প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বাজেটে নেই সুষ্ঠ নির্বাচন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা

জাফরুল্লাহ চৌধুরী : বাজেট তথ্য-উপাত্ত

প্রস্তাবিত বাজেট উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের ১৩ পৃষ্ঠার স্তুতিসহ ৭৮৩ পৃষ্ঠায় বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত১ অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছে। গত বছর প্রকাশিত ৪৭৯ পৃষ্ঠার বাংলাদেশ সমাধান টেরিফ ও শুল্ক-সংক্রান্ত তথ্য পুস্তক অধ্যয়ন করতে হবে। এই দীর্ঘ পরিসরের গ্রন্থটি চানক্যচতুরতা এবং হয়রানি ও দুর্নীতির মূল দলিল ও বাহক।

ক) মূলকথা :

প্রস্তাবিত ছয় লাখ আটাত্তর হাজার চৌষট্টি কোটি টাকার পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেটের ৪২.৩% ব্যয় হবে সুদ পরিশোধে (১১.৯%), জনপ্রশাসনে ১৯.৯%, প্রতিরক্ষায় (৫.৯%) ও জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তায় (৪.৬%) অর্থাৎ মোট ব্যয় আশি হাজার তিনশত পঁচাত্তর কোটি টাকা। বিনোদন, সংস্কৃতিতে মাত্র ০.৮%। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর জন্য বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবুল বারকাতের বিকল্প ভাবনা, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) ও বিশিষ্ট নাগরিকদেরর প্রস্তাবগুলোর  বিবেচনা দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। আয়কর ও অন্যান্য কর না দিয়ে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ পথে বিদেশে নেয়া অর্থ টাকা ফেরত না এনে কেবল ৭.৫% ট্যাক্স দিয়ে অবৈধ কাজকে বৈধ করা হবে অত্যন্ত গর্হিত কাজ। তবে অর্জিত অর্থের ন্যায্য আয়কর পরিশোধ করা হয়ে থাকলে এর ওপর ৭.৫% অতিরিক্ত আয়কর দিয়ে তার অর্থ  বৈধ পথে বিদেশে স্থানান্তরের সুবিধা দেয়া অন্যায় হবে না। প্রস্তাবিত বাজেটে বিভিন্ন তদবির সুস্পষ্ট।

কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার বাজেট আলাদা করে দেখানো উচিত। স্বাস্থ্যসেবা বরাদ্দ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণায়ের বরাদ্দের সঙ্গে একত্রীভূত করে দেখানো বাঞ্ছনীয়।

খ) প্রস্তাবিত ২০২২-২৩ বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল দিক হচ্ছে শ্রম ও কর্মসংস্থান, শিল্প, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক ও আইন মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ কমানো। পরিসংখ্যান ও তথ্য মূল্যায়ন বিভাগের উন্নয়নকাজের ৮০% কেটে রাখা হয়েছে। মিথ্যা বা ভুল তথ্য সংগ্রহ করে কী লাভ? রোহিঙ্গা সমস্যা বিদ্যমান থাকাবস্থায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন কমানো মারাত্মক ভুল। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বরাদ্দ দ্বিগুণ করুন। সুষ্ঠু ভোট হয় না, সংসদ আলোচনায় আগ্রহী নন, সম্ভবত: তাই তাদের উন্নয়ন বাজেট বাড়েনি। বিচার বিভাগের উন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ কমানো হয়েছে।

