মত-বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ-কোরিয়ার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং সম্ভাবনার হাতছানি

মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী: বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে অন্য অনেক সময়ের তুলনায় বর্তমানে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বেশ জোরালো। একটু তথ্য-উপাত্ত ঘাটলেই এর সত্যতা মেলে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে যেখানে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার রফতানির পরিমাণ ছিল ৪৬ দশমিক ডলার, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ছিল ২৫৪ দশমিক ৮৪ মিলিয়ন ডলার এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা উন্নীত হয়ে ৩৭০ দশমিক ৬৫ মিলিয়ন ডলার হয়েছে।
বাংলাদেশের ২০১৮-১৯ সালের রফতানি হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান ২১তম। তবে দক্ষিণ কোরিয়ায় বাংলাদেশের রফতানি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় রফতানি দ্রব্যের ক্ষেত্রে টেক্সটাইল পণ্যই সিংহভাগ জায়গা দখল করে আছে। রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশই আসছে টেক্সটাইল জাতীয় পণ্য থেকে। তার সঙ্গে রফতানি হচ্ছে মাছ, পাট, চামড়াজাত পণ্যসহ প্রায় ৩০০ রকমের পণ্য।
২০১৯ সালে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০৮৭ দশমিক ৫৭ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে ৮৩২ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে টেক্সটাইল খাতে। অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়ার টেক্সটাইল খাতের বিনিয়োগই পরবর্তী সময়ে রফতানিজাত পণ্যের আকারে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে ঢুকছে। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার এমন অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন, যারা বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদন করে তা দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে না এনে তৃতীয় কোনো দেশে রফতানি করছেন।
আশার কথা হলো, ইদানীং কোরিয়ার আমদানিকারকরা বাংলাদেশের সিরামিক পণ্য, মৎস্য (যেমন ইল ফিশ), বহুবিধ পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য, নিত্য পারিবারিক ব্যবহার্য পণ্যের ক্ষেত্রেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। কোরিয়াজুড়ে ‘ডেইসো’ শোরুমের প্রায় এক হাজার ৩০০ শাখা রয়েছে। যেখানে রয়েছে পারিবারিক প্রয়োজনীয় ব্যবহার্য প্রায় সব পণ্যের বিশাল ও বাহারি সমারোহ। এই কোম্পানিও বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানিতে আগ্রহী। কোরিয়াতে পলিথিন নিষিদ্ধ করার প্রেক্ষিতে পরিবেশবান্ধব পাটজাত ব্যাগ, কাগজের প্লেট, কাগজের কাপ, কাগজের প্যাকেট ইত্যাদি পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এ ধরনের পণ্যের চাহিদা আগ্রহ বাংলাদেশের উৎপাদনকারীদের পণ্য বহুমুখীকরণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। সাম্প্রতিককালের চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিরোধের কারণে অনেক কোরিয়ার ব্যবসায়ীদের তাদের কারখানা তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের চিন্তাভাবনা করছেন এবং সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশও তাদের বিবেচনায় আছে।
গত জুলাইয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী লি নাক ইয়নের বাংলাদেশ সফরকালে কোরীয় বিজনেস ডেলিগেশনের বাংলাদেশ সফর ও সেমিনার এক্ষেত্রে বেশ জোরালো ভূমিকা রেখেছে। সে সময় এবং পরবর্তী সময়ে দুদেশের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃক দক্ষিণ কোরিয়ার বিভিন্ন শহরে অবস্থিত আঞ্চলিক ও পণ্যভিত্তিক চেম্বারগুলোতে গিয়ে সেমিনার আয়োজন করে বাংলাদেশকে তুলে ধরার যে চলমান প্রচেষ্টা তাও এক্ষেত্রে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশমুখী কোরিয়ান ব্যবসায়ীদের এ আগ্রহকে ধরে রাখার জন্য বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের কোরিয়ার পণ্যভিত্তিক মেলাগুলোতে নিজেদের পণ্য নিয়ে অংশগ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে কোরিয়ার বসবাসরত বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা বেশি করে কোরীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে নিজেদের এ ব্যবসায়ে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ নিতে পারেন। অনেকদিন থেকে যেসব বাংলাদেশি কোরিয়ায় অবস্থান করার কারণে কোরিয়ান ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছেন তাদের পক্ষে কোরীয় ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশ সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলা সহজ এবং অনেকে এ সুবিধার সুযোগ গ্রহণ করে যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে ব্যবসায়ী কার্যক্রম শুরু করেছেন।
আশা করা যায়, সামনের দিনগুলোতে এ প্রবণতা আরও বাড়বে এবং বাংলাদেশে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ বাড়বে এবং একই সঙ্গে কোরিয়াতে বাংলাদেশের রফতানিও বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ কোরিয়া যেহেতু নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন র‌্যাংকিংয়ে (ওহহড়াধঃরড়হ ওহফবী) প্রথম সারির দেশ, তাই বাংলাদেশে কোরিয়ার বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তিগত স্থানান্তর দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের ভূমিকা রাখবে। অন্যদিকে কোরীয় বিনিয়োগকারীর জন্য বাংলাদেশে কর্তৃক ইইউ ও অন্যান্য দেশ থেকে প্রাপ্ত জিএসপি সুবিধার সুযোগ নেওয়া সম্ভবপর হবে। অর্থাৎ এটি দুদেশের জন্যই উইন-উইন অবস্থা সৃষ্টি করবে। তাই আগামীতে এ দুটো দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরালো হবে, এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

কাউন্সেলর (বাণিজ্য উইং)
বাংলাদেশ দূতাবাস, সিউল

ট্যাগ »

সর্বশেষ..