প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ টিআইবি

শীর্ষ ঋণখেলাপির ঋণ পুনঃতফসিল

নিজস্ব প্রতিবেদক” ‘বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের নিজেদের নীতিমালাকেই পাশ কাটিয়ে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ দিতে সম্মত হয়েছে’ বলে গণমাধ্যমে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটির গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ‘এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের হাতে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে এবং সংকটে জর্জরিত ব্যাংক খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিবর্তে তা ব্যাংক খাতকে আরও বেহাল অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘যেভাবে বেক্সিমকো লিমিটেডকে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তা নজিরবিহীন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক যে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে, তারই প্রমাণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘বেক্সিমকো লিমিটেডের যে ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের খবর বেরিয়েছে তা চাহিদা ঋণ, সংজ্ঞাগতভাবেই পরিশোধের মেয়াদ এক বছরের বেশি হওয়ার নিয়ম নেই। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের বৃহৎ ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ নীতিমালায় তারা এক দফা অন্যায্য সুবিধা পেয়েছে। এখন আবার সেই নীতিমালাকে পাশ কাটিয়ে তাদের ছয় বছরের জায়গায় ১২ বছরে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, যেন প্রতিষ্ঠানটি খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া থেকে বেঁচে যেতে পারে। সংবাদমাধ্যম থেকে আমরা আরও জানতে পেরেছি যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিষয়টি গোপন রাখতে কোনো সার্কুলারও দেয়নি। এভাবে জনগণকে অন্ধকারে রেখে একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার ঘটনায় আমরা রীতিমতো আতঙ্কিত বোধ করছি।’
‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সার্বিকভাবে ব্যাংক খাতই কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে’ এমন আশঙ্কা ব্যক্ত করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘শাসকগোষ্ঠী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেভাবে খেলাপি হয়ে যাওয়া বা অন্যায্য সুবিধার মাধ্যমে পুনঃতফসিলীকরণের সুবিধা পাওয়া ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে দেশে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংক খাতকে ব্যবহার করে জনগণের করের টাকার হরিলুট হয়েছে। এই লুটেরাদের একাংশই আবার ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের অন্যায্য সুবিধা নিয়ে আইনপ্রণেতা হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। লক্ষাধিক কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ও ভয়াবহ তারল্য সংকটের আশঙ্কাজনক বাস্তবতার মাঝে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালনে বারংবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। এরই মধ্যে সরকার বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অলস অর্থ ব্যাংক খাত থেকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এখন আমরা শঙ্কিত, এ কথা বলাটাও কম বলা হবে।’
সেইসঙ্গে ‘দেশের অর্থনীতি এমন এক উল্টো পথে হাঁটছে যে এখনই এর রাশ টেনে ধরা না গেলে ফিরে আসার আর কোনো পথ থাকবে না’ বলে মন্তব্য করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, ‘কাগজে-কলমে উচ্চ প্রবৃদ্ধি, তীব্র তারল্য সংকট আর ব্যাংক খাতের এই দুরবস্থার মধ্যে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একধরনের বুদবুদ তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা যায়, যা যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে। ফলে দেশের অর্থনীতি কার্যত মুখ থুবড়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংক খাতের সংস্কার আর শুধু কাগুজে প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে চাই যে, ক্ষমতাসীন মহল পরিস্থিতির গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারবে এবং কাক্সিক্ষত সংস্কারের জন্য খাতসংশ্লিষ্ট নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে দ্রুত একটি কমিশন গঠন করবে, যারা বাস্তবতার নিরিখে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পেশ করবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকার কায়েমি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে তা বাস্তবায়ন করবে।’

ট্যাগ »

সর্বশেষ..