২৮ জুন, ২০২২ তারিখে প্রেস কনফারেন্সে।

উল্লেখ্য, ৪০ লাখের অধিক মামলা বিচারের অপেক্ষা রয়েছে। বিচারপতিরা বছরে প্রায় ৪ মাস ছুটি উপভোগ করেন প্রাক্তন ব্রিটিশরাজের প্রথানুসারে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর ও অকারণে অভিমানে মামলা সৃষ্টি রহিত করার লক্ষ্যে নি¤œ আদালতের কোর্ট ফি ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা ধার্য করা বাঞ্চনীয় হবে। সহজসুলভ সাধারণ মামলা দ্রুত সমাধান সম্ভব প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গ্রাম্য আদালতে। প্রাক্তন অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট প্রথা ভালোভাবে চালু করুন। সর্বোচ্চ ১৮ মাসের মধ্যে চূড়ান্ত করার উদ্যোগ প্রয়োজন। তিনবারের বেশি মামলা শুনানির জন্য সময় প্রার্থনা করলে প্রতিবার দশ হাজার টাকা অতিরিক্ত কোর্ট ফি দিতে হবে। আয় বাড়বে, অহেতুক হয়রানি কমবে, মামলা কমবে।

গ) শান্তি ও সহিঞ্চুতা সৃষ্টির জন্য বরাদ্দ

দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসনে আস্থা সৃষ্টির জন্য নিরপেক্ষ সরকার ও উন্নত মন সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। নাগরিক সচেতনতা  বৃদ্ধি, সহিঞ্চুতা, ন্যায় বিচার, সংগ্রাম ও সাম্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টির নিমিত্তে দেশীয় সংস্কৃতি ও খেলাধুলার ব্যাপকতা বৃদ্ধির জন্য অতিরিক্ত ২০০ কোটি বরাদ্দ দেয়া কল্যাণকর হবে। দলীয় সরকারের স্থলে নির্বাচনের একাধিক বছর আগে নিরপেক্ষ সরকার সৃষ্টিতে জনগণের আগ্রহ, প্রচার ও পরামর্শ সংগ্রহের জন্য ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ আলাপ-আলোচনা দেশে শান্তির পরিবেশ সৃষ্টির সহায়ক হবে। জাতীয় সরকারের বিষয়টিও আলোচনায় নিতে পারেন।

ঘ) রপ্তানি আয়ে অগ্রিম আয়কর বৃদ্ধি

রপ্তানি আয়ে ০.৫% স্থলে ১% অগ্রিমকর ধার্য করা যুক্তিসঙ্গত হয়েছে। রপ্তানিতে ০.৫%-এর পরিবর্তে ১% অগ্রিম আয়কর কর্তন সাম্যভিত্তিক। উল্লেখ্য, বাজেটে সব করপোরেট ব্যবসায়ীদের করহার ৩২.৫% থেকে কমিয়ে ৩০% করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা আন্দোলনের হুমকি না দিয়ে কৃতজ্ঞ হওয়ার অভ্যাস করুন। এক ব্যক্তি কোম্পানির করও কমানো হয়েছে। ব্যাংক ও বিমার আয় কর কমিয়ে দিন, তবে এসব সংস্থা দাতব্য কাজে ন্যূনতম ৫% দানে করতে কাম্য। ক্ষুদ্রঋণ, ঝগঊ অর্জিত আয়কারী সম্পদ তৈরি প্রতিষ্ঠানের আয়কর মুক্ত করা হয়েছে।

