প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিআইবিএম’র সম্মেলন:ব্যাংক মালিকদের সঙ্গে নির্বাহীদের দালালি অনৈতিক

নিজস্ব প্রতিবেদক: ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তারা মালিকদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে কাজ করলে ব্যাংক স্বাস্থ্যবান হবে। আর যদি তারা মালিকদের দালালি করেন, তবে সেটা পুরোপুরি অনৈতিক বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।

বিআইবিএম আয়োজিত ব্যাংকিং কনফারেন্স ২০১৬’র দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন তিনি। এ বক্তব্যে এসব কথা বলা হয়েছে।

ইব্রাহিম খালেদ তার উপস্থাপনায় বলেন, বিশ্বব্যাপী কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার কাজটি করে থাকে। সেজন্য একটি ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক নিয়োগের আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে। অনেক দেশই এটা করে থাকে। এর মানে হচ্ছে প্রধান নির্বাহী হিসেবে একটি ব্যাংকে যিনি দায়িত্ব নেবেন তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি (নীতিগতভাবে)। তিনি আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা করবে। এজন্য বোর্ডের কেউ যদি ভালো কাজের প্রস্তাবনা আনেন সেটাতে সহযোগিতা করতে হবে নির্বাহীদের। আবার কেউ যদি কোনো অনৈতিক দাবি তোলেন, তাতে বাধা দেওয়া উচিত। মালিকদের সঙ্গে ‘কো-অপারেশনের’ মাধ্যমে ব্যাংকের ভালো-মন্দ দেখাশোনা করবেন। তবে ‘কো-অপারেশনের’ বদলে যদি তারা মালিকদের সঙ্গে ‘কোলাবোরেশন’ (বাংলায় যেটা দালালি) এর মাধ্যমে কাজ করেন, তাহলে সেটা পুরোপুরি ‘অনৈতিক ও অপবিত্র’।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে ব্যাংক মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বেশ কিছু নিয়ম পরিবর্তনের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এ প্রস্তাবনাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতেই ব্যাংকার্স কনফারেন্সে কি-নোট পেপার বা মূল বক্তব্য উপস্থান করেন তিনি। এতে ব্যাংক মালিকদের বেশিরভাগ প্রস্তাবনার  সমালোচনা করা হয়। আর এ বৈঠকে মালিকদের সঙ্গে কয়েকটি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা উপস্থিত ছিল বলে জানা গেছে।

ব্যাংক মালিকদের আজীবন পরিচালক হিসেবে থাকার যে দাবি, সেটাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে এ ধারা ফিরিয়ে আনা হলে ব্যাংক একটি স্বার্থান্বেষী মহলের দখলে চলে যাবে। এতে অন্য শেয়ারহোল্ডাররা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। কারণ মালিকদের শেয়ার রয়েছে ১০ শতাংশ। আর আমানতকারীদের অংশ ৯০ শতাংশ। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, তারা ১০ শতাংশ শেয়ার নিয়েই আজীবন পরিচালক থাকতে চান, তাহলে যাদের ৯০ শতাংশ শেয়ার তারা কী করবেন? কারণ এখন পর্যন্ত এসব শেয়ারহোল্ডারের যৌক্তিক প্রতিনিধি কয়টি ব্যাংকে আছে, সেটা বলা মুশকিল।

খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের হার কমিয়ে আনার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মূল বক্তব্যে বলা হয়েছে, এটা হচ্ছে আমানতকারীদের সুরক্ষার একটি সেইফগার্ড। এটা কম রেখে যদি কোনো কারণে ব্যাংকের সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে সেটা কে দেখবে। বিপদ তো ১০ শতাংশের মালিকদের চেয়ে আমানতকারীদের বেশি হবে। সুতরাং প্রস্তাবনাটি ঠিক নয়। এছাড়া শহরে ও গ্রামে শাখা খোলার অনুপাত কমবেশি হওয়ার বিষয়টি নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে এতে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো গ্রামগঞ্জে শাখা খুললেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো সেটা করতে চায় না। তারা মনে করে, সেখানে গেলে লোকসান হবে। কিছু বিষয় থাকে সেগুলো সোশ্যাল বিজনেসের ভিউ থেকে দেখতে হয়। সে জায়গাগুলোয় প্রত্যেকেরই যাওয়া উচিত, যদিও সেখানে লাভের অঙ্ক কম থাকে।

এছাড়া ব্যাংক কর্মকর্তারা ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সঙ্গে জড়িত নন বলে তাদের প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ডের আওতায় আনা হচ্ছে না। যেটা মালিকরা চান না। সার্র্বিক সেক্টর থেকে বর্তমানে জিডিপির ৫০ শতাংশ আসে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সেবা খাতের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ব্যাংকের অবদান। এখানে অসংখ্য মানুষ কাজ করে। তাহলে তাদের কাজের কি কোনো মূল্যই নেই। উৎপাদনে সরাসরি জড়িত না হলেও ব্যাংকগুলো তো উৎপাদনমুখী কাজ করতে তারা সহযোগিতা করে থাকেন। তাহলে কেন তারা লাভের অংশ পাবেন না।

এভাবে ব্যাংক মালিকদের প্রস্তাবনার বেশিরভাগ বিষয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা হয়েছে মূল বক্তব্যে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের মধ্যে একটি লিংক রয়েছে। মনিটরি পলিসিটা সরকারকে সহযোগিতা করার জন্যই করা হয়ে থাকে। তবে আইনগতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংককে তাদের কাজের ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়ার কোনো সুযোগ সরকারের নেই। এতে  বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হবে বলেও প্রস্তাবনায় তুলে ধরা হয়েছে। কারণ বিএবি যেসব বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব দিয়েছে এবং ছাড় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সে বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংক করতে পারে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মালিকদের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত থাকা একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা ওই দিন আসলে মন্ত্রণালয়ে আগে থেকেই মিটিং করছিলাম। তার মধ্যেই বিএবির প্রতিনিধিরা আসেন। আমরা সেখানে কোনো কথাই বলিনি। মাঝখান থেকে আমাদের ওপর দোষ চলে এসেছে; আমরা তাদের সঙ্গে গিয়েছি।’

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিআইবিএম’র মহাপরিচালক তৌফিক আহমেদ চৌধুরী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খানসহ আরও অনেকে। কনফারেন্সের শেষদিনে ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর আরও ১০টি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করা হয়