প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটাচ্ছে না শেভরন

নিজস্ব প্রতিবেদক: গত বছর হঠাৎ বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয় মার্কিন তেল-গ্যাস কোম্পানি শেভরন। তবে বছরখানেক নাটকীয়তার পর অবশেষে বাংলাদেশ না ছাড়ার কথা সরকারকে জানিয়েছে বহুজাতিক এ কোম্পানিটি। এছাড়া শেভরনকে বাংলাদেশে রাখতে আরও ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাবে অনুমোদন দিতে হচ্ছে সরকারকে।

গতকাল এক অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে জানান। এর আগে শেভরনের বাংলাদেশ ছাড়ার আবেদনও বাতিল করেছিল পেট্রোবাংলা। উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি (পিএসি) অনুযায়ী আবেদন না করায় গত জুনে তা বাতিল করা হয়।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলা চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ বৃহস্পতিবার শেয়ার বিজকে বলেন, শেভরন বাংলাদেশে নতুন করে ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। এ অর্থে তারা কম্প্রেসার স্থাপন করবে। কারণ ওখানে গ্যাসের চাপ কমে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের মাঝামাঝি থেকে শেভরন বাংলাদেশ ছাড়ার ঘোষণা দেয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় নিজেদের লোকসানের অজুহাতে শেভরন বাংলাদেশসহ এশীয় অঞ্চলের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। কিন্তু এর আগেও শেভরন তাদের বিবিয়ানা ক্ষেত্রে কম্প্রেসার স্থাপনের জন্য পেট্রোবাংলার কাছে প্রস্তাব দেয়। পেট্রোবাংলা ওই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় শেভরন বাংলাদেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত সরকারকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানায়। সরকার সে সময় শেভরনের হাতে থাকা তিনটি গ্যাসক্ষেত্র কিনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য একটি কোম্পানিকে গ্যাসের মজুত নিরূপণে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এদিকে শেভরন বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা না করেই গত ২৪ এপ্রিল চীনা হিমালয় এনার্জি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি সই করে। হিমালয় চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত জিং হুয়া কোম্পানির অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান। এরপর পেট্রোবাংলা শেয়ার হস্তান্তরে সায় না দিলে বিপাকে পড়ে শেভরন। গত ১৯ জুলাই শেভরন পেট্রোবাংলার সঙ্গে একটি বৈঠক করে। ওই বৈঠকের আলোচনার বিষয় শেভরন বা পেট্রোবাংলা কারও পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। তবে শেভরনকে ছাড়তে চায়নি পেট্রোবাংলা।

এ প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার এক ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, শেভরনের পারফরম্যান্স খুবই ভালো। তাই ক‚পগুলো কিনে নেওয়া হলেও প্রয়োজনে শেভরনকে অপারেটর হিসেবে রেখে দেওয়া হতো। এজন্য আলোচনা করা হয়েছিল। এছাড়া কোম্পানিটির প্রস্তাব সঠিক হয়নি জানানো হয়েছিল। তবে বিষয়টি সুরাহা হয়ে গেছে। চীনের কোম্পানির সঙ্গে শেভরনের যে চুক্তি হয়েছে, তা বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে।

নসরুল হামিদ বলেন, শেভরন বাংলাদেশ থেকে তাদের ব্যবসায় গুটিয়ে চলে যাচ্ছে না। উল্টো গ্যাসক‚প উন্নয়নে ৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশ থেকে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে কোম্পানিটি। এখন তারা আরও বিনিয়োগ করবে। শুধু শেভরন নয়, বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতে এখন অনেক বিদেশি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করতে চাইছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, টানাপড়নের মধ্যে শেভরন গ্যাসের দামবৃদ্ধি এবং কম্প্রেসার স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। এর মধ্যে সরকার কম্প্রেসার স্থাপনের বিষয়ে রাজি হওয়াতে বাংলাদেশ ছেড়ে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারকে সম্প্রতি জানিয়েছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে গ্যাস সংকটের কথা বলে বিদ্যমান খনি থেকে গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়। এর মধ্যে শেভরন বিবিয়ানাতে সাড়ে চার ট্রিলিয়ন ঘনফুটের (টিসিএফ) ওপরে মজুত থাকার দাবি করে।

পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় শেভরনের দাবি মানতে না চাইলে পিএসসির শর্ত অনুযায়ী তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে মজুত নির্ধারণ করা হয়। সেখানেও একটি মার্কিন কোম্পানিকে দিয়ে মজুত নির্ধারণ করে শেভরন তাদের দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর শেভরন বিবিয়ানাতে ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে নতুন ক‚প খননের পাশাপাশি প্রসেস প্লান্ট এবং অন্য অবকাঠামো নির্মাণ করে। পরবর্তী সময়ে শেভরন গ্যাসক্ষেত্রটিতে কম্প্রেসার স্থাপন করতে চাইলে পেট্রোবাংলা পুনঃবিনিয়োগের অনুমতি দেয়নি। পেট্রোবাংলার তরফ থেকে ওই সময় বলা হয়, ৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করে ক‚প খনন করার পরই কেন আবার কম্প্রেসার স্থাপন করা হবে। তাহলে শেভরন যে অতিরিক্ত মজুতের কথা বলছে, সেই মজুত কোথায়?

পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, সাধারণত একটি গ্যাসক্ষেত্রে যখন মজুত কমে আসে তখনই কম্প্রেসার বসিয়ে অতিরিক্ত প্রেশার দিয়ে গ্যাস তোলা হয়। কিন্তু শেভরনের আগের দাবি অনুযায়ী তো এখই এ ক্ষেত্রের এমন অবস্থা হওয়ার কথা নয়। আর কস্ট রিকভারির শর্ত অনুযায়ী এ ৪০ কোটি ডলার আমাদেরই পরিশোধ করতে হবে।