প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বাংলাদেশ ও দুর্ভিক্ষ

পাঠকের চিঠি

ফাইজা বিনতে হক: সাম্প্রতিককালে জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অন্যতম প্রধান আলোচিত শব্দ ‘দুর্ভিক্ষ’। যখন একটি নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশের মানুষের খাদ্যাভাব বা অন্য কোনো কারণে প্রধান মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণ ব্যাহত হয়, তখনই দুর্ভিক্ষপ্রবণ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। সাম্প্রতিককালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবেই হোক আর পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি অবলোকন করেই হোক, আমদানিনির্ভর অর্থনীতির বাংলাদেশ কোনোভাবেই বৈশ্বিক দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রে ঘুমন্ত অবস্থায় থাকতে পারে না।

বর্তমান সময়ে আসন্ন দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আগে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের ইতিহাস একটু ঘেঁটে আসা যাক। ইংরেজ শাসনামলের আগে এ অঞ্চলে বৃহৎ কোনো দুর্ভিক্ষের ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় না। বাংলায় প্রথম বড় আকারের দুর্ভিক্ষ আঘাত হানে ইংরেজ শাসনামল শুরুর কয়েক বছরের মধ্যেই, ১৭৭০ সালে। বাংলা ১১৭৬ সন হওয়ায় দুর্ভিক্ষটি ইতিহাসে ‘ছিয়াত্তরের মন্বন্তর’ নামে সমধিক পরিচিত। ঔপনিবেশিক শক্তি ক্ষমতা লাভের পর ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের দোহাই দিয়ে লুটতরাজ, কৃষকের ওপর করের বোঝা চাপানো, খাদ্যশস্যের পরিবর্তে নীলচাষে বাধ্যকরণ প্রভৃতি ছিল ছিয়াত্তরের মন্বন্তর সৃষ্টির প্রধান কারণ। ভয়াবহ এ দুর্ভিক্ষে বাংলার তৎকালীন জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ লোকের মৃত্যু হয়।

১৯৪৩ সালে ইংরেজ শাসনামলেই আবার বাংলায় বড় আকারের দুর্ভিক্ষ হয়। মাঝে ১৮৭০-৮০-এর দশকে বাংলায় ‘উপোসি’ দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয় বটে, কিন্তু তা ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের মতো ভয়াবহ ছিল না।

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের কারণ এবার ইংরেজদের লুটতরাজ ছিল না, বরং ইংরেজ শাসনের সূর্যদেবতা তখন অস্তাচলের দিকে। প্রধান কারণ ছিল চলমান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। বাংলায় ১৩৫০ সালে শুরু হওয়া ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত এ দুর্ভিক্ষের স্থায়িত্বকাল ছিলে ১৯৪৩-১৯৪৬ সালব্যাপী এবং অনাহারে মৃত্যুবরণ করেছিলেন ৩৫ থেকে ৩৮ লাখ মানুষ।

স্বাধীন বাংলাদেশে একমাত্র দুর্ভিক্ষ হয় দেশ সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত থাকাকালে ১৯৭৪ সালে। ভয়াবহ এ দুর্ভিক্ষে সরকারি হিসেবমতে মারা গিয়েছিল ২৭ হাজার মানুষ। যদিও বেসরকারি হিসাবমতে, সংখ্যাটা এক লাখ থেকে চার লাখ ৫০ হাজার। যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক সংকট, ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় চরম অব্যবস্থাপনা, ওই দশকে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট প্রভৃতি ছিল ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ।

যদিও কার্ল মার্কসের মতে, এটাও ইতিহাসের শিক্ষা যে, কেউই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না, তথাপি বাংলাদেশের উচিত মার্কসের উক্তিকে ভুল প্রমাণিত করে দুর্ভিক্ষের অতীত ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং তদনুসারে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় এবং উত্তরণে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ।

নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তার ‘দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ’ (১৯৮১) গ্রন্থে বলেছেন, খাদ্যের অভাবে নয়, বরং জনগণের ক্রয়ক্ষমতার অভাবে এবং খাদ্যের বিপণন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে দুর্ভিক্ষ হয়।

একটি দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করে মহামারি ও দুর্ভিক্ষে। বৈশ্বিক করোনা মহামারি-উত্তর বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা বাংলাদেশ বেশ সফলতার সঙ্গেই মোকাবিলা করেছে। পূর্ববর্তী বড় দুর্ভিক্ষগুলো থেকে আমরা দেখতে পাই, কেবল ফসলহীনতা কিংবা খাদ্যস্বল্পতাই নয়, পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি, বিপণন অব্যস্থাপনা, শাসকদের একাংশের দুর্নীতি, লুটতরাজ প্রভৃতি বিষয় দুর্ভিক্ষ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। সেক্ষেত্রে উল্লেখ্য বিষয়গুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বব্যাপী যে খাদ্যঘাটতি, সংকট এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিশ্বব্যাপী যে রাজনীতি শুরু হয়েছে, তা মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রয়োজন স্বনির্ভর অর্থনীতি।

কৃষিভিত্তিক নাতিশীতোষ্ণ এ অঞ্চলের পতিত জমিকে যথাযথভাবে ব্যবহারের যে পরামর্শ সরকার প্রদান করেছে, তা বাস্তবায়নও করতে হবে যথাযথভাবেই। কেবল শিল্পায়ন ও নগরায়ণের দিকে না ঝুঁকে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিই হতে পারে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। ঔপনিবেশিক শাসন-পূর্ব যে স্বনির্ভর অর্থনীতির স্বর্ণালি অধ্যায়ের কথা আমরা ইতিহাস থেকে জানতে পাই, তাও ছিল সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর।

এছাড়া খাদ্য বিপণন ব্যবস্থাপনায় অসামঞ্জস্য শক্ত হাতে দূরীকরণ, খাদ্যের কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেট রোধে পদক্ষেপ গ্রহণ, খাদ্যকে জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা প্রভৃতি হতে পারে আসন্ন দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ। চড়া সুদে বৈদেশিক ও আন্তর্জাতিক ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণ নয়, বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে স্বনির্ভর অর্থনীতির প্রতি নজর দিলেই দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা সম্ভব।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়