সারা বাংলা

বান্দরবান ‘মিনি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান’প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ

আলাউদ্দিন শাহরিয়ার, বান্দরবান : বান্দরবান পৌরবাসীর পানির সংকট নিরসনে দুই কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া ‘মিনি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান’ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পানির রিজার্ভার করা হলেও ট্রিটমেন্ট প্ল্যানের সঙ্গে সম্পৃক্ত আশপাশ এলাকাগুলোয় পানি সরবরাহের জন্য পাইপলাইন স্থাপন, সাবমারসিবল পাম্প মোটর বসানো এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ তার লাগানোসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলো করা হয়নি। পুরোনো প্রকল্প সংস্কার করে নতুন দেখিয়ে অফিসের যোগসাজশে ঠিকাদার প্রকল্পের সম্পূর্ণ বিলের টাকা উত্তোলন করে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে স্থানীয়রা। পৌরবাসীর পানির সংকটে নেওয়া প্রকল্পটি জনগণের কোনো কাজেই আসছে না।

জনস্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বান্দরবান পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে পৌরবাসীর পানির সংকট নিরসনে দুই কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পের টেন্ডার দেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় সাঙ্গু নদীর পাড়ে পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুরে একটি, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন পাড়ায় একটি এবং ৫ নম্বর ওয়ার্ডের উজানীপাড়ায় একটি আরসিসি রিজার্ভার নির্মাণ করা হয়েছে। প্রত্যেকটি রিজার্ভার তৈরিতে ব্যয় হয়েছে ৩১ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাঙ্গু নদী থেকে প্রত্যেকটি রিজার্ভ ট্যাংকিতে পানি উত্তোলন এবং রিজার্ভার থেকে আশপাশ এলাকাগুলোয় পানি সরবরাহের জন্য তিন লাখ টাকা ব্যয়ে সাবমারসিবল পাম্প মোটর ক্রয়, পাঁচ লাখ টাকার ইলেকট্রিক সরঞ্জাম ক্রয় এবং রিজার্ভার থেকে আশপাশ এলাকাগুলোয় পানি সরবরাহের জন্য পাইপলাইন স্থাপন ও উপকারভোগীদের পানি সংগ্রহের প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা ছিল। অন্যদিকে প্রায় এক কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ৫০০ ফুট গভীর ছয়টি টিউবওয়েল স্থাপনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। একেকটি টিউবওয়েল তৈরিতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১২ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রত্যেকটি টিউবওয়েলের জন্য তিন লাখ টাকা ব্যয়ে একটি করে সাবমারসিবল পাম্প মোটর এবং পাঁচ লাখ টাকার ইলেকট্রিক সরঞ্জাম ক্রয় দেখানো হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের স্থানগুলো হচ্ছেÑবালাঘাটা পুলিশ লাইনে দুটি, কালেক্টরেট স্কুলে একটি, পুলিশের সার্কেল অফিসে একটি, জেলা কারাগারে একটি ও ফায়ার সার্ভিস এলাকায় একটি।  

ইসলামপুরের স্থানীয় বাসিন্দা মৃদুল কান্তি দে তাপস অভিযোগ করে বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ থেকে দুটি সাবমারসিবল পাম্প মোটর দেওয়া হয়েছে। একটি রিজার্ভারের মধ্যে রয়েছেÑআরেকটি মোটর দিয়ে সাঙ্গু নদী থেকে পানি উত্তোলন করা হয় উপরের ক্লিনিং ট্যাংকিতে। প্রকল্পের আওতায় কয়েকজন পরিবারের ব্যবহারের জন্য সামান্য পাইপলাইন স্থাপন করে পালিয়েছে ঠিকাদার। আশপাশ এলাকাগুলোয় পানি সরবরাহের জন্য কোনো পাইপলাইন স্থাপন করা হয়নি। স্থানীয়রা ব্যক্তি উদ্যোগেই পাইপলাইন টেনে পানি ব্যবহার করছে।

নতুনপাড়ার বাসিন্দা আবু বক্কর বলেন, ‘রিজার্ভার থেকে পানি সরবরাহের জন্য নতুন করে কোনো পাইপলাইন স্থাপন করা হয়নি। বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগেই পাইপলাইন স্থাপন করে পানি ব্যবহার করছে। কিন্তু নদী থেকে পানি উত্তোলন এবং সরবরাহের জন্য দুটি মোটর দেওয়া হয়েছে। নদী থেকে পানি উত্তোলন করে মজুত করা বিশুদ্ধকরণ ট্যাংকির ওপরে কোনো সøাপ দেওয়া হয়নি। এ কারণে ময়লা পড়ে বিশুদ্ধকরণের ক্লিনিং ট্যাংকির পানি আরও দূষিত হচ্ছে।’

