প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বায়ুদূষণে ঢাকা আর কতকাল বিশ্বে শীর্ষে থাকবে

মোহাম্মদ আবু নোমান: কিছু দিন/ কাল/ বছর পর আমরাই প্রথম! রেকর্ড আর রেকর্ড! এভাবে আমরা অনেক কিছুতেই হরদম চ্যম্পিয়ন! তা যা-ই হোক… মন্দ কি খারাপ…, আমরা শীর্ষে আছি না! শীর্ষস্থান অর্জন করায় একটা আনন্দ মিছিলের আয়োজন কেন করা হয় না! কী করছে পরিবেশ ও সিটি করপোরেশন? কয়েক দিন আগেও তো সিটি মেয়রসহ আমরা গিনেস বুকে নাম লেখার কামনায় বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ ঝাড়– দেয়ার আয়োজন দেখেছি। সিটি করপোরেশনের নানা সফলতায় আমাদের বলতেই হবেÑ‘উন্নয়নের বাংলাদেশ, ধুলোবালির নেই তো শেষ।’ অতীতে আমাদের লাগাতার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার রেকর্ড কারও অজানা নয়। জš§দূষণ, শিক্ষাদূষণ, নীতিদূষণ, দখলের দূষণ, দুর্নীতির দূষণ, নদীদূষণ, তেলমারা-দূষণÑএসব কত কী আমরা দেখছি। আসলে আমাদের কতিপয় (সবাই নয়) নীতিনির্ধারকের মগজেই যেখানে দূষণ, সেখানে বায়ু বেচারা দূষণে আর কী মহা অন্যায় করল!

বায়ুদূষণে গত ১২ ডিসেম্বর দিনভর শীর্ষস্থানে থাকা অবস্থান রাতেও ধরে রেখেছে রাজধানী ঢাকা। বিশ্বের বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ ডিসেম্বর রোববার সন্ধ্যা ৭টা ২২ মিনিটে বিশ্বের ১০০টি প্রধান শহরের মধ্যে বায়ুদূষণের দিক থেকে ঢাকা শীর্ষে ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার দিন ও রাতের বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশের রাজধানীর বায়ু ছিল খুবই অস্বাস্থ্যকর। বায়ুদূষণের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল পাকিস্তানের লাহোর, তৃতীয় স্থানে ভারতের কলকাতা ও চতুর্থ ভারতেরই আরেক শহর দিল্লি।

বৈশ্বিকভাবে বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা এয়ার ভিজ্যুয়ালের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আমরা দেখছিÑ‘ঢাকার বাতাসে ভয়াবহ বিপদ!’ আমরা ঢাকা শহরে প্রতিনিয়ত বিষ গ্রহণ করছি! খাবারে বিষ, বাতাসে বিষ, পানিতে বিষ, মাছ-ফল-সব্জিতে বিষ, চলাফেরায় ঝুঁকিÑএরকম কত কিছুর ঝুঁকি নিয়েই আমরা চলছি! এটি সত্যিই দুঃখজনক। হতাশার যেন শেষ নেই। সব জায়গায় সমস্যা। এসব দেখারও যেন কেউ নেই। অনুধাবন করারও যেন কেউ নেই! হায়রে দেশ! হায়রে মানুষ!

কর্তৃপক্ষ চাইলে এই সমস্যার ৮০ ভাগ রোধ করতে পারে আইনি কঠোরতার মাধ্যমে। রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর নির্মাণে যার দ্বারা ধুলির উৎপত্তি, তাকে দিয়েই সঙ্গে সঙ্গে সেটা অপসারণ করাতে হবে। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে বালির ব্যবহার সিমেন্টের মতো বস্তায় ভরে নির্মাণস্থলে আনা-নেয়া ছাড়াও রাস্তার পাশে ঢেলে রাখা যাবে না। একদিকে লক্কড়-ঝক্কড় ধরনের ট্রাকে বালু পরিবহন করার মাধ্যমে পুরো রাস্তায় বালু ছড়িয়ে যাওয়া এবং রাস্তায় বালু স্তূপ করে রেখে কাজ করা সভ্য পৃথিবীর কোথাও আছে কী? সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িগুলো রাস্তায় ময়লা ফেলতে ফেলতে যায়। আজ ওয়াসা তো কাল ডেসা, কাল ডেসা তো পরশু তিতাস, এর পরদিন সিটি করপোরেশন, তার পরদিন বিদ্যুৎ কিংবা টিঅ্যান্ডটির সমন্বয়হীন কাটাকাটি চলছে তো চলছেই। এ খবর কে না জানে? কে আছে দেখার? কার কাছে আছে বিচার? এই খোঁড়াখুঁড়ি যদি সমন্বয় করে করা হতো, তাহলে জনভোগান্তি যেমন কমত, বায়ুদূষণও কমিয়ে আনা যেত। এই সমন্বয়হীনতার প্রভাব নাগরিক জীবনকে কীভাবে বিষিয়ে তুলছে, সে খবর রাখার দায় যেন কারও নেই।

