মত-বিশ্লেষণ

বাঙালির মহাকাশ বিজয়

. শেফায়েত হোসেন: বাঙালির মহাকাশ জয়ের স্বপ্ন পূরণের দিন ২০১৮ সালের ১২ মে। এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উৎক্ষেপণ করা হয় দেশের প্রথম যোগাযোগ উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই ঘটনাটি ঘটেছিল বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৫ মিনিটে। বিশ্বে স্পেস সোসাইটিতে ৫৭তম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশ হিসেবে লিপিবদ্ধ হলো বাংলাদেশের নাম।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় চলমান ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার এক উজ্জ্বল সোপান এর মাধ্যমে অতিক্রান্ত হলো। টেলিকম প্রযুক্তির অপার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (আইটিইউ) এবং ইউপিইউয়ের সদস্যপদ লাভ করে।  ১৯৭৫ সালের জুন মাসে বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূ-কেন্দ্র উদ্বোধনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের আধুনিক টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার সূচনা করেন। তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশকে ৫৭তম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী গর্বিত দেশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

মহাশূন্যে উৎক্ষেপিত তিন হাজার ৭০০ কিলোগ্রাম ওজনের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নিরবচ্ছিন্নভাবে ১৫ বছরের অধিক সময় মহাশূন্যে থেকে সেবা দিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ সুবিধার ব্যাপক প্রসার ঘটছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑসমগ্র বাংলাদেশের স্থল ও জলসীমায় নিরবচ্ছিন্নভাবে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচারের নিশ্চয়তা, বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রদেয় বার্ষিক ১৪ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয়, ট্রান্সপন্ডার লিজের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়, টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবার পাশাপাশি টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল লার্নিং, ডিজিটাল এডুকেশন, ডিটিএইচ প্রভৃতি সেবা প্রদান করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে সাবমেরিন অথবা টেরিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেট যোগাযোগ সুবিধা প্রদান, স্যাটেলাইটের বিভিন্ন সেবার লাইসেন্স ফি ও স্পেকট্রাম চার্জ বাবদ সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, স্যাটেলাইট টেকনোলজি এবং সেবার প্রসারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর ১৪টি সি ব্যান্ড এবং ২৬টি কিউ ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডারসহ মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। ৪০টি ট্রান্সপন্ডার দ্বারা বাংলাদেশ, সার্কভুক্ত দেশ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ‘স্তান’ভুক্ত দেশগুলোয় টেলিযোগাযোগ সুবিধা প্রদান করা যাবে। এরই মধ্যে ফিলিপাইন ও নেপালে স্যাটেলাইট সেবা বিক্রির প্রক্রিয়া চলছে। 

বর্তমানে বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডসহ দেশের ৩৬টি টেলিভিশন চ্যানেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মাধ্যমে অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ড সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ও আফ্রিকায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট এবং রেডিও স্টেশনগুলো কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মিশন লাইফ ১৫ বছর এবং ডিজাইন লাইফ ১৮ বছর। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানুষের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টি সামনে রেখে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ২০২৩ সালের মধ্যে দ্বিতীয় স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ প্রযুক্তির লেটেস্ট ভার্সন ফাইভ-জি ট্রায়াল সম্পন্ন করেছে এবং ফাইভ-জি পলিসি চূড়ান্ত ও ইকোসিস্টেম তৈরির কাজ হচ্ছে। দেশে ইন্টারনেটের বর্ধিত চাহিদা মেটাতে তৃতীয় সাবমেরিন কেব্ল সংযোগের কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই একই সময়ের মধ্যে দেশের চর, দ্বীপ, হাওর, দুর্গম অঞ্চলসহ দেশের প্রতিটি অংশে মানুষের দোরগোড়ায় উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা পৌঁছে দিতে দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে চলেছে।

পিআইডি নিবন্ধ

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..