সম্পাদকীয়

বাজার সংশোধন মানেই কি বিনিয়োগকারীর ক্ষতি?

 

‘দরপতনে ধাক্কা খেলেন নতুন বিনিয়োগকারীরা’ শিরোনামে যে খবর প্রকাশ হয়েছে গতকালের শেয়ার বিজে, সংগত কারণেই তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমাদের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সম্প্রতি পুঁজিবাজারে ভালো পরিস্থিতি বিরাজ করায় নতুন করে এ বাজারে প্রবেশের ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন বহু নতুন বিনিয়োগকারী। শেয়ার তথ্য সংরক্ষণকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ (সিডিবিএল) থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত তিন মাসে আনুমানিক ৩০ হাজার নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত হয়েছেন শেয়ারবাজারে। তার সঙ্গে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি অবলোকনে ফ্রেশ ফান্ড নিয়ে পুরোনো বিনিয়োগকারীরাও অগ্রসর হয়েছিলেন বলে জানা যায়। অথচ কয়েক দিনের অব্যাহত দরপতনে প্রতিদিনই তাদের পুঁজি থেকে চলে যাচ্ছে এক থেকে দুই শতাংশ অর্থ। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না, নব-উদ্যমে বাজারে প্রবেশ করা বিনিয়োগকারীরা শিকার হচ্ছেন বাজার অভিঘাতের লাভের বদলে প্রতিদিনই এখন গুনতে হচ্ছে লোকসান। লক্ষণীয়, গত ২৩ জানুয়ারি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ছিল ৫ হাজার ৬৬৯ পয়েন্ট। আর গত সোমবার তা নেমে আসে ৫ হাজার ৪২১ পয়েন্টে অর্থাৎ ৬ কার্যদিবসের মধ্যে ডিএসইর প্রধান সূচক নামে আনুমানিক ২৪৮ পয়েন্ট। একই সময় লেনদেনও কমে যায় প্রায় অর্ধেকের মতো সোমবার ডিএসইতে লেনদেন হয় মোট ১ হাজার ৭৪ কোটি টাকার শেয়ার; অথচ ৬ কার্যদিবস আগে লেনদেন ছিল ২ হাজার ১৮০ কোটি টাকার। এমন পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত হওয়ার মতো উদ্যোগই দেখতে চাইবেন সবাই।

প্রথম সারির বাজার বিশ্লেষকদের অনেকে শেয়ার বিজের কাছে মত দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সে মতের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করা কঠিন। তবে এখানে উদ্বেগজনক কয়েকটি বিষয়ে রয়েছে, যেগুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি)। এক. সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখনও সচেতনতার ঘাটতি দৃশ্যমান। গুজবনির্ভর তথ্য দ্বারা অতিমাত্রায় প্রভাবিত তারা। দুই. একাধিক বিশেষজ্ঞ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, একশ্রেণির নামসর্বস্ব কোম্পানির শেয়ার যেভাবে অতিমূল্যায়িত হচ্ছে, তাতে করে সেখানে ‘কিছু মাত্রা’য় বিধিবহির্ভূত ইনসাইডার ট্রেডিং থাকা বিচিত্র নয়। দুর্ভাগ্যজনক হলো, এ বিষয়ে বারবার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও তাদের টনক নড়ছে বলে মনে হয় না। তিন. পুঁজিবাজারে দুর্বল ও ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। একে শুভ লক্ষণ হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন। নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের বরং অনেক আগে থেকেই এসব সন্দেহজনক শেয়ারের ওপর নজরদারি বাড়ানো উচিত ছিল। শুরু থেকে কাজটি না করায় নতুন ও পুরোনো উভয় ধরনের বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অনুমান। অথচ বাজার সংশোধন মানে নিশ্চয়ই বিনিয়োগকারীর ক্ষতি নয়। অনেকে মনে করেন, চলতি পরিস্থিতিতে (তথা যেভাবে দ্রুত কিছু শেয়ারের দাম বাড়ছিল) বাজার সংশোধনের প্রয়োজন ছিল। তাতে করে বিপর্যস্ত বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোটা শক্ত হতো। এ যুক্তি অগ্রাহ্য করবেন না কেউই। কিন্তু কথা হলো, বাজার সংশোধন কি শেয়ারবাজারকে শক্তিশালী করার একমাত্র উপায়? অন্যান্য বিষয়ের প্রতিও কি সমানভাবে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন ছিল না বিশেষত ফাটকা উপাদান, ইনসাইডার ট্রেডিং এবং দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারগুলোর ওপর। বিলম্ব হলেও দ্রুত এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ যতœবান হবেন এমনটাই প্রত্যাশিত।

 

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..