প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বাড়ছে কলমানি মার্কেট থেকে ধার নেওয়ার সীমা

শেখ আবু তালেব: ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও উচ্চ হারে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে তহবিল আটকে বিনিয়োগ সক্ষমতা কমে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর। সংকট বাড়ছে তারল্যের। দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ দেওয়ার জন্য ব্যাংকের চেয়ে বেশি সুদে আমানত নেওয়ায় মেয়াদ শেষে গ্রাহকদের তা পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। তারল্য সংকট মেটাতে কলমানি মার্কেট থেকে ধারের সীমা বৃদ্ধি করতে চায় তারা। সংকট সমাধানে তাদের প্রস্তাব মেনে নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
জানা গেছে, বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো মূলধনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ধার নিতে পারে কলমানি মার্কেট থেকে। এখন তা বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হবে। এছাড়া তারল্য সংকট মেটাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ড ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীদের নিয়ে গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সভা সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির ওই বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন। বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে সভায় অংশ নেওয়া একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নাম না প্রকাশ করার শর্তে জানিয়েছেন, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তহবিল সংকট বেড়েছে। আমানত বাজারও ভালো যাচ্ছে না। বিদ্যমান তহবিল সংকট কাটাতে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নরের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানগুলোর তাদের ইকুইটির ৩০ শতাংশের বেশি কলমানি মার্কেট থেকে ধার নিতে পারে না। গতকালের বৈঠকে তা ৪০ শতাংশ করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এর ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু তহবিল সরবরাহ বৃদ্ধি পাবে। দীর্ঘ মেয়াদে বন্ড ইস্যুতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে কর রেয়াত সুবিধা পেতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর বর্তমান তহবিল সংকট চলছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাংক নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন, এটি করতেও হবে। এজন্য তাদের দীর্ঘ মেয়াদে বন্ড ছাড়ার প্রতি বেশি জোর দিতে হবে। কেননা, এমনি পরিস্থিতিতে ব্যাংকের ওপর নির্ভরশীলতা না কমালে কোনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিয়েই টানাটানি শুরু হবে। এ কারণে বন্ডের প্রতি তাদের জোর দিতে বলা হয়েছে।
জানা গেছে, বেশিরভাগ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে চরম আর্থিক সংকট রয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিলের প্রধান উৎস ব্যাংক খাত। এছাড়া ব্যক্তি খাত থেকেও তারা আমানত নেয়। বর্তমানে ব্যাংক খাতে তহবিল সংকটে সরাসরি প্রভাব পড়ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। পূর্বে ব্যাংকগুলো যেখানে তাদের উদ্বৃত্ত তহবিল বিনিয়োগ করতে না পারলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ধরনা দিত। তখন ব্যাংকগুলো লোকসান কমাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধার দিত। এজন্য সুদহারও কমে তলানিতে নেমে যায়। এখন ব্যাংকগুলোই আমানত খুঁজছে উচ্চ সুদে।
যেখানে কলমানি মার্কেট থেকে দুই থেকে তিন শতাংশ সুদে ধার নেওয়া যেত, তখন কোনো কোনো ব্যাংকের পীড়াপীড়িতে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশ সুদে তহবিল সংগ্রহ করা হতো ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে। অনেক সময় কম সুদের আমানত নিয়ে বেশি সুদের আমানত পরিশোধ করত। কিন্তু এখন হচ্ছে এর উল্টো। ব্যাংকিং খাতে আমানত কমায় অনেক ব্যাংকেরই এখন তহবিল সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে অনেক ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে রাখা তহবিল প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এতে তহবিলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কোনো কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান তহবিল সংকট মেটাতে উচ্চ সুদেও আমানত পাচ্ছে না। বেশি সুদ দিয়ে এক প্রতিষ্ঠান আরেক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের ভাগিয়ে নিচ্ছে। বছর খানেক আগেও যেখানে সর্বোচ্চ সাড়ে সাত শতাংশ সুদে আমানত সংগ্রহ করা যেত, এখন কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তা সাড়ে ১০ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে আমানত নিচ্ছে। আমানত সংগ্রহে অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে সামনে আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। এ বিষয়টিকে গতকাল গভর্নরের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।

সর্বশেষ..