প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বাজার অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের অধিকার

 

আবু আহমেদ: পুঁজির মালিক আর ব্যবসার মালিক অনেকটা সমার্থক। যিনি পুঁজিপতি, তিনিই ব্যবসায়ী। একচেটিয়া ব্যবসা, যাকে অর্থনীতিশাস্ত্র মনোপলি বলে, সেটির উত্থান ঘটে পুঁজির একচেটিয়া মালিকানা থেকে। সরকার একচেটিয়া ব্যবসায় বাধা দেয় এজন্যই যে, এতে সাধারণ জনগণ যারা পুঁজির মালিক হতে পারেনি, তারা শোষিত হয়। এজন্যই নির্বাচনের সময় সব দেশের রাজনৈতিক নেতারা সম্পদের বণ্টন, মালিকানার ধরন, ট্যাক্স পলিসি, জব ক্রিয়েশন, সুবিধাবঞ্চিত লোকদের জন্য কী করা হবে—এ নিয়ে জনগণের কাছে হাজির হয়। ট্যাক্স পলিসি ও সম্পদের কেন্দ্রীভূত হওয়া—এ দুই বিষয়ে রাজনৈতিক ময়দানের প্রার্থীদের মধ্যে বড় রকমের লড়াই হয়, তবে শেষ পর্যন্ত ঐকমত্য হয় সামান্যই। সম্পদের বণ্টনের বিষয়টি নির্ভর করে মালিকানার ধরনের ওপর। উৎপাদনের অন্য তিনটি উপকরণ যদি কিছু লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে সম্পদও কিছু লোকের মালিকানায় চলে যাবে। বাজার অর্থনীতি যাতে পুঁজিবাদে রূপান্তরিত না হয়, সেজন্য সরকার আইন করে জনগণকে ব্যবসা-বাণিজ্যের মালিকানা দেয়ার ব্যবস্থা করে। একদিকে আয় ও ব্যয় করার স্বাধীনতা যেমন নিশ্চিত করা হয়, অন্যদিকে মালিকানার বিস্তৃতির মাধ্যমে অধিক সংখ্যক লোকের হাতে যাতে ব্যবসায়িক আয় প্রবাহিত হয়, তা নিশ্চিত করা হয়। এ লক্ষ্যেই সরকার বিভিন্ন রেগুলেটরি কমিশন স্থাপন করে। কমিশনগুলোর কাজই হচ্ছে বাজারকে তদারকি করা, যাতে করে বাজারের দুর্বল এজেন্টগুলো শোষিত না হয়। সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে অথবা আয় অধিক লোকের হাতে প্রবাহিত করার ক্ষেত্রে শেয়ারবাজার হলো ভালো মাধ্যম। মুক্ত অর্থনীতি, ভালো শেয়ারবাজার অর্থনীতিকে উচ্চতর প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে যায়। ওই ধরনের অর্থনীতিতে ব্যবসা স্থাপনের জন্য পুঁজির সংকট হয় না। স্থাপিত ব্যবসা যেমন শেয়ারবাজারের মাধ্যমে হাজারো লোকের কাছে বিক্রি করে দেয়া যায়, তেমনি নতুন ব্যবসা স্থাপনের জন্য শেয়ারবাজার থেকে পুঁজি নেয়া যায়। অন্য অনেক দেশ শুধু তাদের জনগণকে মালিকানা দেয়ার জন্যই দেশের ও বিদেশের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে আসতে বাধ্য করেছে। বাংলাদেশ হলো ব্যতিক্রমের একটি। এ দেশের সরকারের আমলা-মন্ত্রীরা বিদেশী সাহায্যের জন্য যত মেধা ও শ্রম ব্যয় করেন, তার ১ শতাংশও ব্যয় করেন না তাদের দেশে বড় বড় ব্যবসা করছে এমন বিদেশী কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার ক্ষেত্রে। তারা শুধু ভালো ট্যাক্স পেয়েই এক্ষেত্রে খুশি। কিন্তু বিদেশী কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে শেয়ারবাজারে এলে এই দেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্তের হাজারো লোক যে ওইসব কোম্পানির শেয়ার ধারণ থেকে উপকার পেতে পারে, সে ধরনের চিন্তা করার মতো সময় আমাদের পলিসিমেকারদের আছে বলে মনে হয় না। আজকে আপনি যে কোনো বড় বিদেশি কোম্পানির সিইওকে জিজ্ঞাসা করুন, আপনার কোম্পানি ভারতসহ অন্য দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারলে এ দেশে কেন হচ্ছে না? তাদের সোজাসাপ্টা উত্তর, তোমরা কি কখনো বলেছ, তোমাদের শেয়ারবাজারে আসতে হবে? তোমরা বলোনি বলে আমরা তোমাদের লোকদের আমাদের ইকুইটি তথা ব্যবসার মালিক বানাতে চাইনি। বলো, কোনো দিন কোনো বড় ব্যবসা সেধে তোমাদের মালিকানা দেবে? সত্যিই তো তাই। যেখানে আমাদের অর্থ মন্ত্রণালয় চুপ, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক চুপ, যেখানে ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ চুপ, সেখানে আমার মতো লোক কালেভদ্রে দু-একটি লেখা লিখে বা অসহায় বিনিয়োগকারীদের কাছে এ ব্যাপারে লেকচার দিয়ে কী লাভ হবে? যাদের হাতে মুগুর আছে, তারাই কেবল এ ব্যাপারে বললে কাজ হবে।

শেয়ারহোল্ডারদের রাইটস বা অধিকারের কথায় আসি। বইতে—আইনে অনেক অধিকার তাদের দেয়া আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাদের কোনো অধিকারই দেয়া হয় না বা তারাও কোনো অধিকার ভোগ করতে চায় না। শেয়ার ধারণ করে অথচ কোম্পানির ব্যবসা-বাণিজ্যের কোনোই খবর রাখে না, এমনকি কোম্পানির ডাকা অ্যানুয়াল মিটিংয়েও তারা যায় না। আজকের বাস্তবতা হলো, গুটিকয়েক অতি সাধারণ নিরীহ শেয়ারহোল্ডার মিটিংগুলোয় যায়। আর বাকিরা থাকে কোম্পানি ম্যানেজমেন্টের লোক। কোম্পানির এজেন্ডা পাস হতে লাগে মাত্র ২০-৩০ মিনিট। কোম্পানিও শেয়ারহোল্ডারদের উপস্থিতি অতটা কামনা করে না। তারা মিটিং করে, কারণ রেগুলেটরি নির্দেশ মানতে হয়। কোম্পানি অ্যাক্টে লেখা আছে, এজিএম নামের বার্ষিক শেয়ারহোল্ডারদের মিটিং করতে হবে। আমাদের শেয়ারহোল্ডারদের নির্লিপ্ততার সুযোগে কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট ক্ষেত্রবিশেষে পুকুরচুরি করছে, কিন্তু শেয়ারহোল্ডারদের কোনো খবর নেই। মিটিংয়ে গিয়ে একটা ফাইট করতে হবে—সে বিষয়ই যেন শেয়ারহোল্ডাররা ভুলে গেছেন। অথচ বাংলাদেশের রাস্তাঘাটে আমরা কত যুদ্ধ, কত তর্ক, কত বিতর্ক দেখি, যেগুলোর পেছনে আর্থিকভাবে লাভ-লোকসানের কোনো বালাই নেই। তারা কোম্পানির ব্যবসায় অর্থ দিয়ে বছরে একটি দিন, একটি ঘণ্টা দিয়ে কোম্পানির ব্যবসা নিয়ে বক্তব্য দেয়ার গরজ যেন এ শেয়ারহোল্ডারদের নেই। ছোটদের কথা বাদই দিলাম, বড় যারা শেয়ারহোল্ডার, সেই মিউচুয়াল ফান্ডের ফান্ড ম্যানেজাররা তো গিয়ে কোম্পানির স্থিতিপত্র ও আয়-ব্যয় হিসাবের ওপর চুলচেরা বিশ্লেষণমূলক বক্তব্য দিতে পারেন। সত্য হলো, তারাও অনুপস্থিত। বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে