মত-বিশ্লেষণ

বারি আম-১১: বারোমাসি সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক জাত

. মো. শরফ উদ্দিন: বাংলাদেশ মৌসুমি ফলের দেশ। এদেশে সারা বছরই নানা স্বাদের ও বর্ণের বিভিন্ন ধরনের ফল জš§ায়। বিশেষ করে ফলের মৌসুমে দেশের সর্বত্রই শুধু দেখা যায় নানা রকমের ফল। আবার দেশের মোট উৎপাদিত ফলের শতকরা ৬০ ভাগই বাজারে আসে মে-আগস্ট মাসে। অবশিষ্ট শতকরা ৪০ ভাগ ফল বাকি আট মাসে বাজারে আসে। বর্তমানে এদেশে ৭০ প্রজাতির ফলের চাষাবাদ হচ্ছে। এসব ফলের মধ্যে আম এদেশের ছোট-বড় সব শ্রেণির মানুষের কাছে সর্বাধিক পছন্দের একটি ফল। এটি বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ফল এবং একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের অধীন ফল বিভাগ এ পর্যন্ত ৬৬ প্রজাতির ফলের ওপর গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে এবং ৩৫ প্রজাতির ফলের ৮৫টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে শুধু আমেরই ১২টি উচ্চফলনশীল এবং প্রতি বছর ফল প্রদানে সক্ষম জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। বারি উদ্ভাবিত আমের উচ্চফলনশীল জাতগুলো হলোÑবারি আম-১, বারি আম-২, বারি আম-৩ (আম্রপালি), বারি আম-৪ (হাইব্রিড), বারি আম-৫, বারি আম-৬, বারি আম-৭, বারি আম-৮, বারি আম-৯, বারি আম-১০, বারি আম-১১ (বারোমাসি) এবং বারি আম-১২ (নাবী জাত)।

কোনো পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক ২০০ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে চাহিদার বিপরীতে ফলের প্রাপ্যতা হলো মাত্র ৭৮ গ্রাম। সাধারণত এদেশের মানুষ ফলের মৌসুমেই বেশি ফল খেয়ে থাকে, কারণ বছরের অন্যান্য সময় ফলের প্রাপ্যতা তত বেশি নয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৪১ হাজার ৬৭৬ হেক্টর জমিতে আমের চাষাবাদ হয় এবং উৎপাদিত হয় মোট ১২ দশমিক ৮৮ লাখ মেট্রিক টন আম। তবে অন্যান্য ফসলের তুলনায় অধিক লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছরই সারা দেশে বাড়ছে আমের চাষ।

বিদ্যমান ফলের ঘাটতি মেটানো এবং ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে প্রয়োজন উচ্চ ফলনশীল জাত। আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা ব্যবহার করে গুণগত মানসম্পন্ন আমের উৎপাদন খুব সহজেই বৃদ্ধি করা সম্ভব। ক্রমবর্ধমান এ চাহিদা মেটাতে আমের চাষাবাদও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এদেশে রয়েছে হাজারো আমের জাত। আমের জাত বাছাইয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতি বছর ফলন দেয় এমন ও উচ্চফলনশীল জাত। এ দেশের আমচাষিদের আম চাষাবাদে আগ্রহের কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) পর্যায়ক্রমিকভাবে উচ্চফলনশীল বিভিন্ন জাত উদ্ভাবন করে চলেছে। আমের প্রধান গবেষণা হয় আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র (আম গবেষণা কেন্দ্র) চাঁপাইনবাবগঞ্জে। তবে বারি আম-১১ জাতটি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, পাহাড়তলী, চট্টগ্রাম থেকে ২০১৫ সালে মুক্তায়িত হয়েছে। বারি উদ্ভাবিত জাতগুলোর মধ্যে শুধু বারি আম-১১ জাতটি বারোমাসি হিসেবে সারা দেশে ফলন দিচ্ছে। উদ্ভাবনের পর থেকে সারা দেশে এই জাতটির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে।

বারি আম-১১ জাতটির প্রথম বাণিজ্যিক বাগান করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) সোলায়মান, যিনি সোনাগাজী এগ্রো কমপ্লেক্সের স্বত্বাধিকারী। ছোট-বড় সব মিলিয়ে ২০০টি বারি আম-১১ জাতের মাতৃগাছ রয়েছে সেখানে। নিজ হাতে গড়ে তোলা আয়শা নার্সারি থেকে তিনি এ পর্যন্ত বারি আম-১১ জাতের ৬০ লাখ টাকার কলম বিক্রি করেছেন। আম বিক্রি করেছেন আনুমানিক ১০ লাখ টাকার। তার এই নার্সারিতে একটি কলমের দাম পড়ে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। তার পরও মানুষের চাহিদা মেটাতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।

বারোমাসি বারি আম-১১ জাতটি চাষাবাদ করে লাভবান হচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার রহনপুর উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রামের সেরাজুল ইসলাম। তিনি এক বিঘা জমিতে ২০০টি কলম লাগিয়েছিলেন। তা থেকে তিনি এই পর্যন্ত আয় করেছেন আট লাখ টাকা। এছাড়া তিনি স্থানীয় নার্সারি মালিকদের কাছে সায়ন বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন। তিনি ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে প্রতি কেজি আম বিক্রি করেছেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায়। এছাড়া সারা দেশের চাষিরা ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে এই জাতটির চারা লাগিয়েছেন, যা থেকে আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে ভালো আম উৎপাদিত হবে বলে আশা করছেন আম গবেষকরা।

বারোমাসি বারি আম-১১ জাতটির আম থোকায় থোকায় ধরে। দেশে এই আমটিকে ঘিরে ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কেউ এই জাতের বাগান করে লাভবান হচ্ছেন, আবার কেউ আমের কলম বিক্রি করে। আর চাষাবাদ পদ্ধতিও অন্যান্য জাতের মতোই। কলম লাগানোর পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যেই প্রথম মুকুল আসে, তবে এই মুকুলগুলো ভেঙে ফেলাই উত্তম। এদেশের যেকোনো জেলাতেই এ জাতটি ফলন দেবে। স্থানভেদে বছরে দু-তিনবার ফলন পাওয়া যাবে। জাতটি উচ্চ ফলনশীল, ফলের আকার লম্বাটে, গড় ওজন ৩১৭ গ্রাম, কাঁচা অবস্থায় হালকা সবুজ ত্বক এবং পাকা অবস্থায় ত্বক হলুদাভ সবুজ। ফলটি লম্বায় ১১ দশমিক তিন সেমি, প্রস্থে সাত দশমিক ৯ সেমি এবং পুরুত্বে সাত সেমি। এটির আঁটির ওজন ২৫ গ্রাম, খোসার ওজন ৪১ গ্রাম ও ভক্ষণযোগ্য অংশ শতকরা ৭৯ ভাগ। এটি মিষ্টি স্বাদযুক্ত এবং এটির টিএসএস ১৮.৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন আঞ্চলিক কেন্দ্র ও উপকেন্দ্র থেকে এ জাতটির মাতৃকলম সরবরাহ করা হচ্ছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন নামকরা নার্সারিতে এ জাতটির কলম পাওয়া যাচ্ছে। এ দেশের মানুষ পছন্দের এই ফলটি বছরব্যাপী খেতে চেয়েছিল, যা এ জাতটি উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই জাতটির বাণিজ্যিক চাষাবাদ যত দ্রুত অন্যান্য চাষিদের মাঝে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে, ততই বারোমাসি আমের উৎপাদন বাড়বে এবং মানুষের আশা ও ফলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে।

ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, ফল বিভাগ, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..