্য, কিন্তু আসার পর তা ধরে রাখা অন্য ধরনের চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোতে পারফরম্যান্সই সব। এজন্য সৃষ্টিশীল হতে হয়। খুব ভালো নেতৃত্বের দক্ষতা থাকতে হয়। গতকাল কী করেছি, তা তো পুরোনো হয়ে গেল। তারপর ভাবতে হয় নতুন কৌশল ও কার্যক্রম নিয়ে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রধান কাজই হচ্ছে কৌশলগত ভিশন তৈরি করা। এটা একটা ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া।

শেয়ার বিজ: ব্যবসার ধারাবাহিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় আপনি কোন বিষয়টিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেন ?

রুপালী চৌধুরী: সবচেয়ে বড় কাজ হচ্ছে প্রতিষ্ঠানের জন্য ভালো একটা দল তৈরি করা। জমি, সম্পত্তি, মেশিন যাই বলি না, সেরা সম্পদ হচ্ছে মানবসম্পদ। সঠিক মানুষ খুঁজে বের করে প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত নির্দেশনার মাধ্যমে তাদের তৈরি করা গেলে সবকিছুই ঘটতে পারে। এগুলো আসলে মৌলিক বিষয় যে কোনো প্রতিষ্ঠানের।

শেয়ার বিজ: বাজার অংশীদারিত্ব ও মুনাফা বাড়াতে আপনার কৌশল কী?

রুপালী চৌধুরী: প্রতিষ্ঠান যা কিছু করে শেষ পর্যন্ত তা আসলে মুনাফাতেই রূপান্তরিত হয়। বাজার অংশীদারিত্ব বাড়াতে একটি প্রতিষ্ঠানকে বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন ঘটাতে হয়, আবার বাজারকে ছাড়িয়েও যেতে হয়। কীভাবে সেটা ঘটবে? এটা ঘটবে তখনই যখন সৃষ্টিশীলতার ধারা নিশ্চিত হবে। এজন্য প্রতিযোগীদের তুলনায় ক্রেতাকে সেরা পণ্য ও সেবা দিতে হবে। নতুন প্রযুক্তি অবশ্যই আনতে হবে। কমাতে হবে উৎপাদন ব্যয়। এ ধরনের চেষ্টা সবসময় থাকতে হবে।

শেয়ার বিজ: বার্জার পেইন্টস ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশে ব্যবসা করছে। এ সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নিয়ে কিছু বলুন।

রুপালী চৌধুরী: ১৯৭০ সাল থেকে বাংলাদেশে বার্জারের নিজস্ব কারখানা নির্মাণ শুরু হয়। তার আগে ১৯৫৬ সাল থেকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে কাঁচামাল বা পেইন্ট এদেশে এনে বিক্রি করা হতো। বার্জার এদেশে অনেক নতুন প্রযুক্তি এনেছে। অটোমেটিং টেনটেইড সিস্টেম এদেশে প্রথম আমরাই এনেছি। এর মাধ্যমে ক্রেতা যে কোনো সময় যে কোনো রং ও শেড কার্ড থেকে পছন্দ করে বানাতে পারেন। আগে আমাদের ডিলাররা শুধু টেনটেইড বা উৎপাদিত শেড বিক্রি করত। এখন তারা নিজেরাই যে কোনো শেড বানাতে পারে মেশিনের সাহায্যে। অর্থাৎ আমাদের ‘ভ্যালুচেইন’-এর উন্নয়ন ঘটেছে নিয়মিত। এখন উচ্চমানের পরিবেশবান্ধব পণ্য ও লাক্সারি সিল্ক টাইপের ইমালশন বাজারে ছেড়েছি। যে কোনো উন্নত দেশে যে পেইন্ট পাওয়া যায়, বর্তমানে ক্রেতারা আমাদের দেশেই তা কিনতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে বলা চলে শিল্পবিপ্লব হচ্ছে। এসব শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী পাউডার কোটিং, কয়েল কোটিং ইত্যাদি আমদানি করা পণ্যের সমযোগ্য পণ্য এখানেই তৈরি করছি আমরা। তবে তরুণ মেধাবীদের দক্ষতা উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছি। রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে আমাদের বিনিয়োগ অনেক।

শেয়ার বিজ: আপনাদের সাম্প্রতিক উদ্যোগ সম্পর্কে বলবেন কি?