সরকারি হিসাবে যেসব খালের কথা উল্লেখ আছে, সেগুলোর ছিটেফোঁটাও বাস্তবে পাওয়া যায় না। এর ফলে মানুষের দুর্দশা আর ভোগান্তি অন্তহীন। বর্ষায় রাস্তায় মানুষকে সাঁতরিয়ে নোংরা পানিতে, আর শুকনা মৌসুমে ধুলার বন্যায় চলতে হয়। এই হলো আমাদের নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক বাস্তবতা। অথচ বায়ুদূষণ প্রতিরোধযোগ্য। পৃথিবীর যেসব শহর বায়ুদূষণে ধুঁকছে, বরাবরই সেগুলোর তালিকার একদম শীর্ষে অথবা শীর্ষের কাছাকাছি জায়গা হয় আমাদের ঢাকার। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশ্বের যে পাঁচ দেশের শতভাগ মানুষ দূষিত বায়ুর মধ্যে বসবাস করে, বাংলাদেশ সেগুলোর অন্যতম।

ঢাকা কেন বারবার দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় প্রথম হবে? সিটি করপোরেশন, সড়ক পরিবহন ও পরিবেশ অধিদপ্তর যদি পরিবেশ দূষণে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, তাহলে তাদের কাজটা কী? শুধু বসে বসে বেতন নেয়া? সরকা?রেরও সুম?তি হবে না? বাংলাদেশের সরকারি প্রায় সব অফিসের কর্তারা বসে বসে বেতন নিতে আগ্রহী, কাজ করতে আগ্রহী নয়। বায়ুদূষণ রোধে অনেক সংস্থা নানা ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত। বায়ুদূষণের কারণগুলো দূর করার বিষয়ে তাদের কোনো ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। কালো ধোঁয়াসহ ক্ষতিকর বস্তুকণা বাতাসে ছড়ানো ফিটনেসহীন মোটরযানগুলোর চলাচল বন্ধ করার দায়িত্ব বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার। ঢাকার চারপাশের ইটভাটাগুলোর পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরের। রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ি ও অন্যান্য নির্মাণকাজের সময় ধুলা ওড়ানো বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাধ্য করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তাহলে এসব কর্তৃপক্ষের দায়িত্ববোধ আছে কী?

ধুলাবালির কারণে বৃদ্ধ, শিশুসহ নিরীহ জনগণের স্বাস্থ্যের জন্য দায়ী দেশের কতিপয় ধান্দাবাজ প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ সেবাদানকারী নামে খ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলো। গবেষণায় যখন উঠে আসে, ‘বায়ুদূষণে এক নম্বরে ঢাকা!’ তখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসেÑসিটি করপোরেশন কি আছে, নাকি বিলুপ্ত হয়েছে? থাকলে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও দুই সিটির এই কি সফলতা? রাজধানীর সড়কগুলোয় ধুলা নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন সকালে দুই সিটি করপোরেশন থেকে পানি ছিটানোর নিয়ম রয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় সরকারের তথা সিটি করপোরেশনের কার্যত কোনো উদ্যোগ নেই। এর প্রতিকার কার কাছে আছে? কে দেবে সমাধান! অথচ পুরো দেশ ডিজিটাল উন্নয়নের স্বপ্ন নিয়ে বিভোর!

আগে তো জীবন তারপর সবকিছু। ঢাকার বায়ুদূষণের সমস্যাটি কেন স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে? এ যেন ‘বিনা পয়সার’ সদয়, যা সবাইকে ইচ্ছায় হোক আর অনিচ্ছায় হোক নাকে-চোখে-মুখে শুধু ভোগই নয়, উপভোগও করতে হবে। সকাল, দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা বা রাতÑকোনো সময়ই ঘরে-বাইরে যার ছোঁয়া থেকে মুক্তি নেই, তা হলো মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর ও স্বাস্থ্যঝুঁকি-সংবলিত দুঃসহ ভয়াবহ জীবনসংহারী ধুলা আর ধোঁয়া! বহু আগেই ঢাকা শহর বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নির্বিকার। দূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে যেমন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি, তেমনি জলাশয় সংরক্ষণ ও নতুন করে তা গড়ে তোলারও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সরকার। বর্তমানে রাজধানীর বায়ুর মান এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে বায়ুদূষণকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে ঘোষণা ও পরিবেশগত ‘জরুরি অবস্থা জারি’ করার সময় হয়েছে বলে আমরা মনে করি।

