মত-বিশ্লেষণ

বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অগ্রসৈনিক কাজী আরেফ

কাজী সালমা সুলতানা: মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, অসাম্প্রদায়িক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পুরোধা কাজী আরেফ আহমেদের আজ ৭৯তম জন্মবাষিকী। দেশ ভাগ, হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভাষা আন্দোলন, বৈষম্যমূলক ও সাম্প্রদায়িক, জাতিগত নিপীড়ন প্রভৃতি ঘটনা কিশোর বয়সেই তাকে রাজনীতিতে টেনে আনে। ষাটের দশকে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ও এ সময়ে ঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ১৯৬২ সালে গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ গঠিত হয়। সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে তিনি এই নিউক্লিয়াস গড়ে তোলেন। একই সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম পরিচালনা করছিলেন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুরের আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাঙালি জাতিসত্তাকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবের ক্ষমতা ছিল অতুলনীয়। তার সাংগঠনিক ক্ষমতা কর্তব্যনিষ্ঠা ও দেশপ্রেম দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী। বলতে গেলে ষাটের দশকটাই ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশের সময়।’ (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ফেব্রুয়ারি-১৯৯৯)

আরও বলেন, ‘এই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের হাতিয়ার ছিল জাতীয়তাবাদ। এই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের অনুপ্রেরণা ছিল জয়বাংলা। এই মুক্তিযুদ্ধে আমাদের লক্ষ্য ছিল আসাম্প্রদায়িক  রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এই মুক্তিযুদ্ধে একক নেতৃত্বে ছিল সেদিনের জাতীয়তাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটাই হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।

১৯৬৩ সালে ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি হন কাজী আরেফ। ১৯৬৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা দিলে তারই নেতৃত্বে ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর শাখার ছয় দফার সমর্থন করে ঢাকার রাজপথে প্রথম মিছিল করেন। ছয় দফা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সঞ্চালনে নিজেকে অনিবার্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করেন।  

১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি দেরাদুনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। মুক্তিযুদ্ধকালে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী গঠিত হলে তিনি পশ্চিমাঞ্চলীয় সেক্টরের উপ-অধিনায়কও বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর ৪টি সেক্টরের সঙ্গে হাইকমান্ডের একজন হিসেবে সমন্বয়ের দায়িত্ব ও মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা শাখার প্রধান হন। বিএলএফ  দেশের অভ্যন্তরে ২০ হাজার ছাত্র যুবককে প্রশিক্ষণ দেয়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে তিনি জনযুদ্ধ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তার ভাষায়, ‘নিজের অধিকার আদায়ের জন্য জনগণ যে যুদ্ধ করে, যে যুদ্ধ কোনো গোষ্ঠী বা শ্রেণির স্বার্থে নয়, সে যুদ্ধই হলো জনযুদ্ধ।’ (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ফেব্রুয়ারি-১৯৯৯)

স্বাধীনতা-উত্তরকালে ১৯৭২ সালে গঠিত দেশের প্রধান বিরোধীদল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। সে সময় তিনি গণতান্ত্রিক সংগ্রামের বলিষ্ঠ মুখপত্র ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’-এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ‘জাতীয় কৃষক লীগ’ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা হিসেবে গড়ে তোলেন কৃষক আন্দোলন।

তিনি বলেন, ‘তখন একটা পরিস্থিতি ছিল, সরকার ছিল মুক্তিযুদ্ধের সরকার। কাজেই আমরা মনে করেছিলাম তখন গণতন্ত্র নিশ্চিত থাকবে। একটি অসাম্প্রদায়িক ব্যবস্থা নিশ্চিত থাকবে, যা সেই সরকার সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিলাম। কিন্তু সেই সাংবিধানিক ভিত্তি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হইনি। আমরা তখন সাংবিধানিক ভিত্তি বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করছিলাম। অর্থাৎ পরের অংশটার (সমাজতন্ত্রের) জন্য। (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ফেব্রুয়ারি-১৯৯৯)

তিনি বলেন, ‘আসলে আমরা যে জন্য যুদ্ধ করেছিলাম, জনগণ যে যুদ্ধে সম্পৃক্ত হয়েছিল সেই স্বাধীনতার যুদ্ধ একটি মানচিত্র বা একটি পতাকা পাওয়ার জন্য ছিল না। জনগণের মুক্তি ছিল সবচেয়ে বড় কথা। এই মুক্তি অর্থনৈতিক উপনিবেশিক শাসনব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রীয় মুক্তি। এই মুক্তির মধ্যে সবকিছুই জড়িত ছিল। এই মুক্তি শুধু সীমানার মুক্তি ছিল না। আমরা যদি শোষণমুক্ত সমাজ গড়তে না পারি, আমরা যদি গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থা না গড়তে পারি। আমরা তো পাকিস্তান ধর্মরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলাম আর একটি ধর্ম রাষ্ট্রের জন্য না। আমরা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চেয়েছি। এটি সমাজে যেমন চেয়েছি, তেমন রাষ্ট্র ব্যবস্থায়ও। (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ফেব্রুয়ারি-১৯৯৯)