শেয়ারহোল্ডারস অ্যাক্টিভিজম বলতে যা বোঝায়, তার কোনো উপস্থিতি নেই। এমন অবস্থা আগে ছিল না। পুরো নব্বইয়ের দশকই আমাদের মতো অনেক শেয়ারহোল্ডার কোম্পানি আহূত মিটিংগুলোয় যেতাম। এবং কোম্পানির ব্যবসার ভবিষ্যৎ, বর্তমান অবস্থা, ম্যানেজমেন্টের মান—এসব বিষয় বুঝতে চেষ্টা করতাম। এজিএম থেকে প্রাপ্ত এবং ধারণাগতভাবে অর্জিত তথ্যগুলো কাজে লাগাতাম, কোনো কোম্পানির শেয়ার নতুন করে কিনব নাকি পুরনোগুলো বিক্রি করে দেব। আমাদের অনেকে হতাশ হতো কোম্পানির অ্যানুয়াল রিপোর্ট পড়ে। অনেক কোম্পানিই অনেক বেশি জানান দিতে চায় তাদের শেয়ারহোল্ডারদের। আমাদের স্টক এক্সচেঞ্জে একমাত্র যে মোবাইল ফোন কোম্পানিটি তালিকাভুক্ত আছে, সেটির গত বছরের অ্যানুয়াল রিপোর্ট পড়ে আমি এত খুশি হয়েছি যে, অনেক তথ্য জানতে পারলাম, যেগুলো এই কোম্পানির ব্যবসা সম্পর্কে আগে জানতাম না। আমি কোনো ক্লাশরুমে উপস্থিত হয়ে অ্যাকাউন্টিং নামের বিজ্ঞানটি পড়িনি। যতটা অ্যাকাউন্টিং ও অডিট রিপোর্ট সম্পর্কে জেনেছি, তা কোম্পানির অ্যানুয়াল রিপোর্টস পড়তে গিয়ে। শুধু অ্যানুয়াল রিপোর্টে দেয়া তথ্য-উপাত্তগুলো বোঝার জন্য পরে বিজনেস অ্যাকাউন্টের ওপর কিছু বই পড়ে নিয়েছি। এতে কাজ চালানোর মতো জ্ঞান হয়ে গেছে। আসলে বাংলাদেশে অডিটররা যদি সৎভাবে তাদের কাজগুলো করত, তাহলে শেয়ারহোল্ডারদের অনেক অধিকারই রক্ষিত হতো। সমস্যাটা বেশি তৈরি হয় অবিশ্বাস থেকে। অনেক উদ্যোক্তাই শেয়ারহোল্ডারদের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ করেননি। তারা যখন আইপিও বিক্রি করে শেয়ার বাজারে এসেছেন, তখন তাদের শেয়ার ধারণ ছিল ইকুইটি ক্যাপিটালের ৭০ শতাংশ। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, মাত্র দু-তিন বছরের মধ্যে তাদের শেয়ার ধারণ নেমে এসেছে ৩০-৩৫ শতাংশে। তারা উঁচু মূল্যে বাদবাকি শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। আমরা অনেক অনুরোধ করেছি, উদ্যোক্তাদের শেয়ার ধারণের ওপর কমপক্ষে তিন বছরের জন্য লক-ইন দিতে। কিন্তু বিএসইসি তা করেনি। তারা যে কয়েক মাসের জন্য লক-ইন দিয়েছে, সেটির মেয়াদ শুরু হবে আইপিও বিক্রির জন্য প্রসপেক্টাস ছাপানোর পর থেকে। ফলে বিএসইসির লক-ইন সম্পর্কে রেগুলেশন বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। উচিত ছিল—সময়টা গুনতে হবে যেদিন থেকে কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে লিস্টেড হবে। আমাদের জানামতে, উদ্যোক্তা শেয়ার বেচতে চাইলে নোটিস দিতে হবে। কিছু উদ্যোক্তা সে ব্যাপারেও পরোয়া করছেন না। অন্য ফাঁকটা হলো, উদ্যোক্তা মহোদয় তার শেয়ারগুলো স্টক এক্সচেঞ্জের বাইরে স্ত্রী-ছেলে-মেয়েদের নামে গিফট বা দান হিসেবে ট্রান্সফার করে নেন। পরে ছেলে-মেয়েদের মাধ্যমে বিনা নোটিসে সেসব শেয়ার বিক্রি করে দেন।

লেখক: শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদ