দিনের খবর প্রথম পাতা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারে ঋণগ্রহীতার তথ্যে বিভ্রাট

শেখ আবু তালেব: ঋণগ্রহীতাদের সব তথ্য সংরক্ষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য এন্টারপ্রাইজ ডেটা ওয়্যারহাউস (ইডিডব্লিউ) নামে একটি সফটওয়্যার রয়েছে। এতে সময়ে সময়ে বিভিন্ন তথ্য জমা দেয় ঋণ বিতরণকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গ্রহীতার বিষয়ে ভুল তথ্য দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। ব্যাংক পরিদর্শনে গিয়ে সার্ভারে সরবরাহ করা তথ্যর সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে না।

তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে এমন অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, জমাকৃত তথ্যর সঠিকতা যাচাই করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে এমন তথ্য।

এন্টারপ্রাইজ ডেটা ওয়্যারহাউস সফটওয়্যারে মূলত ঋণগ্রহীতা বা উদ্যোক্তাদের ৩১টি টেমপ্লেট রয়েছে। এখানে প্রয়োজীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নির্দিষ্ট একটি ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে এখানে তথ্য জমা করে। এসব তথ্যর মধ্যে রয়েছে ঋণগ্রহীতার ঋণের পরিমাণ, ব্যবসার ধরন, ঋণের অবস্থা, কিস্তির পরিমাণ, বকেয়া কিস্তি, মর্টগেজকৃত সম্পত্তির পরিমাণ, অবস্থান, সম্পদের প্রকৃতি ও টিআইনসহ কোম্পানির তথ্যাদি। বিশেষ করে রয়েছে খেলাপি, কতবার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে, ঝুঁকি ও আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য ও বিদেশি উৎসের ঋণ তথ্য।

এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে ব্যাংক পরিদর্শনে এসব তথ্য ব্যবহার করা হয়। এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগদ করার কথা ব্যাংকগুলোর। সেই হালনাগাদ তথ্যই বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। কিন্তু একে তো তথ্যর হালনাগাদ করা হচ্ছে না, অন্যদিকে ভুল তথ্য দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংক পরিদর্শকরা অনেক তথ্যরই মিল খুঁজে পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে তথ্য নিয়ে পরিদর্শন শুরু করেছেন, তা মাঝপথেই গিয়ে আটকে যায়।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বাণিজ্যিক একটি ব্যাংকের এক ঋণগ্রহীতার ঋণ পরিশোধের চিত্রে কিছুটা সন্দেহ হয়। পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাহক ভিন্ন একটি ব্যাংকের চেক জমা দিয়েছেন ঋণদাতা ব্যাংকের আরেক শাখায়। সেই শাখায় টাকা জমা হয়। জমা হওয়া হিসাবের চেক জমা দেন ঋণ ইস্যু হওয়া শাখায়। পরিদর্শনে গিয়ে জানা যায়, ভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অর্থ পরিশোধ করেছেন। দুই ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা একজনই। এক ব্যাংকের ঋণ দিয়ে আরেক ব্যাংকের ঋণের অর্থ পরিশোধ করেছেন। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার লঙ্ঘন। এ তথ্যটি লুকানো হয়।

এছাড়া মর্টগেজকৃত সম্পত্তির পরিমাণ বেশি করে দেখানো হচ্ছে। আবার রপ্তানিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের বেলায় তথ্য ভুল দেয়া হচ্ছে বেশি। বিশেষ করে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির বেলায়। সেখানে দেখা যায়, এক কোম্পানি মাস্টার এলসি পায়। সেই এলসির বিপরীতে আরেক কোম্পানিকে কাঁচামালের ক্রয়াদেশ দেয়। কাঁচামালের ক্রয়াদেশ পাওয়া কোম্পানিটি ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নেয় সেই কাগজ দেখিয়ে। পরে দেখা যায়, সব কোম্পানিই একই গ্রুপভুক্ত। এখানে শুধু কাগজের হাত-বদল হয়। এভাবে একটি কোম্পানি তার সম্পত্তি বা সক্ষমতার অতিরিক্ত ঋণ পেয়ে যাচ্ছে। ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড ঋণ মিলিয়ে প্রচুর ঋণ নিয়ে যাচ্ছে গ্রুপটি। পরে নন-ফান্ডেড ঋণগুলো পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংক বাধ্য হয়ে ফোর্সড ঋণ তৈরি করছে।

এতে বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ফোসর্ড ঋণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে, যা সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণেও উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, এসব তথ্যর সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে ব্যাংকের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সভায় বিষয়টি আলোচিত হয়।

সিদ্ধান্ত হয়, ব্যাংক কর্তৃক পাঠানো সব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হবে। সঠিক তথ্য সফটওয়্যারে আপলোড করা হবে। সেই তথ্য সময়ে সময়ে পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন ও বাতিল করা হবে।  নিয়মিত হালনাগাদ করা হবে। ব্যাংক পরিদর্শনের সময়ে সেই তথ্য ব্যবহার করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য একটি কমিটি কাজ করবে। কমিটি নিয়মিত সংশ্লিষ্ট বিভাগে প্রতিবেদন জমা দেবে। সে আলোকে ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ ও সতর্ক করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। আরও সিদ্ধান্ত হয়, এন্টারপ্রাইজ ডেটা ওয়্যারহাউসের তৈরি করা প্রতিবেদনের তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ ইচ্ছা করলে ব্যবহার করতে পারবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১৪ লাখ ৪৮ হাজার ২১৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়ে পড়েছে ৮৫ হাজার কোটি টাকা। প্রায় তিন লাখ গ্রহীতার কাছে রয়েছে এসব ঋণ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..