প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বাগে আনতে না পেরে সুকৌশলে পেছাল বাংলাদেশ ব্যাংক

এডিআর সমন্বয়

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ঋণ বিতরণের প্রবণতায় রাশ টানতে ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) ৮৩ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনতে চার দফায় ব্যাংকগুলোকে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে অধিকাংশ ব্যাংক এডিআর সমন্বয় করতে পারলেও ১০-১২ ব্যাংকের এডিআর নির্ধারিত সীমার বেশি ছিল। তবে সময় শেষ হওয়ার আগেই সব ব্যাংকের জন্যই এডিআর কিছুটা বাড়িয়ে আগের অবস্থানে অর্থাৎ ৮৫ শতাংশে ফিরিয়ে নিয়ে গেল বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকগুলো সীমার অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করায় ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এডিআর কমিয়ে ৮৩ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নির্দেশনার আলোকে প্রতিটি ব্যাংককে তাদের প্রতি ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৮৩ টাকা ৫০ পয়সা ঋণ হিসেবে বিতরণের সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু চার দফায় পৌনে দুই বছর সময় বাড়িয়েও অনেক ব্যাংকের এডিআর নির্দেশিত সীমায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশন বিভাগ থেকে এক সার্কুলার জারি করে বলা হয়, সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের মূলধন ভিত্তি, তারল্য পরিস্থিতি, আন্তঃব্যাংক নির্ভরশীলতা এবং সর্বোপরি ব্যাসেল-৩ অনুসারে লিকুইডিটি কাভারেজ রেশিও (এলসিআর) ও নিট স্ট্যাবল ফান্ডিং রেশিওর (এনএসএফআর) নির্ধারিত মাত্রা সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত প্রচলিত ধারার ব্যাংকের জন্য এডিআর সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হলো।
এর মধ্যে ৮১ দশমিক ৫০ শতাংশ স্বাভাবিক এডিআর এবং বাকি তিন দশমিক ৫০ শতাংশ ব্যাংকের পর্ষদের সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত বিতরণ করা যাবে। অর্থাৎ একটি ব্যাংক তার আমানতের সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে পারবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুকৌশলে ২০১৬ সালে জারি করা নির্দেশনার সূত্র ধরে ৮১ দশমিক ৫০ শতাংশ এডিআর নির্ধারণের কথা উল্লেখ করেছে সার্কুলারে।
একইভাবে গত বছরের জানুয়ারিতে শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত (আইডিআর) ৯০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮৯ শতাংশে নামিয়ে আনার নির্দেশনা দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নির্দেশনার বাস্তবায়ন করতে না পারায় চার দফা সময় বাড়িয়ে ব্যাংকগুলোকে চলতি মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। গতকাল একই সার্কুলারে আইডিআর আবার বাড়িয়ে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে একটি শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংক স্বাভাবিকভাবেই ৮৯ শতাংশ ঋণ বিতরণ করার পাশাপাশি আরও এক শতাংশ পর্ষদের সিদ্ধান্তক্রমে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করতে পারবে।
২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ওই বছরের ডিসেম্বর শেষে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১৮ দশমিক ১০ শতাংশ, যেখানে লক্ষ্য ছিল ১৬ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মুদ্রানীতি ঘোষণা অনুষ্ঠানে ঋণ প্রবৃদ্ধির লাগাম টানার ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেছিলেন, ‘ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের যে সীমা আছে, তাতে নানা সমস্যা হচ্ছে। গুণগত মানের ঋণ নিশ্চিত হচ্ছে না। ২০টি ব্যাংক সীমার বেশি ঋণ দিয়েছে। এজন্য সীমা কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হবে।’ এর পরের দিন (৩০ জানুয়ারি) এডিআর ৮৫ থেকে কমিয়ে ৮৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আইডিআর ৯০ থেকে কমিয়ে ৮৯ শতাংশ নির্ধারণ করে সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী এডিআর সমন্বয়ে ব্যাংকগুলোকে প্রথম দফায় জুন পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। ওই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো এডিআর সমন্বয়ের সময় বাড়িয়ে ওই বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর পর আবার ৯ এপ্রিল আরেক দফা সময় বাড়িয়ে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত সময় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর চলতি বছরের মার্চে আরও ছয় মাস অর্থাৎ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। সেই সময় শেষ হওয়ার আগেই এডিআর আবার আগের অবস্থানে ফিরিয়ে নিয়ে গেল বাংলাদেশ ব্যাংক। অথচ এ সময়ে এডিআর সমন্বয় করতে গিয়ে অনেক ব্যাংক উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করতে শুরু করে। কেননা এডিআর কমিয়ে আনতে ব্যাংকগুলোকে হয় ঋণ কমিয়ে আনতে হতো, অথবা নতুন আমানত সংগ্রহ করে এডিআর সমন্বয় করতে হতো। ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আগেই আভাস দিয়েছিলেন, এতে আমানত সংগ্রহে অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হবে এবং পরে তার প্রমাণও পাওয়া যায়।
জানা গেছে, বর্তমানে দেশে কার্যরত ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৪৭টি ব্যাংক নির্ধারিত সীমায় এডিআর নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু বাকি ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রচলিত ধারার কোনো কোনোটির এডিআর ৮৫ শতাংশেরও ওপরেও ছিল। আবার শরিয়াহ্ভিত্তিক ব্যাংকগুলোর কোনো কোনোটির আইডিআর ৯০ শতাংশের অনেক ওপরেও ছিল।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..