দিনের খবর পত্রিকা প্রথম পাতা

বাংলা আমার মায়ের ভাষা

কাজী সালমা সুলতানা: বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে পূর্ববাংলার নারীরাও ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে ভাষা আন্দোলনের সব ধরনের মিটিং-মিছিল, সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা রাতে লুকিয়ে ভাষার দাবিতে বিভিন্ন সেøাগান সংবলিত পোস্টার আঁকেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি নারীরা ব্যারিকেড ভাঙতে পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করেন। সেদিন পুলিশের গুলিতে যারা আহত হন তাদের চিকিৎসাতে বিশেষ ভ‚মিকা রাখেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রীরা। আহতদের চিকিৎসার জন্য তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে চাঁদা তুলে আনতেন। পুলিশের তাড়া খাওয়া ছাত্রদের আটক হওয়া থেকে বাঁচাতে তারা সহযোগিতা করতেন। আন্দোলনকারীদের খরচ চালানোর জন্য অনেক গৃহিণী তাদের অলঙ্কার পর্যন্ত খুলে দেন।
ভাষা আন্দোলনে জড়িত হওয়ার কারণে অনেক নারীকে জেল খাটতেও হয়েছে। তাদের কেউ হারিয়েছেন সংসার, কেউবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। সেসব ঘটনা নিয়ে দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ, ভাষাসৈনিকদের স্মৃতিচারণা এবং দলিল ও বইতে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীতে লেখেন, ‘১১ মার্চ ভোর বেলা থেকে শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন ভবন ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করল। সকাল ৮টায় পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করলে কয়েকজন ছাত্রী বাধা দিতে গিয়ে পুলিশের লাঠিপেটার শিকার হন। ঠিক ওই মুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার অধিবেশন চলছিল। আনোয়ারা খাতুন ও অনেক মুসলিম লীগ সদস্য মুসলিম লীগ পার্টিও বিরুদ্ধে আইনসভার প্রবল প্রতিবাদ করে।’ আত্মজীবনীতে তিনি আরও বলেন, “যে পাঁচদিন আমরা জেলে ছিলাম, সকাল ১০টায় স্কুলের মেয়েরা (মুসলিম গার্লস স্কুল) ছাদে উঠে সেøাগান দিতে শুরু করত আর ৪টায় শেষ করত। ছোট ছোট মেয়েরা একটুও ক্লান্ত হতো না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘ পুলিশি জুলুম চলবে না’Ñএমন নানা ধরনের সেøাগান দিতে থাকত। ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নারীদের অনবদ্য ভ‚মিকা ছিল।”
১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিস গঠিত হয়। সে সময় নারী ভাষাসৈনিকদের মধ্যে আবুল কাশেমের স্ত্রী রাহেলা, বোন রহিমা এবং রাহেলার ভাইয়ের স্ত্রী রোকেয়া আন্দোলনকারী ছাত্রদের আজিমপুরের বাসায় দীর্ঘদিন রান্না করে খাওয়ান। ১৯৫২ সালের ২৩ জানুয়ারি রাত ৪টার দিকে আবুল কাশেমের বাসা ঘিরে ফেলে পাকিস্তান পুলিশ। বাসার ভেতরে আবুল কাশেম ও আব্দুল গফুরসহ অন্যরা ভাষা আন্দোলনের মুখপাত্র সৈনিক পত্রিকা প্রকাশের কাজে ব্যস্ত ছিল। পুলিশ দরজায় বারবার আঘাত করলে মিসেস রাহেলা কাশেম গভীর রাতে পারিবারিক বাসায় পুলিশের প্রবেশের চেষ্টার বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে দীর্ঘ তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এই সুযোগে আবুল কাশেমসহ অন্যরা পেছনের দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এরপর পুলিশ ভেতরে ঢুকে কাউকে না পেয়ে চলে যায়। ভাষা আন্দোলন শুরুর দিকে অন্দরমহলের নারীদের অবদানও আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচিকে এগিয়ে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..