প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিআইডিএসের সেমিনারে বক্তারা: দক্ষ শ্রমশক্তি ছাড়া ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়

 

নিজস্ব প্রতিবেদক: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বড় হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। বাড়ছে ম্যানুফ্যাকচারিং ও সেবা খাতের আওতা। কিন্তু এসব খাতের চাহিদা পূরণে পর্যাপ্তসংখ্যক দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। সরকার ঘোষিত বিভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) দু’দিনব্যাপী ‘রিসার্চ অ্যালামনাক ২০১৬: দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বক্তারা। রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে অনুষ্ঠিত এ অ্যালামনাকে দুটি সেশনে চারটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। আজ নির্বাচিত বিষয়ে আরও সাতটি গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হবে।

বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক রুশিদান ইসলাম রহমান ‘লেবার মার্কেট, হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড স্কিল গ্যাপ ইন বাংলাদেশ: ম্যাক্রো লেভেল ইস্যুস’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন। তার গবেষণায় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মধ্যে সম্পর্ক উপস্থাপন করা ছাড়াও সামনের দিনে শ্রমশক্তির বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করেন। শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায়ের ৯২ দশমিক সাত শতাংশই প্রশিক্ষিত নন।

তিনি বলেন, ২০১৬ সালের শ্রমশক্তির সরবরাহ প্রায় ছয় কোটি ৪৮ লাখ। ২০২৫ সালে তা আট কোটি ২৯ লাখে উন্নীত হবে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ১০টি খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তিকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে না পারলে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর কষ্টসাধ্য হবে। ২০২০ সালে ৫৪ লাখ ৩০ হাজার এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ৭২ লাখ ১০ হাজার শ্রমশক্তিকে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে।

‘স্কিল গ্যাপ এনালাইসিস ইন ডিফারেন্ট সেক্টরস’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন বিআইডিএস মহাপরিচালক কেএএস মুরশিদ। দেশের ১০টি শীর্ষস্থানীয় খাত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, নির্মাণ, স্বাস্থ্য, হসপিটালিটি অ্যান্ড ট্যুরিজম, আইসিটি, লেদার গুডস, হালকা প্রকৌশল, আরএমজি এবং শিপবিল্ডিং খাতের শ্রমশক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এসব খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির কী ধরনের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে এবং উত্তরণের পদ্ধতির বিষয়ে গবেষণায় তুলে ধরা হয়।

তিনি বলেন, দেশে এখন কৃষি প্রক্রিয়াজাত ও আরএমজি শিল্পে সবচেয়ে বেশি অদক্ষ শ্রমিক কাজ করছে। এ দুটি খাতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে যথাক্রমে দুই লাখ ৪৫ হাজার এবং ২২ লাখ ৫৮ হাজার দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ছিল। তবে এ চাহিদা আরও বাড়বে। কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ছয় লাখ ৯০ হাজার দক্ষ শ্রমশক্তি প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে তৈরি পোশাক শিল্পে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৬ লাখ ৬৬ হাজার এবং ২০২৫-২৬ সালে ৫০ লাখ ২৭ হাজার প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তির চাহিদা তৈরি হবে। ফলে এ খাতে ২০২০-২১ সালে বাড়তি প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ এবং ২০২৫-২৬ সালে প্রায় ২১ লাখ প্রশিক্ষিত শ্রমিক দরকার হবে। তবে বিপুলসংখ্যক প্রশিক্ষিত শ্রমশক্তির চাহিদা তৈরি হলেও সরবরাহ দিতে সক্ষম নয় সরকারি-বেসরকারি ১০৪টি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বছরে ৭০ হাজার ৫০০ জনকে প্রশিক্ষিত করে তোলা সম্ভব।

সেমিনারে একটি অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, ২৩ মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে। কিন্তু এখানে অনেক দ্বৈততা যেমন রয়েছে, তেমনি দুর্বলতাও রয়েছে। বিদেশে দক্ষ করে শ্রমিক পাঠাতে পারলে অনেক বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করা সম্ভব। দেশের শ্রমশক্তিকে এখন উৎপাদনশীল কাজে লাগানোয় নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এর আগে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ২০৩০ সাল হবে ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ এবং আমাদের অর্থনীতি হবে জ্ঞানভিত্তিক। কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে জাতীয় অগ্রগতিতে তা কেমন অবদান রাখবে সেসব বিষয়ে গবেষণালব্ধ ধারণা থাকা অপরিহার্য। সরকারের অভিপ্রায় হচ্ছে বিআইডিএসকে আমাদের অর্থনীতির জন্য সেন্টার অব এক্সিলেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে বিআইডিএস থেকে মাস্টারস ডিগ্রি ও ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হবে।

সেমিনারে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূল স্রোতে আনতে সরকার কাজ করছে। এছাড়া চালের দাম ভারতের কারণে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কেননা দেশটির সঙ্গে মিল রেখেই পণ্যটির দাম নির্ধারণ করতে হয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ জনমিতি সুবিধা কার্যকরভাবে নিতে পারছে না। অল্প মজুরি এবং শ্রমের অদক্ষতার কারণে এমন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। এছাড়া আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও ভালো করার সুযোগ রয়েছে। এজন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। মেগা প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েই কাজ করলে হবে না, পরিবেশের বাইরে আরও কিছু নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এজন্য সরকারের উচিত প্রকল্পের সামাজিক ও আর্থিক বিষয়টি বিশ্লেষণ করা। এছাড়া এমডিজি থেকে এসডিতে যেতে হলে অবশ্যই শিল্পায়ন, নগরায়ন, পানি ব্যবস্থাপনা, ইকো সিস্টেম ও বনায়নে টেকসই পদক্ষেপ নিতে হবে।

আইএফপিআরআই’র প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক ড. পল ডরোস বলেন, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ভালো হলেও এখনও পুষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ রয়েছে। সভাপতির বক্তব্যে কেএএস মুরশিদ সেমিনারের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং গবেষণার প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতার বিষয়ে বক্তব্য রাখেন।

গতকাল দ্বিতীয় সেশনে ‘সাবসিডি ইন সোলার হোমস সিস্টেম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. মনজুর হোসেন ও ড. মোহাম্মদ ইউনুস। ‘পেট্রোলিয়াম ইমপোর্ট: এক্সপেরিয়েন্স অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ।