মত-বিশ্লেষণ

বাংলাদেশে নারীশিক্ষা: একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যাত্রা

সোবহানা স্যোশালে টি এম আসাদুজ্জামান ও দীপিকা রামাচন্দন: মানব উন্নয়ন সূচকে ব্যাপক উন্নতি করেছে বাংলাদেশ। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়েও অনেক এগিয়ে রয়েছে। এই অর্জনের মূলে রয়েছে নারীশিক্ষা, যা বাংলাদেশ একটি মডেল হিসেবে দাঁড় করাতে পেরেছে। আশির দশকের পর নারীদের শিক্ষায় যুক্ত হওয়ার হার ১৯৯৮ সালে যেখানে ৩৯ শতাংশ ছিল, ২০০৭ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৬৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই উন্নতির পেছনে বেশকিছু ভর্তুকি দারুণভাবে কাজ করেছে। এর মধ্যে ‘ফিমেল সেকেন্ডারি স্কুল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট (এফএসএসএপি) বিশেষভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯৯০ সালের শুরুর দিকে চালু হওয়া এ প্রকল্প লিঙ্গসমতা অর্জনে বড় ভূমিকা রেখেছে। প্রথমে এটি পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হলেও পরে তা দেশব্যাপী চালু করা হয়।
এফএসএসএপি হলো নারীদের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষায় যুক্ত করা ও ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সমন্বিত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে মূলত উপবৃত্তি ও বেতন মওকুফের মাধ্যমে তাদের সহযোগিতা করা হয়। এটিতে সফল হওয়ার পর, বিশ্বব্যাংক একটি দ্বিতীয় প্রজন্মের উপবৃত্তি কর্মসূচি শুরু করে। এতে প্রায় ২৩ লাখ শিক্ষার্থী উপকৃত হয়, যার মধ্যে ৫৫ শতাংশই ছিল নারী। যদিও ব্যাপক অংশগ্রহণ সত্ত্বেও নারীদের শিক্ষা থেকে উপকৃত হওয়ার হার এখন অপর্যাপ্ত রয়ে গেছে শিক্ষার নিন্ম ও অসম স্তর থাকার কারণে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিসটিকসের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রীদের ঝরে যাওয়ার পরিমাণ সর্বোচ্চ ৪২ শতাংশ। শেষ করার হারও খুবই নিন্ম। মাধ্যমিক স্তর শেষ করার হার মাত্র ৫৯ শতাংশ। এই প্রবণতা স্তরীকৃত শিক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা কর্মক্ষেত্রে নারীদের কম অংশগ্রহণের কারণ হচ্ছে। নারীদের শিক্ষাক্ষেত্রে এই ঝরে যাওয়ার প্রবণতাকে কীভাবে ব্যখ্যা করা যেতে পারে?
বাল্যবিয়ে, গৃহস্থালির দায়িত্ব, ব্যাপকহারে মাতৃত্ব গ্রহণ, যৌন ও জন্মদানের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব, মানসিক স্বাস্থ্যগত বিষয় এবং স্কুলভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা এখানে মূল ভূমিকা পালন করছে। এগুলো স্কুল থেকে বছরগুলো হারিয়ে যেতে ভূমিকা রাখছে।
২০১৮-২২ সালের সেকেন্ডারি এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এসইডিপি) অনুযায়ী, এই শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা সমাপনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। গত দুই দশকে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং প্রবেশের সুযোগ তৈরির বিষয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতা এতে কাজে লাগানো হয়েছে।
এই কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কিশোরী মেয়েদের শিক্ষা প্রোগ্রাম। এর মূল লক্ষ্য হলো, মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের স্মৃতিশক্তি কিংবা ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি অনন্য সহযোগিতার মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
স্কুলভিত্তিক এই কর্মসূচিটি মাসিক পরিচালনার ভিত্তিতে করা হচ্ছে, যা মেয়েদের জন্য আলাদা স্যানিটেশন সুবিধা নিশ্চিত করবে এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের আর্থিক ভর্তুকি দেওয়া হবে, যাতে তারা স্কুলে উপস্থিত হয়। এটি মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষাও নিশ্চিত করবে এবং যৌন ও প্রজনন বিষয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি করবে। একই সঙ্গে তাদের লিঙ্গসমতামূলক আচরণও বৃদ্ধি করবে।
মেয়েদের উপবৃত্তি প্রকল্পটি দেশব্যাপী অভিন্ন লক্ষ্যমাত্রার নীতির দ্বারা মিলিত হবে, যা কিশোর বয়সি মেয়েদের কর্মসূচির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো, এই উচ্চশিক্ষিত নারী কর্মিবাহিনীকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করা।
এখন প্রশ্ন হলো এই পরিবেশ কি দীর্ঘস্থায়ী হবে? নীতিনির্ধারক, প্রতিষ্ঠান, শ্রমবাজার এবং সামগ্রিক ব্যবস্থা নারীদের সম্ভাবনার দ্বার হিসেবে কি পরিণত হতে পারবে? তারা কি দেশকে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে পরিণত করতে পারবে?

বিশ্বব্যাংকের ব্লগ থেকে ভাষান্তর
তৌহিদুর রহমান

ট্যাগ »

সর্বশেষ..