ঙ) বেসরকারী শিক্ষা ও সেবা প্রতিষ্ঠানে আয়কর প্রয়োগ ভুল সিদ্ধান্ত

কেবল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৫% আয়কর ধার্য হয়েছে, যা অত্যন্ত গর্হিত, ভুল, অনৈতিক এবং শিক্ষা প্রসারে প্রতিবন্ধকও বটে। বেসরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা অন্য কোনো সরকারি অনুমোদন ভর্তুকি নেই। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে এরূপ কোনো কর নেই। এটা সংবিধানের পরিপন্থি। মেডিকেল যন্ত্রপাতির ওপর ধার্য বিভিন্ন শুল্ক ও অগ্রিম কর চিকিৎসা সেবার অন্যতম প্রতিবন্ধক। বড় হাসপাতালকে ১০ বছর আয়কর মুক্ত করা হয়েছে। বারবার কর্তৃপক্ষের নজরে আনার পর ও বিগত কয়েক বছর ধরে হাসপাতাল শয্যা, মেডিকেল যন্ত্রপাতির ওপর ১৫% থেকে ৫৮% বিবিধ শুল্ক ও অগ্রিম আয়কর চালু রাখা হয়েছে। ছোট হাসপাতালের আমদানিকৃত যন্ত্রপাতির ওপর অত্যাধিক শুল্ক রয়েছে যা স্কয়ার, ল্যাবএইড, ইউনাইটেড, এভারকেয়ার ধনী লোকের হাসপাতালের ওপর প্রযোজ্য হয় না। তারা মাত্র ১% ট্যাক্স দিয়ে এসব মেডিকেল যন্ত্রপাতি আমদানি করেন। এই জাতীয় নিয়মাবলি রাষ্ট্রীয় সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

প্রস্তাবিত বাজেটে কর ও শুল্ক কিছু কমানোর পরও আমদানিকৃত অধিকাংশ যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে ২০.৫০% থেকে ৫৮.৬০% ট্যাক্স দিতে হবে২।

পরিবারভিত্তিক পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রপাতি, পয়ঃপ্রণালি পরিষ্কারক (Sewage Treatment Plant) যন্ত্রপাতির ওপর আমদানি কর ধার্য করা ভুল সিদ্ধান্ত। প্রিন্টিং প্লেট, ফিল্ম আমদানিতে ১% থেকে শুল্ক বৃদ্ধি করে ১০% করা সংবাদ ও মিডিয়ার কণ্ঠবোর্ডের পূর্ব পদক্ষেপ। কাজু বাদামের শুল্কহার কমানোর কারণ কী? ধনীদের আর কত সুবিধা দেবেন? হাসপাতাল, মেডিকেল, ল্যাবরেটরি ও শিক্ষা উপকরণের আমদানিতে সকল প্রকার শুল্ক, ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর রহিত করা হবে ন্যূনতম মৌলিক পরিবর্তন।

) একাধিক শুল্ক স্তর হয়রানি দুর্নীতির দ্বার : ছয় স্তরের পরিবর্তে তিন স্তর বিশিষ্ট আমদানি ১%, ১০% ও ২৫% শুল্ক করলে দুর্নীতি কমবে, জনগণের হয়রানি কমবে, সরকারের রাজস্ব বাড়বে।

ক্ষুদ্র খামারি শ্রমিকের প্রাপ্যতা ভুলে গেছেন

সরকারি ভাষ্যমতে, ১২০১৮ সানে বাংলাদেশের শ্রমিক সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৩৫ লাখ, ষাটোর্ধ্ব জনসংখ্যা ১.২০ কোটি, যা ২০৪১ সালে ৩.১০ কোটির বেশি হবে। বাজেটে কোনো মৌলিক পরিবর্তনের নির্দেশনা নেই, গতানুগতিক বাজেট হয়েছে। ধনী ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের স্বার্থই বিবেচনা নেয়া হয়েছে। প্রান্তিক চাষি, খামারি, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উন্নয়ন ও পুষ্টি বৃদ্ধির কোনো সুস্পষ্ট সুপারিশ ও প্রণোদনা নেই। তাদের কেবল সামাজিক সুরক্ষা ও আজীবন পেনশন মুলা দেখানো  হয়েছে। তাদের বেতন বৃদ্ধি ও খাদ্য সামগ্রীর মূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিপরীতে সামরিক বাহিনীর ন্যায় সুলভে সাপ্তাহিক রেশন প্রথা চালুর কোনো উদ্যোগ নেই, মাসে মাত্র এক হাজার টাকা এক্সিডেন্ট সুবিধাসহ, জীবন বীমাসম্পৃক্ত স্বাস্থ্যবিমার প্রিমিয়ামে শ্রমিক দেবেন মাসে ১০০ টাকা, কোম্পানি ৫০০ টাকা এবং সরকার দেবে ৪০০ টাকা। এ জাতীয় জীবন স্বাস্থ্যবিমায় শ্রমিকের পুরো পরিবারের প্রায় সব চিকিৎসা সুবিধার নিশ্চয়তা সম্ভব। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের স্বাস্থ্যবীমার ক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান, শ্রমিক সন্তানদের বিনা টিউশন ফিতে স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন সুবিধা নিশ্চিত করুন। বিশেষ হ্রাসকৃত দরে পরিবহন সুবিধা দেয়া ও সম্ভব।  জীবনযাত্রার  ব্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন-ভাতা দাবি বিশ হাজার টাকা। ছেলে-মেয়েদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিনা টিউশনে শিক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রতিবন্ধী শ্রমিক ও বয়োবৃদ্ধদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা প্রয়োজন, অর্ধেক ভাড়ায় সব পরিভ্রমণ সুবিধা তাদের জীবনে কিছুটা হাসি আনন্দ আনবে। সামাজিক নিরাপত্তা ও সার্বজনীন পেনশনের মুলা ঝুলানো হয়েছে। এটা যথেষ্ট নয়।

ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ নেই। বরং তাদের ক্ষুদ্র শিল্প হারে  বিদ্যুতের পরিবর্তে বাণিজ্যিক হারে বিদ্যুৎ বিল দিতে হয়। অধিক শুল্ক দিয়ে পোলট্রি, পশু ও মৎস্য খাদ্য আমদানি করতে হয়। ৫% সুদে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অবধি ঋণ না পাওয়ায় তাদের বড় উৎপাদক ও সিন্ডিকেটের সঙ্গে  প্রতিনিয়ত অসমতল সংগ্রামে লিপ্ত হতে হচ্ছে।

আয়করবহির্ভূত বার্ষিক আয়সীমা নির্ধারণ

আয়কর-বহির্ভূত বার্ষিক আয় সীমা বৃদ্ধি যুক্তিসঙ্গত ও কাম্য। আয়কর-বহির্ভূত বার্ষিক আয় তিন লাখের স্থলে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ প্রয়োজন। তিন লাখ টাকায় স্থির থাকলে রিকশাচালক, ভ্যানচালক ও বেবিট্যাক্সি চালকদের কাছে আয়কর আদায়ের জন্য ধাওয়া করতে হবে। উল্লেখ্য,  সব  ১৮ বছর বয়স্ক ঊর্ধ্ব সকল নাগরিক/, ক্ষুদ্র খুচরা ও ফুটপাতের হকার, খাবার দোকানদারদের নিকট থেকে মাসে (বছরে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা) আয়কর নিবন্ধন ফি বিবেচনা স্থির করুন। তবে পুলিশ, স্থানীয় মাস্তান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের হয়রানি বন্ধ করা নিশ্চিত করতে হবে। মধ্যবিত্ত পরিবার  তাদের গৃহকর্মীদের নামও নিজেরা বছরে ১ হাজার টাকা ফি দিয়ে আয়কর রেজিস্টেশন ও নিবন্ধন করাবেন। এই পদ্ধতিতে ন্যূনতম তিন হাজার কোটি টাকা নিবন্ধন ফি বাবদ অর্জিত হবে। আয়কর নিবন্ধনে আগ্রহ বাড়বে।

আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনের বিপরীতে জনগণতান্ত্রিক উন্নয়ন

আমলাতান্ত্রিকতার চোরাগলি কেন্দ্রীকতা। স্বল্পসংখ্যক সুবিধাবাদী শ্রেণি কেন্দ্রীকতার সংস্কারের পরিবর্তে বিঘ্ন জাতীয় নিরাপত্তা, অধিক ব্যয়, দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতি জুজুর ভয় দেখিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ সুকৌশলে প্রতিহত করে। তথাকথিত কতক বুদ্ধিজীবী এসব দলিল লেখক। বাংলাদেশে নতুন করে অতিরিক্ত বিভাগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। নতুন বিভাগ পদ্মা ও মেঘনা যোগ হয়েছে পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য। অথচ ১৯৩৪ সালে ফ্লাউড কমিশন বিভাগ প্রথা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিলেন। সুশাসন ও গণতান্তিকায়নের জন্য প্রয়োজন বাংলাদেশকে ১৫ বা ১৭টি প্রদেশ/স্টেটে বিভক্ত করে নিয়মিত সুষ্ঠু ভোটের মাধ্যমে প্রাদেশিক/স্টেট ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা। এতে জনগণতান্ত্রিক শাসনের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশে বহুলাংশে দুর্নীতিমুক্ত সেবার নতুন যুগ সৃষ্টি হবে। মুক্ত মনে বিষয়টি আলাপ করুন, প্রয়োগ করুন, আলোচনায় সাধারণদের সম্পৃক্ত করুন, বর্ধিত বরাদ্দের ফল জনগণের কল্যাণে আসবে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। সুষ্ঠু কর্ম পরিধি ও প্রকৃতজনে সেবা নিশ্চিত করার জন্য ব্যাপকভাবে জরিপ করে দরিদ্র, অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী, বয়োবৃদ্ধ, বিধবা পরিচালিত পরিবার সংখ্যা নিরূপণ, প্রদেশের রাজধানী, সংসদ, সংস্কৃতি কেন্দ্র, প্রশাসনের জন্য স্থান নির্ধারণ, বিবিধ প্রাদেশিক কর্মকমিশন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সমাজকল্যাণ ও নারীদের নিরাপত্তা কেন্দ্র, হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রাথমিক কার্যকলাপ শুরু করতে হবে। এই লক্ষ্যে এ বছরের বাজেটে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা প্রয়োজন। বর্তমানে সরাসরি ঢাকা থেকে নিয়োগকৃত ব্যক্তিরা সার্বক্ষণিকভাবে নির্ধারিত কর্মস্থলে অবস্থান করেন না। এমনকি নিন্ম আদালতের অনেক বিচারকও সপ্তাহে মাত্র ৩-৪ দিন আদালত পরিচালনা করেন। সরকারি কর্মকর্তারা স্থানীয় কর্মস্থলে সপরিবারে অবস্থান না করে শহরে ফিরে যান বৃহস্পতিবার দুপুরে। তাদের স্ত্রী-পরিজন বড় শহরে ফ্ল্যাট নিয়ে থাকেন। সন্তানরা শহরের স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করে। ফলে দেশ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। দুই স্থানের সংসারের কারণে ঘুষের পরিমাণ ও বেশি লাগে। অবস্থান নিশ্চিত করতে জনপ্রতিনিধি ও পেশা প্রতিনিধি গঠিত সমন্বয়ে প্রাদেশিক কর্ম কমিশন ও বিবিধবিষয়ক কর্তৃপক্ষ (Authority) মাধ্যমে নিয়োগ, প্রমোশন ও নিয়ন্ত্রণ করলে সুশাসন সহজলভ্য হবে। স্মরণযোগ্যয়ের কমিটির ক্ষমতা থাকে না, কর্তৃপক্ষের (Authority) সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ দ্রুত সেবার নিয়ামক।

পদ্মা প্রজ্ঞার প্রতিফলন প্রয়োজন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায়

সেবার অনুপস্থিতি, অপচয় এবং পেশাজীবী ও রাজনীতিবিদদের চিন্তার দীনতা দেশের দারিদ্র্য নিরসন না হওয়ার কেবল অন্যতম প্রধান কারণ নয়, স্বাস্থ্য অব্যবস্থাপনার বিস্তৃতি ও প্রসার ঘটায়। স্বাস্থ্যসেবা ক্রয়ের জন্য বাংলাদেশে পরিবারকে প্রায় ৭০% ব্যয়ভার বহন করতে হয়, যার অধিকাংশভুল ও অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসায় ব্যয়িত হয়।

