প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে অ্যাকসেঞ্চার

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে বিশ্বখ্যাত ব্যবস্থাপনা পরামর্শক, প্রযুক্তি সেবা ও আউটসোর্সিং কোম্পানি অ্যাকসেঞ্চার কমিউনিকেশন ইনফ্রাস্ট্রাচার সলিউশন লিমিটেড। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির সব কর্মীকে এক সঙ্গে ছাঁটাই করা হচ্ছে। গতকাল অ্যাকসেঞ্চারের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা পরশ কদম্ব স্বাক্ষরিত একটি ই-মেইলের মাধ্যমে ৬০০ কর্মীকে একযোগে ছাঁটাইয়ের নোটিস পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।

গ্রামীণফোন আইটির (জিপি আইটি) সঙ্গে জয়েন্টভেঞ্চারে প্রতিষ্ঠিত এ কোম্পানি ২০১৩ সালের ৩ জুলাই থেকে ৪০০ কর্মী নিয়ে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করার চার বছরের মধ্যেই তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে।

কর্মী ছাঁটাইয়ের নোটিস দিয়ে পাঠানো ই-মেইল বার্তায় বলা হয়, আগামী ৩০ নভেম্বরের পর কোম্পানির কোনো কর্মীর সঙ্গে নতুন করে চুক্তিবদ্ধ হবে না। ওই সময়ের মধ্যে সব কর্মীর দেনা-পাওনা পরিশোধ করে ওইদিনই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তবে ছাঁটাইয়ের চার মাস আগেই নোটিস দিয়ে কোম্পানি তার এগ্রিমেন্ট ঠিক রেখেছে বলেও ই-মেইলে উল্লেখ করা হয়।

জানা যায়, বাংলাদেশের বৃহত্তম মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের আইটি ডিভিশনকে আলাদা করে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি গ্রামীণফোন আইটি (জিপি আইটি) যাত্রা শুরু করে। শুরু থেকে কোম্পানিটি লোকসানের মুখে থাকায় ২০১৩ সালের ৩ জুলাই কোম্পানির ৫১ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেওয়া হয়। সে সময় এটি অধিগ্রহণ করে প্রযুক্তি সেবা ও আউটসোর্সিং কোম্পানি অ্যাকসেঞ্চার বিভি জয়েন্টভেঞ্চার হিসেবে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে।

প্রাথমিকভাবে অ্যাকসেঞ্চার বাংলাদেশ গ্রামীণফোনের আইটি ডিভিশন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা টেলিনরের ফাইন্যান্সিয়াল ও অ্যাকাউন্টসের সাপোর্ট প্রদান করে। পরবর্তীতে কাজের ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় অ্যাকসেঞ্চারের পক্ষে টেলিনরের কাছে আরও ১০ শতাংশ সেবামূল্য দাবি করা হয়। মূলত এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে টেলিনরের সঙ্গে অ্যাকসেঞ্চারের দ্বন্দ্ব ত্বরান্বিত হতে থাকে। পরবর্তীতে টেলিনর অ্যাকসেঞ্চারের সঙ্গে কাজের পরিধি কমিয়ে আনায় তারা বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার হুমকি দেয়। এ নিয়ে টেলিনরের সঙ্গে অ্যাকসেঞ্চারের মতবিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। এর জেরে বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা পুরোপুরি গুটিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে কোম্পানিটি। ফলশ্রুতিতে গতকাল সব কর্মীকে এক সঙ্গে চাকরি থেকে অব্যাহতির নোটিস দেওয়া হয়।

তবে হঠাৎ করে চাকরি হারানোর নোটিসে ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন কর্মীরা। তাদের অধিকাংশই নিজের পরবর্তী গন্তব্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মী বলেন, এ বয়সে প্রত্যাশা অনুযায়ী নতুন চাকরি পাওয়া বেশ দুঃসাধ্য। ঠিক জানি না আমাদের পরবর্তী গন্তব্য কোথায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাকসেঞ্চার এমপ্লয়ি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহীন আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, ৬০০ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আইটি কর্মী বেকার হওয়ার ঘটনা দেশে এটাই প্রথম। কর্মীদের পরিবার ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে কোম্পানি যাচ্ছেতাইভাবে কর্মী ছাঁটাই করতে পারে না। আমরা এ নিয়ে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বললেও কোনো আশানুরূপ ফল পাইনি।

দেশে আইটি উন্নয়নের জোয়ারের সময় অ্যাকসেঞ্চারের মতো প্রতিষ্ঠিত ও বড় আইটি কোম্পানির ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে চলে যাওয়াকে আইটি সেক্টরের জন্য বড় হুমকি বলে মনে করছেন শাহীন আহমেদ। তিনি জানান, এ সমস্যার গভীরে না গিয়ে কিংবা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা না করে এভাবে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গেলে দেশের আইটি সেক্টরের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয় পড়বে। সামনের দিনগুলোতে আইটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন নিয়ে হাহাকার আরও বাড়বে। বাইরে থেকে নতুন কোনো বিনিয়োগ আসবে না। ফলে আমাদের প্রত্যাশিত ডিজিটাইজেশনের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। দেশের আইটি উন্নয়নের কথা চিন্তা করে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

কর্মীদের ভবিষ্যৎ ও পরিবারের কথা চিন্তা করে তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে অ্যাকসেঞ্চার এমপ্লয়ি ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও মন্ত্রণালয়গুলোয় চিঠি পাঠিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণও করা হয়েছে। এক সঙ্গে কোম্পানির সব কর্মীকে ছাঁটাইয়ের নোটিস দিলেও শ্রম অধিদফতর, মানবাধিকার সংগঠন ও আইসিটি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি।

এদিকে অ্যাকসেঞ্চারের পর গ্রামীণফোনের আইটি ডিভিশনের সব কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে ভারতের আইটি কনসালটেন্সি ফার্ম ‘উইপ্রো’কে। অ্যাকসেঞ্চার কর্মীরা সেখানে কাজের সুযোগ পেতে পারেন বলে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রায়হান শামসির পক্ষ থেকে সব কর্মীকে ই-মেইল করা হয়। কর্মীদের অভিযোগ, প্রায় আড়াইশ কর্মী উইপ্রোতে আবেদন করলেও এখন পর্যন্ত মাত্র সাতজন ডাক পেয়েছেন। তবে তাদের কেউই নিয়োগ পাননি। এ বিষয়ে জানতে অ্যাকসেঞ্চারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাকে পাওয়া যায়নি। অ্যাকসেঞ্চারের এমপ্লয়ি রিলেশন ম্যানেজার ইফতেখার এইচ চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

উল্লেখ্য, এর আগে গত এপ্রিলে জোরপূর্বক কর্মী ছাঁটাইয়ের অভিযোগ আছে অ্যাকসেঞ্চার কমিউনিকেশন ইনফ্রাস্ট্রাচার সলিউশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে। বর্তমানে অ্যাকসেঞ্চার কমিউনিকেশন বাংলাদেশ ছাড়াও বিশ্বের ১২০টি দেশে কাজ পরিচালনা করছে।