নিজস্ব প্রতিবেদক : নদ-নদী ও সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায়, কমেছে মাছের জোগান। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীর বাজারে। সরবরাহ বেশ কম, এজন্য মাছ কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের ক্রেতারা। এরই মধ্যে বাজারে উঠতে শুরু করেছে শীতকালীন শাকসবজি। তবে এখনও দাম কমেনি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে সবজির দাম কমে যাবে। এদিকে আগের চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে মাংস। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
মূলত, দাম কিছুটা কমলেও এখনও নাগালের মধ্যে নেই বেশির ভাগ সবজি। জোগান আরও বাড়লে স্বস্তি ফিরবে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
গত সপ্তাহের তুলনায় বেশ কিছু সবজির দাম সামান্য কমেছে। তবে বেগুন, শসা, শিম, টমেটোর দাম হাঁকা হচ্ছে ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি।
কেজিতে ৫০ টাকা কমে কাঁচামরিচ মিলছে ২০০ টাকায়। এক কেজি তাল বেগুনের জন্য দিতে হবে ১৫০ টাকা। পেঁপে ছাড়া ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজির নিচে নেই কোনো সবজি।
এদিকে মাছের বাজারে অস্বস্তি যেন কমছেই না। আগামীকাল রোববার পর্যন্ত ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় সাগর-নদীতে জাল ফেলতে পারছে না জেলেরা। ফলে বাজারে নদ-নদী ও সামুদ্রিক মাছের জোগান নেমেছে তলানিতে।
চাহিদা বেড়েছে বিল ও চাষের মাছের। আর এই সুযোগে চাষের মাছের বাড়তি দাম হাঁকছেন বিক্রেতারা। ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজির নিচে মিলছে না রুই-কাতলা। আইড়-বোয়ালের দেখা মিললেও, গুণতে হবে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি। হাজার-বারোশ’ টাকা কেজির নিচে মিলছে না ভালো মানের চিংড়ি।
বাজারে প্রতি কেজি বোয়াল ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা, কোরাল ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা, আইড় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের রুই ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা ও কাতল ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া তেলাপিয়া ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, চাষের পাঙাশ ২০০ টাকা, চাষের ট্যাংরা ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা ও শিং ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
গত সপ্তাহের তুলনায় কমতে শুরু করেছে ডিমের দামও। তবে তেল, চিনি, লবণের দামে তেমন হেরফের দেখা যায়নি।
গরু ও খাসির মাংসের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতি কেজি গরুর মাংস ৭৬০ থেকে ৮০০ টাকা, খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকা ও ছাগলের মাংস ১ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৭৫ থেকে ১৮০ টাকা কেজিতে অপরিবর্তিত আছে ব্রয়লার মুরগির দাম। তবে কেজিতে ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে লেয়ারে, মিলছে ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায়।
এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে ক্রেতাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ। বাজারে গিয়ে এখন আর আগের মতো ঝুড়িভর্তি করে কেনাকাটা করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেকেই নির্ধারিত বাজেট নিয়ে বাজারে গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। ক্রেতাদের অভিযোগ, সরকার সব করতে পারলেও বাজারদর নিয়ন্ত্রণে আনতে অসহায়। সরকারের প্রশাসনের তদারকি না থাকায় ব্যবসায়ীরা নিজের ইচ্ছামতো দাম বাড়াচ্ছে।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে কথা হয় গৃহিণী রোকসানা বেগমের সঙ্গে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, প্রতিদিন বাজারে গেলে মনে হয় যুদ্ধ করতে যাচ্ছি। ৫০০ টাকায় এখন কিছুই কেনা যায় না। সবকিছুর দামই বাড়ছে। ১ হাজার টাকায় দুই-তিনটি আইটেম কেনার পর আর টাকা থাকে না। সরকার আমাদের এই কষ্টের খবর নেয় না।
একই বাজারে কথা হয় রিকশাচালক নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, দিনে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা কামাই করি, কিন্তু পরিবারের জন্য বাজার করতে গিয়ে দুই দিনের আয় আগেই শেষ হয়ে যায়। মাছ-মাংস এখন বিলাসী জিনিস মনে হয়। কোরবানির ঈদ ছাড়া গরুর মাংস খাওয়া কল্পনাই করা যায় না। সরকার সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও বাজারদর নিয়ন্ত্রণে যেন অসহায়।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বাজার থেকেই পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছেÑ তারা বাধ্য হয়েই বেশি দামে বিক্রি করছেন।
মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের ব্যবসায়ী আবু তালেব বলেন, পাইকারি বাজারে দাম বেশি থাকলে আমরা কম দামে বিক্রি করতে পারি না। সরকার জায়গামতো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে খুচরা বাজারে প্রভাব পড়বেই। সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ না হলে বাজারে দাম কখনই স্থিতিশীল হবে না।
আরেক ব্যবসায়ী রহমান মিয়া বলেন, পাইকারি বিক্রেতাদের সিন্ডিকেট অনিয়ন্ত্রিতভাবে দাম বাড়ায়। আমরা বাজারে গিয়ে টাকার ঘাটতিতে পড়ি। তাদের কাছ থেকে বেশি দামে কিনে আনতে হয়, ফলে খুচরা বাজারে দাম বাড়ানো ছাড়া উপায় থাকে না। সরকার যদি শক্ত পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্যই স্বস্তি আসবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পণ্যের সরবরাহ চেইনে অসঙ্গতি ও মনিটরিংয়ের ঘাটতিই বাজার অস্থিরতার মূল কারণ। নিয়মিত বাজার তদারকি এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
ক্রেতারা আশা করছেন, আসন্ন রোজা ও মৌসুমকে ঘিরে যেন নতুন করে দাম না বাড়ে, বরং নিত্যপণ্যের বাজারে দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
প্রিন্ট করুন











Discussion about this post