বাণিজ্য সংবাদ শিল্প-বাণিজ্য

বাজেটে করোনা মোকাবিলায় দিক-নির্দেশনা চায় ঢাকা চেম্বার

প্রাক-বাজেট আলোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কভিড মহামারি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনার দাবি জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি রিজওয়ান রাহমান। তিনি বলেন, করোনা-পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব বিবেচনায় বেসরকারি খাতের প্রত্যাশা পূরণে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যেমন; আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর, আর্থিক খাত, শিল্প ও বাণিজ্য এবং জ্বালানি, যোগাযোগ ও স্বাস্থ্য অবকাঠামো খাত প্রভৃতি খাতগুলোকে বাজেটে গুরুত্ব প্রদান করা প্রয়োজন।

ডিসিসিআই, দৈনিক সমকাল এবং চ্যানেল ২৪-এর যৌথ আয়োজনে ‘প্রাক-বাজেট আলোচনা: অর্থবছর ২০২১-২২’ শীর্ষক ওয়েবিনারে যুক্ত হয়ে গতকাল তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান এবং ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দেন।

ড. মসিউর রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ধারাকে অব্যাহত রাখতে হবে এবং এটিকে সব জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, শুল্ক বা করের হার গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে না থাকলে, তা ব্যবসা-বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করবে। তিনি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত না করে কি হারে রাজস্ব বাড়ানো যায় তার একটি দিকনির্দেশনা সরকারকে প্রদানের আহ্বান জানান। উপদেষ্টা বলেন, ৭-১০ বছরের জন্য একটি টেকসই ও সহনশীল কর কাঠামো দেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বাজেট শুধু কর আহরণের বিষয় নয়, এটি সরকারের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের একটি রূপরেখা। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলা করছি, যেটা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং বাজেটে করোনা পরিস্থিতি উত্তরণের একটি সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে, সেই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিও বাজেটে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের এসএমই খাতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং এসএমই খাতের জন্য আর্থিক সহায়তা নিশ্চিতকল্পে মাইক্রো ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউটগুলোকে (এমএফআই) বিবেচনা করা যেতে পারে এবং প্রণোদনা প্যাকেজ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছানো যায়, সে লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন প্রণয়ন করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্সের পর আমাদের প্রবৃদ্ধির নিয়ামকগুলো কি হবে, সেগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। সে সঙ্গে তিনি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে আমাদের একটি যুগান্তকারী পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মত প্রকাশ করেন, যেখানে সরকার ও বেসরকারি খাত একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।

ওয়েবিনারে চারটি খাতের ওপর সরকারি ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করে তাদের মতামত প্রদান করেন। আর্থিক খাতবিষয়ক আলোচনায় আইপিডিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সিইও নাসের এজাজ বিজয়, নগদের সিইও রাহেল আহমেদ এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহীম অংশ নেন।

মমিনুল ইসলাম বলেন, পুঁজিবাজারে বন্ড মার্কেট উন্নয়নে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জন্য ব্যাংকের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে। নাসের এজাজ বিজয় বলেন, এসএমইদের ঋণ সহায়তা পেতে হলে একটি স্কিম থাকা প্রয়োজন। তিনি ভূমির মৌজা ভ্যালু কমানোর প্রস্তাব করেন, সে সঙ্গে রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের জন্য সহায়তা আরও বাড়ানো আহ্বান জানান। রাহেল আহমেদ বলেন, ডিজিটাল লেনদেন কার্যক্রমে প্রণোদনা দিতে হবে এবং ডিজিটাল লেনদেনে মোবাইল অপারেটরদের যে চার্জ আছেÑতা কমানো প্রয়োজন, সে সঙ্গে স্মার্টফোন আমদানি ও উৎপাদনে কর অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব করেন। আসিফ ইব্রাহীম বলেন, তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানো প্রয়োজন এবং লিস্টেড কোম্পানির করপোরেট করহার কমানো প্রয়োজন। তিনি এসএমই কোম্পানিগুলোকে স্টক মার্কেটে আসার জন্য তালিকাভুক্ত হওয়ার পাঁচ বছর পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে কর সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করেন।

