মত-বিশ্লেষণ

বাংলাদেশ-নেপাল সম্পর্ক বন্ধুত্বের নতুন মাত্রা

শেখ রফিকউজ্জামান: নেপাল হিমালয়ের শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে গড়ে ওঠা  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বেষ্টিত একটি দেশ। আয়তনে খুব বেশি বড় নয়, জনসংখ্যাও প্রায় দুই কোটির কিছু বেশি। নেপালের রয়েছে অদ্ভুত রহস্যময়তা। হিমালয়ের উঁচু-নিচু পর্বত আর সীমিত সমতল ভূমি, হিন্দু মন্দির আর বৌদ্ধ স্তূপ। পাহাড়ের গায়ে মেঘ-রোদের খেলা কিংবা জমজমাট ক্যাসিনো, দরবার স্কয়ারে কুমারী মাতা সব মিলে নেপালের ভীষণ এক মাদকতা রয়েছে। মেঘহীন আকাশে পর্বত চূড়া অন্নপূর্ণায় সূর্যোদয় দেখতেই পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক ছুটে আসে। কাঠমান্ডুর স্বয়ম্ভুনাথ মন্দিরে বুদ্ধের নির্মিলিত চোখ যেন পাহারা দিচ্ছে গোটা শহর।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ও নেপালের সম্পর্ক খুবই ভালো। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেপাল আমাদের সমর্থন দিয়েছিল এবং বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেছিল। ভৌগোলিকভাবে আমাদের অন্যতম নিকটতম প্রতিবেশী। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জš§শতবার্ষিকী মুজিববর্ষের অনুষ্ঠানে নেপালের রাষ্ট্রপতির সফরের মধ্য দিয়ে সে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হলো। উল্লেখ্য, ৮ এপ্রিল ১৯৭২ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক নিরন্তর সামনে এগিয়েছে।

সম্প্রতি নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যাদেবী ভাণ্ডারীর বাংলাদেশ সফরের বেশ কিছু ইতিবাচক দিক দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই সফরে নেপালের রাষ্ট্রপতি সৈয়দপুর ও বিজয়নগর বিমান চলাচলের নতুন রুট চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি দারুণ প্রস্তাব। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগের পুরোটাই এখন আকাশপথে ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটে সীমিত। এর বাইরে সড়ক পথে নেপালে যেতে হলে ভারতের ট্রানজিট ভিসা নিতে হয় এবং একাধিকবার ইমিগ্রেশন পার হতে হয়। এটি দুই দেশের মধ্যে চালু থাকা ভিসা-ফ্রি যাতায়াতের প্রকৃত সুফল প্রাপ্তিতে বড় বাধা।

কিন্তু নীলফামারীর সৈয়দপুর থেকে নেপালের বিরাটনগরে মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটের আকাশপথে চলাচল চালু হলে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়বে। সেক্ষেত্রে নেপালের শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা এবং বাংলাদেশের পর্যটকরা অনেক সহজে এবং কম খরচে যাতায়াত করতে পারবেন। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজগুলোতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেপালি শিক্ষার্থী শিক্ষা অর্জন করছেন। একইভাবে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নেপালে বৌদ্ধশাস্ত্র, ঔষধ বিজ্ঞান পড়ছেন। দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত সহজ করতে সৈয়দপুর ও বিজয়নগরের মধ্যে ফ্লাইট চলাচল চালু হলে আরাও বিপুলসংখ্যক নেপালি শিক্ষার্থী আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা নিতে আসতে পারবেন। খুব কম সংখ্যক নেপালি নাগরিক বাংলাদেশে ভ্রমণ করতে আসেন। এর অন্যতম প্রধান কারণ ভ্রমণে ট্রানজিট জটিলতা। সৈয়দপুর-বিজয়নগর ফ্লাইট চালুর ফলে বাংলাদেশে নেপালি নাগরিকদের ভ্রমণ আরও সহজ হবে এবং বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ফ্লাইট চালুর জন্য সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আধুনিকায়ন ও আন্তর্জাতিক মানের করা হলে আমাদের উত্তরবঙ্গের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটেও কিছুটা পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উচিত যত দ্রুত সম্ভব নেপালের এই প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া। এছাড়া সেই সঙ্গে রেল যোগাযোগ খাতেও দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশি পর্যটকরা নেপালের পার্বত্য অঞ্চলে এবং নেপালি পর্যটকরা বাংলাদেশের সমুদ্রসৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ ও সংস্কৃতি বিনিময়ের সুযোগ পাবেন। ২০১০ সালে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলো স্থলবেষ্টিত নেপাল ও ভুটানের ব্যবহারের সুযোগ প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। নেপাল চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দর ব্যবহারে আগ্রহী। এক্ষেত্রে মোডালিটিজ নির্ধারণের কাজ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন নেটওয়ার্ক ব্যবহারের আগ্রহ প্রকাশ করেছে নেপাল।

