দিনের খবর সারা বাংলা

বিএফআরআইয়ের চতুর্থ প্রজন্মের ‘সুবর্ণ রুই’ উদ্ভাবন

রবিউল আউয়াল রবি, ময়মনসিংহ: বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) পালকে যুক্ত হলো আরও একটি সাফল্য। প্রতিষ্ঠানটি এবার জেনেটিক গবেষণায় চতুর্থ প্রজন্মের নতুন জাতের ‘সুবর্ণ রুই’ মাছ উদ্ভাবন করেছে। ২০২০ সালে ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ এক যুগ গবেষণার মাধ্যমে নতুন জাতের এ মাছের উদ্ভাবন করেছে। রুইয়ের নতুন ওই জাতটি দ্রুত বর্ধনশীল, স্থানীয় জাতের চেয়ে ২০ দশমিক ১২ শতাংশ অধিক উৎপাদনশীল, খেতে সুস্বাদু এবং দেখতে লালচে ও আকর্ষণীয়। চতুর্থ প্রজন্মের এ জাতটি ‘সুবর্ণ রুই’ হিসেবে নামকরণ করছে বিএফআরআই। উন্নত জাতের নতুন উদ্ভাবিত এ রুই মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হলে দেশে প্রায় আট টন মাছ অধিক উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

মৎস্য খাতের সঙ্গে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকে স্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সুবর্ণ রুই’ মাছের নতুন জাত ঘোষণা ও অবমুক্ত করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ।

বিএফআরআই মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ শেয়ার বিজকে জানান, স্বাদু পানির অন্যতম প্রধান মৎস্য প্রজাতি রুই। বাংলাদেশে চাষযোগ্য মাছের মধ্যে রুই সবচেয়ে বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন মাছ। বর্তমানে মৎস্য চাষ প্রায় সম্পূর্ণভাবে হ্যাচারি উৎপাদিত পোনার ওপর নির্ভরশীল। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, হ্যাচারিতে উৎপাদিত রুই মাছের পোনার কৌলিতাত্ত্বিক অবস্থায় ও অন্তঃপ্রজননজনিত সমস্যা মৎস্য চাষ উন্নয়নে অন্যতম অন্তরায়। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ইনস্টিটিউটে কৌলিতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে রুইয়ের নতুন উন্নত জাত উন্নয়নে গবেষণা পরিচালনা করে।

গবেষণাসূত্রে জানা যায়, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও হালদা নদীর প্রাকৃতিক উৎস্য থেকে রুই সংগ্রহ করে ধারাবাহিক গবেষণায় ২০২০ সালে রুই মাছের চতুর্থ প্রজন্ম উদ্ভাবন করা হয়। নতুন জাতের এ মাছের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট হলো স্থানীয় জাতের তুলনায় চতুর্থ প্রজন্মের ‘সুবর্ণ রুই’ অধিক উৎপাদনশীল। এ মাছের গায়ের রঙ লালচে হওয়ায় দেখতে খুবই আকর্ষণীয় ও অন্তঃপ্রজনন সমস্যামুক্ত।

জাত উন্নয়নের কৌশল প্রক্রিয়া সম্পর্কে গবেষকরা জানান,  হালদা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের উৎস থেকে সংগৃহীত স্থানীয় জাতের রুই মাছের মধ্যে দ্বৈত অ্যালিল ক্রসিং করে ৯টি গ্রুপ থেকে প্রথমে বেজ পপুলেশন তৈরি করা হয়। এরপর বেজ পপুলেশন থেকে সিলেকটিভ ব্রিডিং করে ২০০৯ সালে রুইয়ের উন্নত জাতের প্রথম প্রজন্মের মাছ উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা বেজ পপুলেশন থেকে সাত দশমিক পাঁচ শতাংশ অধিক উৎপাদনশীল। পরবর্তীতে  সিলেকটিভ ব্রিডিং করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের যথাক্রমে ১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ ও ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ অধিক উৎপাদনশীলজাত উদ্ভাবন করা হয়। পরে ২০২০ সালে উন্নত জাতের চতুর্থ প্রজন্মের নতুন জাত তৈরি করা সম্ভব হয়েছে, যা স্থানীয় জাতের চেয়ে ২০ দশমিক ১২ শতাংশ অধিক উৎপাদনশীল।

গবেষণাকালে ডিএনএ মার্কার ব্যবহার করে চতুর্থ প্রজন্মের জাতের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নতুন এই জাতের কৌলিতাত্ত্বিক ভিন্নতা রয়েছে অর্থাৎ চড়ষুসড়ৎঢ়যরপ লোকাস ও জিন ডাইভার্সিটি স্থানীয় জাত অপেক্ষা বেশি। এতে প্রমাণিত হয়, চতুর্থ প্রজন্মের জাতের কৌলিতাত্ত্বিক অবদান স্থানীয় জাত অপেক্ষা বেশি, যা প্রজাতির বিশুদ্ধতা বজায় রাখার পাশাপাশি মৎস্য উৎপাদন বাখাতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। চতুর্থ প্রজন্মের সুবর্ণ রুই, নদীর উৎস থেকে প্রাপ্ত রুই ও হ্যাচারিতে উৎপাদিত পোনা থেকে রুই মাছের কৌলিতাত্ত্বিক ভিন্নতা রয়েছে যথাক্রমে লোকাস ৭১ দশমিক ৪৩ শতাংশ, ৬৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ ও ৫৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। অধিক উৎপাদনশীল ও অন্তঃপ্রজনন সমস্যামুক্ত ‘সুবর্ণ রুই’ স্বাদুপানি ও আধা-লবণাক্ত পানির পুকুর, বিল, বাঁওড় ও হাওরে চাষ করা যাবে। এতে সামগ্রিকভাবে দেশে প্রায় ৮০ হাজার কেজি মাছ বেশি উৎপাদিত হবে। এর বর্তমান বাজারদর দুই কোটি ৪০ লাখ টাকা দাঁড়াবে। তাছাড়া উন্নত এ জাতের রেণু পোনা হ্যাচারি থেকে সংগ্রহ করে নার্সারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেকে লাভবান হবেন।

ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ আরও জানান, ‘সুবর্ণ রুই’ মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রথমে এর জার্মপ্লাজম (রেণু/পোনা) বিতরণ করা হবে। এ লক্ষ্যে ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে মৎস্য অধিদপ্তর ও বেসরকারি পর্যায়ের নির্বাচিত ২০টি হ্যাচারিতে এর জার্মপ্লাজম আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে। হ্যাচারিতে এসব রেণু/পোনা লালন-পালন করে ‘ব্রুড মাছ’ তৈরি করা হবে এবং পোনা উৎপাদনে ব্যবহার করা হবে। উৎপাদিত পোনা-পরবর্তী সময়ে চাষাবাদের জন্য ব্যবহৃত হবে। ফলে দেশে মাছের সামগ্রিক ফলন বাড়বে।

‘সুবর্ণ রুই’ এর পোনা সরাসরি ইনস্টিটিউট থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকার ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিবন্ধীর পুকুরে বিনা খরচে সরবরাহ করা হবে। তাদের পুকুরের উৎপাদন দেখে অন্যরাও এ মাছ চাষে আগ্রহী হবেন। মাছটি দ্রুত মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারিত হবে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..