শিল্প ও বাণিজ্য শীর্ষক সেশনের আলোচনায় বাংলাদেশ সুপার মার্কেট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী ইনাম আহমেদ, বিকেএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক, বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ড. মো. মাসুদুর রহমান অংশ নেন।

কাজী ইনাম আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০০টির মতো সুপারশপ রয়েছে। করোনো পরিস্থিতিতেও সুপারশপগুলো নির্ধারিত মূল্যে পণ্য প্রদান করছে এবং অসংখ্য তরুণের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি রয়েছে। সুপার মার্কেটের পণ্যের ওপর পাঁচ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের ফলে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক সুপারশপ বন্ধ হয়ে গেছে। মো. ফজলুল হক বলেন, গার্মেন্টে খাতে সবুজ কারখানা বাংলাদেশে পৃথিবীতে আলোড়ন তৈরি করছে, তবে ইটিপি স্থাপনে প্রয়োজনীয় ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও কেমিক্যাল আমদানিতে শুল্কারোপ করা হয়েছে, যা অব্যাহতি প্রদান করা প্রয়োজন।

জসিম উদ্দিন বলেন, করোনো মোকাবিলায় সব শিল্প খাতের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ সুবিধা অব্যাহত থাকা প্রয়োজন, সেই সঙ্গে বিশেষ করে কুটির শিল্পের জন্য ভ্যাট ও ট্যাক্স সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মো. মাসুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ অবদান বাড়াতে না পারলে ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হতে পারে।

‘ট্যাক্সেশন ও ভ্যাট’ শীর্ষক অধিবেশনে আলোচনায় কেপিএমজির সিনিয়র পার্টনার আদিব হোসেন খান, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য (কাস্টমস পলিসি ও আইসিটি) সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া, সদস্য (ভ্যাট নীতি) মো. মাসুদ সাদিক এবং সদস্য (করনীতি) মো. আলমগীর হোসেন অংশ নেন।

আদিব হোসেন খান বলেন, আমাদের সোর্স ট্যাক্স কমাতে হবে এবং একটি স্বচ্ছ আপিল সিস্টেম চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ভ্যাট বিষয়ে ইনপুট রিবেট নিশ্চিতকরণেরও প্রস্তাব করেন। সৈয়দ গোলাম কিবরিয়া বলেন, এনবিআরের তিন লাখ কোটি টাকার যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, সে বিষয়টিতে সবাইকে বিবেচনার আহ্বান জানান।

মো. মাসুদ সাদিক বলেন, ২০১৯ সালের জুলাই হতে ভ্যাট আইন চালুর পর থেকে রেজিস্ট্রেশন ও ভ্যাট রিটার্ন রেড়েছে এবং বর্তমানে ভ্যাট রেজিস্টার্ড প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দুই লাখ ৫৩ হাজার। রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে এক লাখ ৫৬ হাজার প্রতিষ্ঠানের এবং অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে এক লাখ আট হাজার প্রতিষ্ঠানের।

মো. আলমগীর হোসেন বলেন, করোনা পরিস্থিত মোকাবিলায় সরকারের বিপুল অঙ্কের প্রয়োজন এবং এটি মেটাতে রাজস্ব বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই, তবে এমন বাস্তবতায় করদাতাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

‘অবকাঠামো (জ্বালানি, লজিস্টিক ও স্বাস্থ্য)’ শীর্ষক অধিবেশনে আলোচনায় ইউনাইটেড হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফাইজুর রহমান, প্রাইভেট ই জেড অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এএসএম মাইনুদ্দিন মোনেম এবং বুয়েটের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম অংশ নেন।

ফাইজুর রহমান বলেন, গত কয়েক বছর আমাদের স্বাস্থ্য খাতে ক্রমাগত অগ্রগতি হচ্ছে, তবে আমাদের দেশে এ খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কাজ করতে হবে এবং এ খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তিনি বলেন, দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কিছু সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। এএসএম মাইনুদ্দিন মোনেম বলেন, অবকাঠামো খাতের চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হলে বাংলাদেশের অর্থনীতির আরও উন্নয়ন পরিলক্ষিত হবে। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তামিম বলেন, ভবিষ্যতে আমাদের কি ধরনের জ্বালানি প্রয়োজন, সেটি সঠিকভাবে নির্ধারণ করে সে মাফিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও  তার বাস্তবায়ন খুবই জরুরি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..