কাজী আরেফ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার অন্যতম রূপকার। তিনি ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের ১১৬ নম্বর রুমে তার সহযোদ্ধা সাথীদের নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার নকশা করেন। প্রাথমিকভাবে সেদিন এটা জয় বাংলা বাহিনীর পতাকা বলা হলেও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে চূড়ান্ত হয়।

কাজী আরেফ আহমেদের জীবন পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই তার জীবন পরিপূর্ণ ছিল এক সংগ্রামী চেতনা নিয়ে, যে চেতনাজুড়ে ছিল মানুষের মুক্তির গান। তার জীবন ছিল লক্ষ্যপূর্ণ শুধুই দেশ ও মানুষের মুক্তির জন্য নিবেদিত।

তিনি  বিশ্বাস করতেন সামরিক ছত্রছায়ায় বা সেনা ছাউনিতে গড়ে ওঠা কোনো সংগঠন দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বোপরি গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক হতে পারে না। তাই তাগিদ অনুভব করেন, জিয়ার সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়েই গড়ে তোলেন ১০ দলীয় ঐক্য মোর্চা।

তার মতে ‘১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে যদি আমরা বিপ্লব মনে করি, তবে ৭৫-এর ঘটনা হলো প্রতিবিপ্লব। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের অর্জনগুলোকে চাওয়া-পাওয়াগুলোকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে মিনি পাকিস্তান সৃষ্টির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করা হয়েছিল। এরপর সামরিক সরকারের ছত্রছায়ায় মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা রাজনীতির সুযোগ পায়। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে বাংলাদেশকে পাকিস্তানীকরণের প্রচেষ্টা চালায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে আসে এক কালো অধ্যায়।’ (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, ফেব্রুয়ারি-১৯৯৯)

এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক গণআন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী নেতা ছিলেন কাজী আরেফ। নব্বই-পরবর্তী সময়ে একই সঙ্গে তিনি স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী সন্ত্রাসী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধেও সোচ্চার হোন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে কাজী আরেফ তার সঙ্গীদের নিয়ে রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলেন তীব্র আন্দোলন। শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে সামনে রেখে এ আন্দোলনে তিনি প্রধান রূপকারের ভূমিকা পালন করেন।

প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন এবং একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’। এ আন্দোলন জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং একে জাতীয় দাবিতে পরিণত করার ফল হিসেবেই বাংলাদেশের কলঙ্কমোচনে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা সম্ভব হয়েছে। সম্ভব হচ্ছে সেইসব নরপিশাচদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে এবং বিচার করতে।

১৯৯৯ সালে ১৬ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কালিদাসপুরে সন্ত্রাসবিরোধী এক জনসভায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনিসহ ৪ জন সঙ্গীসহ মৃত্যুবরণ করেন।

তার শেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘একটা সম্পূর্ণ সার্বিক ঐক্য দরকার। জনগণের ঐক্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্য। এমন কি সেই ঐক্য প্রক্রিয়ার একটি সরকার দরকার। যে কাজটি এই সরকারও করতে পারে, তারা ঐকমত্যের কথা বলছেন কিন্তু কোনো ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি তারা দেননি। আজকের সরকার যদি ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি দিয়ে একটি জাতীয় চরিত্র দাঁড় করাতে পারে তার বিরোধিতা কেউ করবে না। কিন্তু কোনো কম্প্রমাইজ করে নয়, একটি অপশক্তির সঙ্গে কম্প্রমাইজ করলে নিজেকে অপশক্তি হিসেবে চিহ্নিত হতে হয়।

দূরদর্শী এই রাজনীতিবিদ নব্বইয়ের দশক থেকে বহুবার সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেন। সমাজকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনায় জাগ্রত করার কথা বলেন। প্রয়োজনে আরেকটি যুদ্ধের জন্যও তৈরি হতে বলেন। তিনি সাপ্তাহিক বিচিত্রা, মোহনা, সুগন্ধা, এখনই সময় তারকালোক, দৈনিক ইত্তেফাক ও আমাদের সময় পত্রিকায় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লিখেছেন।

আজ বাংলাদেশে মৌলবাদীদের উম্মাদ-আস্ফালন সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে কাজী আরেফসহ সব বীরযোদ্ধাকে হৃদয়ে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ রক্ষায় এগিয়ে আসুন, আসুন সাম্প্রদায়িকতার গ্রাস থেকে রক্ষা করি দেশের স্বাধীনতা, রক্ষা করি ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা আমার মাতৃভূমিকে।

গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..