প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বাড়ির পাশে ড্রাগন চাষ

আফরোজা নাজনীন: একসময় শুধু ধান-পাট ও দেশি ফল চাষ করেই জীবনযাপন করতেন গ্রামের মানুষ, কিন্তু সময় পাল্টেছে এখন। হাঁটছে মানুষ ভিন্ন পথে। মানুষ এখন হাত বাড়িয়েছে অন্য দেশের দিকে। সম্পন্ন চাষিরা এখন বিদেশি ফল উৎপাদনে পারদর্শী হয়ে উঠেছেন। তারা বাড়ির পাশেই গড়ে তুলছেন বিদেশি ফলের বাগান। সে ধারাবাহিকতায় ড্রাগন এখন পরিচিত ফল হিসেবে জনপ্রিয়তা পেয়েছে গ্রামবাংলায়।

ঢাকার অদূরে সাভারের ওয়াসপুরের ষোলমাসী গ্রামের সালেহা বেগম বাড়ির পাশে দু’কাঠা জমিতে ড্রাগন ফলের চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রথম আমার এক বিদেশফেরত আত্মীয় আমাকে ড্রাগন চাষে উৎসাহিত করেন। আমি একেবারে উঠানের পাশে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু করি। বেশ ফল ধরে। সুমিষ্ট ফলগুলো শিশুরা খুব পচ্ছন্দ করে। আমি উৎসাহিত হয়ে বেশি জমিতে এ ফলের চাষ শুরু করি।’

সরেজমিন সালেহার বাগান ঘুরে দেখা যায়, একেবারে লতার মতো সবুজের ঘেরে ড্রাগন ধরেছে। প্রায় পাঁচ ফুট উচ্চতার খুঁটিতে পেঁচিয়ে উঠেছে ড্রাগন ফলের গাছ। সালেহা জানান চারা রোপণের তিন মাসের মাথায় ফল ধরে। এ বছর ফল বিক্রি করে তিনি এক লাখ টাকা লাভ করেছেন।

শেরপুরেও ড্রাগন ফলের চাষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নকলা উপজেলার রবিনা আলি এখন ড্রাগন চাষ করে স্বয়ংসম্পূর্ণ। আইএ পাস রবিনা শুরুতে একটা চাকরির জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু সফল হননি। তারপর বন্ধুদের পরামর্শে ড্রাগন ফলের চাষে ঝোঁকেন। আগে তিনি লাল শাক, টমেটো, বেগুন চাষ করতেন। ড্রাগন চাষে লাভবান হওয়ায় অন্য সব চাষ বাদ দিয়েছেন। রবিনা শুরুতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত লালবারি-১ জাতের ৪৫০টি চারা রোপণ করেন। এক বছরের মধ্যে ফল ধরে। রবিনা জানান, ড্রাগন উৎপাদন খরচ তুলনামূলকভাবে কম। ড্রাগন গাছে সামান্য জৈবসার দিলেই চলে, রাসায়নিক সারের তেমন প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় না কীটনাশকেরও। মাসে একবার ছত্রাকনাশক ছিটাতে হয়। শীতকালে রোদের জন্য আলোর ব্যবস্থা করতে হয়। একবার রোপণ করলে টানা ২৫ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল ধরে। একটি গাছ থেকে প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ কেজি ফল পাওয়া যায়।

বাওসা গ্রামের চাষি পারুল বেগম জানান, তার বাগানে ৮০টি গাছ রয়েছে। ড্রাগন চাষে সময় কম লাগে। বাড়তি ব্যয় নেই। সংসারে বাড়তি আয় হয়। ফলে ড্রাগন ফলের চাষ লাভজনক।

শেরপুরের রোহা গ্রামের মেয়ে শেফালী ড্রাগন চাষেই নিজের জীবিকা খুঁজে পেয়েছেন। মা-বাবা মারা গেছেন ছোটবেলায়, নানির কাছে মানুষ হওয়া শেফালীর বয়স এখন ১৮ বছর। শেফালী যে বাগানে কাজ করেন, সেখানে ড্রাগনসহ অন্য ফলের চাষ হয়। তবে শেফালী অন্য ফল নয়, ড্রাগন ফলের পরিচর্যা করেন। এ বাগানের মালিক হজরত আলী। তার রয়েছে ১০০ বিঘা জমি। এ জমিতে ড্রাগন, মাল্টা, কমলা, আঙ্গুর, খেজুর এবং বিভিন্ন দেশি ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়।