. চিকিৎসা সেবার জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল

আগামী ২০ বছরে বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হওয়ার বিষয় স্মরণ রেখে। সুষ্ঠ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫ লাখ চিকিৎসক, ৪০ লাখ নার্স টেকনিশিয়ান, এক লাখ দাঁতের চিকিৎসক (ডেন্টিস্ট), ১০ লাখ সার্টিফাইড ফার্মাসিস্ট, বিশ হাজার মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার এবং ২ লাখ ফিজিওথেরাপিস্টের প্রয়োজন হবে। সঙ্গে প্রবর্তন করতে হবে এমবিবিএস চিকিৎসক (‡eneral Practitioner Physician),পদ্ধতি ও হাসপাতালে রেফারেল প্রথা। নার্সিং শিক্ষার দুর্বলতার কারণে উন্নত দেশ সমূহে বাংলাদেশি নার্সদের চাহিদা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। রোগীসেবা ও বয়োবৃদ্ধদের শারীরিক যত্নের, মমতাময়ী/মনোভাব ও পেশাগত দক্ষতা বাংলাদেশি নার্সদের মধ্যে প্রায় অনুপস্থিত।

দেশে ও বিদেশে বয়োবৃদ্ধদের সেবার জন্য প্রয়োজন ৬ মাস থেকে এক বছর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একাধিক ভাষা জানা শিক্ষিত হাস্যোজ্জ্বল ৫০ লাখ তরুণ তরুণী। ১/৫ অংশ দেশের বয়োবৃদ্ধদের সেবা দেবেন, বাকিরা উন্নত দেশসমূহে বয়োবৃদ্ধ সেবায় অংশ নিয়ে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে অধিক আয় দেশে প্রেরণ করবেন।

এখন থেকে ব্যাপক আকারে বিভিন্ন টেকনিশিয়ান ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেটধারী কোর্স চালু না থাকায়, আমদানিকৃত হাজার হাজার কোটি টাকার গুরুত্বপূর্ণ মেশিনসমূহ কেবল প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে বাক্সবন্দি বা অকেজো হয়ে পড়ে আছে এবং থাকবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী এলাকার হাসপাতালে এরূপ ঘটনার নজির আছে। ৫০টি জনবল প্রশিক্ষণ সংস্থায় বছরে মাত্র ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলে পর্যাপ্ত জনবলের প্রশিক্ষণ দেয়া সম্ভব হবে। ডিভিডেন্ট আসবে অনেক বেশি, সেবার গুণগত মান হবে অতুলনীয় ও আকর্ষণীয়।

চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অপচয় বন্ধ করা ও সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে সব সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস, বিডিএস, বিএসসি নার্সিং, বিফার্ম (ফার্মাসিতে ডিগ্রি), এম ফার্ম বিএসসি/এমএসসি, মাইক্রোবাইলোজি, অকুপেশনাল থেরাপি, বয়োবৃদ্ধ ও অন্যান্য বিভাগে সেবার শিক্ষাদানের জন্য  ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট শিক্ষা চালু করার জন্য দ্রুত অনুমোদন ও বরাদ্দ প্রয়োজন। অতিরিক্ত বিভাগীয় শিক্ষক সংগ্রহ সম্ভব। একই এনাটমি হলে, ল্যাবরেটরি, ফিজিওথেরাপি, নার্সিং ডেন্টাল ছাত্র ব্যবহার করতে পারবে উন্নত মানসিকতায়, আলাদা আলাদা রুগ্ণ কলেজ সৃষ্টি করছে ডিগ্রিধারীর ভাওতা চিকিৎসক ও অন্যান্য পেশাজীবী সার্টিফিকেট অর্জন করে কুচিকিৎসার প্রসার ঘটছে। একই মেডিকেল কলেজ থেকে বিবিধ প্রকার ডিগ্রি ডিপ্লোমা পড়িয়ে পরীক্ষা নিয়ে সার্টিফিকেট দিন। সকল মেডিকেল কলেজে বছরে ২০ হাজার  ছাত্রকে এমবিবিএসে ভর্তির সুযোগ দিন। এত সরকারের কোনো বিনিয়োগ লাগবে না, ছাত্ররা নিজ খরচে পড়বে। সব ক্ষেত্রে শিক্ষকের স্বল্পতার কারণে এই জাতীয় প্রথার দ্রুত অনুমোদন প্রয়োজন। পাঁচ হাজার বিদেশি ছাত্রকে বাংলাদেশে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ দিলে বছরে ২৫ মিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ২৫০ কোটি টাকা অর্জিত হবে।