ব্যবসা, জলবিদ্যুৎ, পর্যটন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জলজ সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে দুই দেশ। নেপাল শতভাগ আমদানিনির্ভর দেশ। আর নেপাল সব থেকে বেশি পণ্য আমদানি করে ভারত থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে নেপাল ভারতের বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করেছে। আর এ সুযোগটি বাংলাদেশের কাজে লাগানো উচিত বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। পর্যটন শিল্পনির্ভর দেশ হওয়ায় দেশি-বিদেশি বহু পর্যটকের নেপালে আনাগোনা। এই ক্ষেত্রে আমরা আমাদের বিভিন্ন দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও ব্র?্যান্ড নেপালে রপ্তানির ব্যবস্থা করতে পারি। এতে আমাদের দেশীয় পণ্য ও ব্র?্যান্ডের পরিচিতিও বাড়বে। বাংলাদেশের ৭৪টি পণ্যকে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে নেপাল। বাংলাদেশ অবশ্য মোট ১৭৪টি পণ্যের ক্ষেত্রে নেপালের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা অনুমতি দিতে কাঠমান্ডু সরকারের প্রতি আবেদন জানিয়েছিল। এই তালিকায় আছে ওষুধ, তৈরি পোশাক, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, রেফ্রিজারেটর এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক গৃহসামগ্রীও। নেপাল সরকার ৭৪টি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশের অনুমোদন দিতে সম্মত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের পর নেপালের সঙ্গেই বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ভালো।

বাংলাদেশ প্রধানত যেসব পণ্য নেপালে রপ্তানি করে, তার মধ্যে আছে কৃষিপণ্য, রাসায়নিক পণ্য, কাঁচা পাট, ওষুধ, তুলা, সোলার ব্যাটারি, তৈরি পোশাক, প্রসাধনসামগ্রী ও প্লাস্টিকের ফার্নিচার।

অন্যদিকে নেপাল থেকে আমদানি করে পানীয়, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম, প্লাস্টিকের পণ্য, রাবার, ভ্রমণ-সম্পর্কিত পণ্য, কাঠের মণ্ডসহ আরও অনেক কিছু। তবে শুধু নেপালই যে বাংলাদেশি পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিচ্ছে তা নয়, বাংলাদেশের কাছ থেকেও ১০৮টি পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধার বিষয়ে সম্মতি আদায় করে নিয়েছে নেপাল। এসব পণ্যের মধ্যে আছে যব, সবজি, মটরশুটি, গম, ফলমূল, জুস, দুগ্ধজাত পণ্য ও হাতে বানানো কাগজ প্রভৃতি আছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে নেপালের বাণিজ্য ঘাটতি আছে। বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও যদি সম্প্রসারণ করা হয় তাহলে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি আরও কমে আসবে। কাঠমান্ডু (নেপাল) প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও পণ্য উৎপাদনে হিমালয়কন্যা নেপাল অনেক পিছিয়ে। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির জন্য সব সময় ইউরোপ আমেরিকার বাজার খোঁজেন। অথচ প্রতিবেশী দেশ নেপালই তাদের জন্য একটি লাভজনক বাজার হতে পারে। কারণ নেপাল কোনো কিছু উৎপাদন করতে পারে না। খুব বড় ব্যবসায়ীদের জন্য না হলেও মধ্যম শ্রেণির ব্যবসায়ীরা হিমালয়ের এ দেশে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারেন।

গার্মেন্টসে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও নেপালের গার্মেন্টস বাজার একচেটিয়া চীনের দখলে। শুধু গার্মেন্টস নয়। পোশাক থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, এমনকি সিরামিক, আসবাবপত্র প্রতিটি জিনিসেরই চাহিদা আছে নেপালে। বাংলাদেশের ওষুধের বিকল্প আর কিছুই ভাবতে পারে না নেপাল। নেপালে এখনও বিদ্যুত ঘাটতি আছে। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও নেপাল একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এক্ষেত্রে জলবিদ্যুৎ বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি। নেপালে শীতকালে প্রায় ১০-১২ ঘণ্টা এবং গরমকালে প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের রেকর্ড আছে। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৭৬০ মেগাওয়াটের মতো। কিন্তু প্রয়োজন প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এই বিরাট ঘাটতি এখন পূর্ণ করতে না পারলেও প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে নেপালের এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে। আর অদূর ভবিষ্যতে নেপালের কাছ থেকে এ বিদ্যুৎ নিতে এখন থেকেই কাজ করছে বাংলাদেশ।

এছাড়া পর্যটন শিল্পনির্ভর নেপালের থেকে দিক নির্দেশনা ও সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের পর্যটন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে পারেন। বাংলাদেশ, নেপাল দুই দেশই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে রয়েছে। নেপালের হিমালয় পর্বতমালায় বরফের স্তর ও বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় জলস্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে অনাবৃষ্টি, অনিয়মিত বর্ষাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যাচ্ছে। সংকটগুলো সমাধান ও মোকাবিলায় দুদেশ একসঙ্গে কাজ করাসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশ, নেপাল সার্কে (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) নিকটতম প্রতিবেশী। এ দুই দেশের পারস্পরিক নিবিড় আন্তঃসম্পর্ক গড়ে ওঠা জরুরি। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বিষয় তো আছেই, সামাজিক-সাংস্কৃতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ হওয়ার বিষয়টিও ভীষণভাবে প্রাসঙ্গিক। ভবিষ্যতে এই দুটি একসঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় বন্ধুত্বের এক নজির স্থাপন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশকে সমগ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গেটওয়ে তথা মাল্টিমোডাল কানেক্টিভিটি হাবে রূপান্তরিত করতে হলে ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত পরিবহন-সংযোগ অবারিত ও সুগম করার নানাবিধ উদ্যোগ নিতে হবে।

শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..