শেফালী জানান, এ ফলে ফরমালিন ও ক্ষতিকারক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না বলে এর চাহিদা বেশি। নকলা উপজেল কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল ওয়াদুদ জানান, এলাকার কৃষকদের ড্রাগন চাষে উৎসাহিত করতে মাঠ পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকদের পরামর্শ দেন। বাড়ির আঙিনা ও ফেলে রাখা জমিতে এ ফলের চাষ করে তারা লাভবান হচ্ছেন।

শুরুতে ২০১২ সালে জামালপুর হর্টিকালচার সেন্টার নকলায় ৩২০ জন নারী-পুরুষ কৃষককে কাটিংকৃত চারা সরবরাহ করে। তাদের প্রশিক্ষণ দেয়াসহ বিনা খরচে প্রয়োজনীয় উপকরণও সরবরাহ করে। প্রতি বছরই প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষকদের সাহায্য করা হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খামারবাড়ির উপপরিচালক ড. মোহিত কুমার দে বলেন, ২০১২ সালে নকলায় ড্রাগন চাষ শুরু হয়। পরে তা বাণিজ্যিক চাষে রূপ নেয়। কৃষিবিভাগ থেকে কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহায়তা দেয়া হয়।

বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার কুন্দ গ্রামের চাষি সুফলা দে ১৫  বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষ করেন। শুরুতে স্বামী মনিলাল দে তার সঙ্গে ছিলেন। এখন তিনি কিডনিজনিত রোগে ভুগছেন, তাই কায়িক পরিশ্রম করতে পারেন না। এবার তাদের বিঘাপ্রতি খরচ পড়েছে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। সুফলা সাংবাদিকদের কাছে বলেন, কৃষিবিভাগ যদি সহজ শর্তে ঋণ দেয় তবে আরও বেশিসংখ্যক মানুষ ড্রাগন চাষ করবে। সুফলা আরও জানান, সব ধরনের মাটিতে ড্রাগন চাষ হয়। তবে উঁচু জমিতে ভালো ফলন হয়। তিন মিটার পরপর চারা রোপণ করতে হয়। বছরের যেকোনো সময়ে চারা রোপণ করা যায়। তবে এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে হলে ফলন ভালো হয়। প্রতিটি ফলের ওজন ২০০ থেকে ৬০০ গ্রাম। একটি গাছে সর্বোচ্চ ৮০টি ফল ধরে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিঠু চন্দ্র বলেন, সুফলাদের বাগান অন্যদের উৎসাহ দিচ্ছে। কৃষি বিভাগ তার চাষের তদারকি করছে।

বেশ কয়েক বছর গ্রামীণ অর্থনীতি পাল্টে যাচ্ছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্রযুক্তিসহ চাষের ধরন-ধারণ পাল্টে গেছে। ফসল নির্বাচনেও কৃষকরা সচেতন হচ্ছেন। তারা লাভজনক ফসলের দিকেই ঝুঁকেছেন এখন। সে পথ ধরেই কৃষকদের সামনে ড্রাগন এখন প্রধান অর্থকরী ফসলের একটি হয়ে উঠেছে।

ঝালকাঠির রাজাপুরের শুক্তাগড় ইউনিয়নের সাংগর গ্রামে ড্রাগন চাষের জোয়ার লেগেছে। এ গ্রামের মেয়ে আনিসা বেগমের বিয়ে হয়েছিল দশ বছর আগে ১১ বছর বয়সে। আট বছর পর স্বামী মারা যান হার্টের সমস্যায়। আনিসা ফিরে আসেন বাবার বাড়ি। কিছু তো করতে হবে। সেই চিন্তা থেকে ও দশজনের পরামর্শে ড্রাগন চাষে ঝুঁকে পড়েন। শুরুতেই ঝুঁকি নিয়ে আনিসা বাবার কাছ থেকে পাওয়া দুই বিঘা জমিতে চাষ শুরু করেন। তার সঙ্গে আরও দুজন রয়েছেন। তারা দুই হাজার ড্রাগন চারা রোপণ করেন। আনিসা মনে করেন, মাটি ও আবহাওয়া অনুকূল বলে ফলন ভালো হবে।

রাজাপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মোহম্মদ রিয়াজ উল্লাহ বাহাদুর বলেন, নতুন অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি লাভ হবে বলে তারা আশা করছেন। এখানকার মাটি ফল চাষাবাদের জন্য বেশি উপযোগী বলে এখানকার কৃষকরা নতুন নতুন ফলের আবাদ করছেন। তিনি আরও বলেন, ড্রাগন ফল দেশের চাহিদা মিটিয়ে অচিরেই বিদেশ রপ্তানি করা যাবে। আমরা সেই সুদিনের অপেক্ষায়।

পিআইডি নিবন্ধ