. ইউনিয়ন স্বাস্থ্য পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে পরীক্ষামূলক চিকিৎসা সেবা উন্নয়ন

বাংলাদেশে প্রায় অচল অব্যবহƒত, যা নড়বড়ে ৫ হাজার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আছে, যা প্রায়ই দুপুর ২টার পর খোলা থাকে না। ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করার জন্য মাত্র ১০০টি (০.৫%) সেন্টারে সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজে এবং ১০০টি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১০টি এনজিওকে ৫ বছর চালানোর জন্য বরাদ্দ দিন। উভয় সংগঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দের টাকা খুশিমনে দ্রুত বড় দাতাগোষ্ঠী দিতে রাজি আছে। সুযোগ হেলায় হারাবেন না। পরীক্ষা করে দেখুন।

. সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের সুলভ সহজ নিবন্ধন

সব সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন একই নিয়ম ও মানদণ্ডে তিন বছরভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ফি ৫০ হাজার টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। ন্যূনতম দুজন সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, ১০ জন নার্স টেকনিশিয়ান এবং মৌলিক যন্ত্রপাতি থাকতে হবে, ইমার্জেন্সি চিকিৎসক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সরকারি চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ান লুকিয়ে সার্বক্ষণিক কাজ করতে পারবেন না। তবে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চিকিৎসক ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাইভেট ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতালে পূর্ণকালীন বা খণ্ডকালীন কাজ করার সুযোগ থাকবে।

. গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন

বর্তমানে একটি ইউনিয়নে ৩০ থেকে ৫০ হাজার নাগরিক বসবাস করেন, যা আগামী বিশ বছরে ৬০ থেকে ৮০ হাজারে পৌঁছবে। প্রায় সব ইউনিয়নে একটি দোতলা বিল্ডিংয়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আছে, যার নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে পড়ছে, ইলেকট্রিক সাবস্টেশন ও গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা সেখানে ঢাকা থেকে পাঠানো এমবিবিএস চিকিৎসক যান না, অবস্থান করেন না বিবিধ অজুহাতে। কিন্তু মাস শেষে নিয়মিত বেতন-ভাতা সংগ্রহ করেন। অনেকের সাধারণ মেডিকেল যন্ত্রপাতি পরিচালনার জ্ঞানও নেই। বেসিক কার্ডিওলজি, ডিফিব্রিলেটর, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, পালস অক্সিমিটার অক্সিজেন সরবরাহ, নেবুলাইজার, রক্ত পরিসঞ্চালন, ল্যাবরেটরির অতিপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ব্যবহার, লোকাল অ্যানেসথেসিয়া, স্বাভাবিক প্রসব, মুসলমানি প্রভৃতি শিখতে তিন মাসের বেশি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। চামড়ার নিচে ভেঙে যাওয়া মেরামত, এপেনডিক্স, সিজার অপারেশন, অবস্টেট্রিকেল আলট্রাসনোগ্রাফি, মৌলিক জেনারেল ও কাটামিন অ্যানেসথেসিয়ায় প্রভৃতি ৬ মাস প্রশিক্ষণ দিয়ে একজন তরুণ এমবিবিএসকে প্রশিক্ষিত করা অত্যন্ত সহজ কাজ। (চলবে)

 ট্রাস্টি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র