প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিআইবিএম সভায় বক্তারা: অনলাইন ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকসেবায় খরচ বেশি

নিজস্ব প্রতিবেদক: পণ্যের যথাযথ মান ও নতুনত্ব না আসার পরও গ্রাহকসেবার খরচ এখনও অনেক বেশি। যে কারণে অনলাইন ব্যাংকিং সেবায় এখনও গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা যায়নি। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) আয়োজিত ‘অনলাইন ব্যাংকিং: সুবিধা ও উদীয়মান অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ ধরনের মন্তব্য করেন।

বিআইবিএম মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধূরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী। বিশেষ অতিথি ছিলেন সোনালী ব্যাংকের সাবেক এমডি এসএ চৌধুরী, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইয়াসিন আলী ও অন্যান্য ব্যাংকের কর্মকর্তা।

এসএ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকের মালিকদের কাছে আইটি খাত অবহেলিত। কেন যেন তারা আইটিতে বিনিয়োগ করতে চায় না। দীর্ঘদিন বলার পরও বাংলা সফটওয়্যার তৈরি হয়নি। ব্যাংকগুলোকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য  নির্ধারণ ও পণ্যে নতুনত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে আলাদা বাজার তৈরি করতে হবে। তাহলে গ্রাহকের আস্থা পাওয়া যাবে। আইটি খাত অবহেলার শিকার হলেও ব্যাংকিং খাতে অটোমেশন সার্ভিসের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশ্বের কয়েকটি রাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে যাবে। তবে অটোমেশনের প্রবৃদ্ধি শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক। এটাকে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি অটোমেশনবঞ্চিত হচ্ছে। গ্রামের গ্রাহকের প্রতি নজর দিতে হবে।

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক পরিচালক হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, অনেক জায়গায় ইন্টারনেট পাওয়া যায় না। এটা ভালোভাবে দেখা দরকার। ই-কমার্সে নজর দিতে হবে। গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি) ঠিকভাবে নেওয়া হয় না। যদি বিস্তারিত পরিচয় না পাওয়া যায়, তবে ওই অ্যাকাউন্ট বাতিল করুন। কারণ বেশিরভাগ অপরাধে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইয়াসিন আলী বলেন, আগামী ১০ বছরের মধ্যে অনলাইন ব্যাংকিংয়ের জয়জয়কার অবস্থা হবে। তার জন্য কি ব্যাংকগুলো প্রস্তুত? আমার ধারণা, মাত্র তিন থেকে চারটি ব্যাংক ছাড়া বাকি সব ব্যাংক এখনও অপ্রস্তুত। কিছুদিন আগে এক ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অনুমোদন বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিআইবিএমের আইটিবিষয়ক এক কর্মকর্তা বলেন, অনলাইন ব্যাংকিং এককেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। কারণ অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ৯০ শতাংশ কার্যক্রম ঢাকায়। এছাড়া ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের বুঝিয়ে দেয় না। শুধু বলে, অনলাইন ব্যাংকিং করুন। অনেক গ্রাহক ইংরেজি বোঝে না। তাদের বোঝার জন্য কোনো বাংলা পদ্ধতি নেই। তাই তারা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সেবাও নিতে পারছে না। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনলাইন সংক্রান্ত গাইডলাইনের কিছু সংশোধনী চান। তার মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইন অসম্পূর্ণ। গাইডলাইনটি আরও বিস্তারিত হওয়া উচিত। কেওয়াইসি নিয়ে তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেসব অপরাধ সংঘটিত হয়, তার ৬৮ শতাংশের কেওয়াইসি ভুয়া। কিছু ব্যাংকার অনলাইন ব্যাংকিংয়ের সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, ক্ষুদ্র লেনদেনে বর্তমান সীমা যথেষ্ট; কিন্তু করপোরেট লেনদেনে কিছুতেই এটি যথেষ্ট নয়। বর্তমানে অনলাইনে দৈনিক সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা লেনদেন করা যায়। করপোরেট ক্ষেত্রে এ সীমা আরও বাড়ানোর দাবি জানায় তারা।

অনলাইন ব্যাংকিংয়ের ওপর বিভিন্ন ব্যাংকের এক হাজার ৪৪২ জন গ্রাহকের মধ্যে একটি জরিপ পরিচালনা করে বিআইবিএম। সরকারি ব্যাংকের ১৬৭, সরকারি বিশেষায়িত ব্যাংকের ৫৪, বেসরকারি ব্যাংকের ৭৬৯, বিদেশি ব্যাংকের ৪২৮ ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ২৪ গ্রাহক জরিপে অংশ নেন।

উত্তরদাতাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অনলাইন ব্যাংকিং সেবা সবচেয়ে বেশি গ্রহণ করেন নারীরা। বেশি সেবা গ্রহণ করেনÑএমন প্রায় ৫৩০ নারী জরিপে অংশ নেন, যা মোট জরিপের ৫৮ শতাংশ। পুরুষ অংশ নিয়েছেন ৩৭৯ জন, যা জরিপের ৪১ শতাংশ। সেবা গ্রহণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তরুণ-তরণী। যাদের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর।

অনলাইন ব্যাংকিং নিয়ে একটি গবেষণা উপস্থাপন করে বিআইবিএম। এতে আটটি চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়। অনলাইন ব্যাংকিংয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহার, সামর্থ্য বাড়ানো, গোপনীয়তা, সততা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা। এছাড়া ব্যাংকের কার্যকরী কমিটি ও পরিচালনা পর্ষদ হতে হবে অনেক দক্ষ। এর বাইরেও অনেক চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করা হয়।