বাতাসে অতিমাত্রায় ধুলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শহরের গাছগাছালিও। গাছের পাতায় জমছে ধুলার আস্তরণ। এর ফলে গাছের খাদ্য ও অক্সিজেন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। শুধু তাই নয়, পাতার পত্ররন্ধ্র ও সূর্যের আলোর মাঝখানে ধূলিকণার আস্তর প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করছে। ফলে কার্বনডাইঅক্সাইড গ্রহণ করতেও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে গাছ। সবুজ উদ্ভিদ সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে খাদ্য তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় শুধু খাদ্য তৈরিই করে না, অক্সিজেনও রিলিজ করে। মানুষ ও জীবজন্তু অক্সিজেনের মাধ্যমে বেঁচে থাকে, আর সেই অক্সিজেনের উৎসই হচ্ছে উদ্ভিদ। ধূলিকণার কারণে সালোকসংশ্লেষণ যেহেতু বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সুতরাং তা আমাদের পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি করছে।

বাতাসে মিশ্রিত সালফার, সিসা, দস্তা ইত্যাদি ধাতুকণা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর; বিশেষত বৃদ্ধ ও শিশুদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাকৃতিক পরিবেশদূষণের ক্ষতিকর প্রভাবের ফলে বছরে যত মানুষের মৃত্যু ঘটে, তার দুই-তৃতীয়াংশই বায়ুদূষণের ফলে। বায়ুদূষণের কারণে হƒদ্?রোগ, শ্বাসকষ্টজনিত জটিল সমস্যা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও ক্যানসার হয়। বিশেষত শিশু ও গর্ভবতী নারীদের স্বাস্থ্যের ওপর বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব প্রকট হয়ে থাকে।

বায়ুদূষণ নিয়ে উদাসীন থাকার বিলাসিতায় বেশি দিন গা ভাসানোর সুযোগ হয়তো আমরা পাব না। কারণ তত দিন পর্যন্ত আমাদের শ্বাসযন্ত্র আর ক্যানসার প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আর সে ব্যাপারে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেক সতর্কবার্তাও রয়েছে। সর্বব্যাপী বায়ুদূষণে মানুষের আয়ু কমছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বে মানুষের আয়ু গড়ে প্রায় তিন বছর কমছে। একই কারণে প্রতিবছর ৮৮ লাখ (আট দশমিক আট মিলিয়ন) অকাল মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গবেষকরা বলেন, তামাক সেবনের চেয়েও বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য একটা বড় ঝুঁকির বিষয়। গবেষণায় দেখা গেছে, অকালমৃত্যুর কারণগুলোর মধ্যে ম্যালেরিয়ার চেয়ে বায়ুদূষণে বছরে ১৯ গুণ বেশি মৃত্যু হয়। এইচআইভি/এইডসের চেয়ে বায়ুদূষণে হয় ৯ গুণ বেশি মৃত্যু। আর অ্যালকোহলের চেয়ে বায়ুদূষণে হয় তিনগুণ বেশি মৃত্যু।

একথা ঠিক, শুধু আইন করে এবং কোনো সরকারের একক উদ্যোগ নিয়ে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়। অন্যের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপানোর আগে সর্বসাধারণের সচেতন হতে হবে। আমাদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রয়াস বিরাট শক্তিরূপে অর্জিত হতে পারে। সার্বিক দূষণের জন্য মানবসৃষ্ট কারণগুলো অনেকটাই দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দূষণ রোধে বিভিন্ন সময়ে নেয়া পদক্ষেপ মেনে না চলায় প্রতিনিয়ত পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। এজন্য শুধু সরকারের আশায় বসে থাকলে চলবে না, যার যার বাড়ি, দোকান, কারখানা, ফ্যাক্টরি ও অফিসের সামনের জায়গাটুকু পরিষ্কার রাখতে হবে। সর্বসাধারণেরও সচেতন হওয়া জরুরি। রাস্তায় যেসব ময়লা আবর্জনা ফেলা হয়, সেগুলোই জীবাণু হয়ে আমাদের শরীরে ঢুকছে! যতদিন পর্যন্ত আমরা সুশৃঙ্খল না হব, ততদিন আমাদের দেশ পরিচ্ছন্ন হবে না। কেউ কাউকে আলাদাভাবে সচেতন করা সম্ভব নয়। এজন্য থাকতে হবে নীতিমালা ও সুশাসন, যা আমাদের দেশে নেই। নিজেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। একে অপরের সঙ্গে মিলেমিশেই সম্ভব সমাজ, দেশ ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানো।

সাংবাদিক

[email protected]