রুপালী চৌধুরী: এদেশে যেভাবে রং লাগানো হয় সেটাকে আধুনিক করতে গত বছর আমরা একটা পেইন্টিং টুলস এনেছি। এজন্য পেইন্টারদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে। আবার দেশের বাইরে পেইন্টিং খরচ বেশি বলে লোকেরা নিজেরাই রং লাগাই। বাংলাদেশে ওই শ্রেণিটা তো আছেই। এ শ্রেণিকে আমরা সমুন্নত করতে চেষ্টা করছি। এর ফলে পণ্যের মান আরও উন্নত হবে।
এ বছরের জানুয়ারিতে ইউকেভিত্তিক বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি ফসরক ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পন্ন করেছি। ২০১৯ সালের শেষের দিকে দেশীয় উৎপাদন শুরু হবে। আমাদের দেশে দেখা যায় নির্মাণে একদম শেষ পর্যায়ে রং লাগানো হয়। বাড়ি নির্মাণে কোনো সমস্যা থাকলে তা ধরা পড়ে একদম রঙের পর্যায়ে এসে। সুতরাং আমরা দেখলাম নির্মাণ পর্যায়ের কেমিক্যাল যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায় তাহলে গুণগত মান আরও বাড়বে। ফসরকের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বিজনেস ডাইভারসিফিকেশন ঘটবে।

শেয়ার বিজ: বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনায় বার্জার পেইন্টস কী কী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে?

রুপালী চৌধুরী: একটা কারখানা করতে গেলে গ্যাস সংযোগ পেতে সময় লাগে। অন্যান্য দেশে বন্দর থেকে পণ্য দ্রুত ছাড়া পায়। কিন্তু আমাদের দেশের বন্দরে জায়গা কম থাকায় ব্যাকলগ অনেক বেশি। সেখানে আমাদের ক্ষতি গুনতে হয়। রাস্তাঘাটের দুরবস্থা আরেকটি প্রতিবন্ধকতা। জায়গায় জায়গায় আমরা যে গুপ্ত ব্যয় গুনে যাচ্ছি, এটা অন্যান্য দেশে নেই। এছাড়া আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ব্যবসা পরিচালনার জন্য যেসব আইন বানাই, সেগুলো যেন ব্যবসাবান্ধব হলে ভালো হয়।

শেয়ার বিজ: উচ্চহারের করপোরেট কর এদেশে ব্যবসা পরিচালনায় অন্যতম প্রতিবন্ধকতা। আপনি কী মনে করেন?

রুপালী চৌধুরী: কর কমানো হবে এ বছরও প্রত্যাশা করেছিলাম, কিন্তু তা হয়নি। করপোরেট কর ৩৫ শতাংশ তো অনেক বেশি। অন্যান্য দেশে এত বেশি নয়। এ কর কমানোর জন্য সরকারের পরিকল্পনা থাকতে হবে। ভ্যাটদাতার সংখ্যা বাড়াতে হবে। সেজন্য চার-পাঁচ বছরের পরিকল্পনা থাকা জরুরি।
শেয়ার বিজ: শেয়ারবাজারে বার্জার পেইন্টসের অবস্থান সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?
রুপালী চৌধুরী: শেয়ারবাজারে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন অনেক পদক্ষেপ নিচ্ছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও মূল্যটা ধারাবাহিকভাবে নি¤œগামী। শেয়ারদরও ওঠানামা করে। সেজন্য পুঁজিবাজারেও আমাদের ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। মূল্যের একটা স্থিতিশীলতা থাকতে হবে। বার্জার পেইন্টস খুবই কমপ্লায়ান্ট কোম্পানি। এ বছর আমরা শতভাগ বোনাস শেয়ার দিয়েছি। দুই শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছি।

শেয়ার বিজ: শেয়ার বিজের ভেতর দিয়ে মুক্তভাবে কিছু বলতে চান কি?
রুপালী চৌধুরী : আমার মনে হয় বাংলাদেশের মানুষের মনোভাব খুব ইতিবাচক। তারা খুব তাড়াতাড়ি সব শিখতে চায়। শিক্ষার গুণগত মান আরও উন্নত হলে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হলে, এগুলো আমাদের স্থায়ী সম্পদে পরিণত হবে। এত তরুণ মানবসম্পদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোচ্ছে তাদের কাজে লাগানো উচিত।

শেয়ার বিজ: ধন্যবাদ আপনাকে
রুপালী চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..