উজানীপাড়ার বাসিন্দা সা থোয়াই অভিযোগ করে বলেন, ‘উজানীপাড়া পাম্প হাউসটি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সবচেয়ে পুরোনো পাম্প হাউস। এখানে মিনি ট্রিটমেন্ট প্রকল্পের আওতায় নতুন করে কোনো পাইপলাইন স্থাপন করা হয়নি। আশপাশ এলাকাগুলোয় পানি সরবরাহের জন্য কোনো পাইপলাইন দেওয়া হয়নি। সাবমারসিবল পাম্প মোটর লাগানো হয়েছে দেখেছি, কিন্তু সেগুলো কোনো প্রকল্পের আওতায় বলতে পারব না। পুরোনো প্রকল্পটি নতুন করে দেখিয়ে ঠিকাদার এবং অফিস যোগসাজশে প্রকল্পের টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে মনে হচ্ছে।’

তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট উপ-সহকারী প্রকৌশলী মনজেল হোসেন বলেন, ‘রিজার্ভার থেকে আশপাশ এলাকাগুলোয় পানি সরবরাহের জন্য পাইপলাইন স্থাপন এবং উপকারভোগীদের পানি সংগ্রহের জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরির জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না প্রকল্পে। তবে প্রকল্পগুলো কেন করা হলোÑএমন প্রশ্নের জবাবে প্রকৌশলী একই কথা বলেন, বরাদ্দ ছিল না। কিন্তু টিউবওয়েল ছয়টি থেকে কিছু পাইপ বাঁচিয়ে টিট্রমেন্ট প্ল্যানের রিজার্ভার থেকে পানি সরবরাহের জন্য পাইপলাইন স্থাপন করে দেওয়া হয়েছে।’

সরেজমিন ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, সোয়া এক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত টিউবওয়েলগুলোর অধিকাংশই জনগণের কোনো কাজেই আসছে না। বালাঘাটা পুলিশ লাইনের দুটি টিউবওয়েলের মধ্যে একটি দিয়ে অল্প অল্প পানি পাওয়া যাচ্ছে। আরেকটি দিয়ে নির্মাণের পর থেকেই পানি উঠছে না। ৫০০ ফুট গভীর টিউবওয়েলগুলোর গভীরতা ১৫০-২০০ ফুটের বেশি করা হয়নি এবং নি¤œমানের পাইপ ফিটিংস ব্যবহার করা হয়েছে। কোটি টাকা ব্যয়ে রিজার্ভারগুলো তৈরি করা হলেও রিজার্ভার থেকে আশপাশ এলাকাগুলোয় পানি সরবরাহের জন্য পাইপলাইন সম্প্রসারণ, সাঙ্গু নদী থেকে পানি উত্তোলনের জন্য মোটর ক্রয়, বৈদ্যুতিক সংযোগ লাইনের তার টানানো এবং পৌরবাসী পানি সংগ্রহের জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজগুলো করা হয়নি। ইসলামপুর এবং নতুনপাড়া এলাকার মুষ্টিমেয় পরিবারের ব্যবহারের জন্য কিছুসংখ্যক পাইপলাইন স্থাপন হয়েছে। যার সুফলও পাচ্ছে এলাকাবাসী। অন্যদিকে উজানীপাড়ায় জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো পাম্প হাউসটি সংস্কার করে নতুন করে রং এবং মোটর লাগিয়ে প্রকল্পের পুরো টাকায় উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, ‘উজানীপাড়ায় জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো একটি পাম্প হাউস ছিল। সেটি সংস্কারের মাধ্যমে নতুন করে রং লাগিয়ে প্রকল্পের পুরো অর্থই লোপাট করেছে ঠিকাদার। মিনি ট্রিটমেন্ট প্ল্যানের তিনটি রিজার্ভার থেকে আশপাশ এলাকাগুলোয় পানি সরবরাহের জন্য পাইপলাইন সম্প্রসারণ, সাঙ্গু নদী থেকে পানি উত্তোলন, সরবরাহের জন্য সাবমারসিবল পাম্প মোটর ক্রয়, বৈদ্যুতিক সংযোগ লাইনের তার টানানো এবং পৌর বাসিন্দার পানি সংগ্রহের জন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরির কথা থাকলেও ঠিকাদার কাজগুলো করেনি। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলের নির্দেশে অফিস ম্যানেজ করে ঠিকাদার দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্পের বিলের সম্পূর্ণ অর্থই উত্তোলন করে নিয়েছে।

এ বিষয়ে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন বলেন, ‘পৌরবাসীর পানির সংকট নিরসনে প্রকল্পটি কিছুটা হলেও ঘাটতি মেটাতে সক্ষম হয়েছে। কাজের মধ্যে ভুলত্রুটি থাকবে। কিন্তু কাজ আদায় না করে কোনো ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়নি।’

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..