প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিকাশমান অর্থনীতিতে পিছিয়ে পড়াদের আয়-উন্নতির চেষ্টা

শান্তিতে নোবেল বিজয়ী বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস কথাটা বলেছিলেন অনেক আগে। বলেছিলেন, কর্মসংস্থান মানেই দারিদ্র্য থেকে মুক্তি নয়। কর্মসংস্থান দারিদ্র্যকে স্থায়ী করেও ফেলতে পারে। তিনি বোধহয় এ কথাটি বলতে চেয়েছিলেন যে, কাজ করে যে আয় মানুষ করে, সেটার একটা গুণগত বৃদ্ধি হতে হবে। ‘ইনক্রিমেন্টাল ইনকাম গ্রোথ’ বলে একটা কথা আছে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতে বছরশেষে সবারই বেতনে একটা বৃদ্ধি হয়ে থাকে। সেটা করা হয় প্রধানত মূল্যস্ফীতির কারণে কারও প্রকৃত আয় যেন কমে না যায়, সেটি নিশ্চিত করতে। বাংলাদেশে অবশ্য অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত এখনও অনেক বড়। সেখানে নিয়মনীতির বালাই তেমন নেই। তবে সেখানেও আয় বা মজুরি বৃদ্ধির একটা প্রবণতা রয়েছে। ওটা প্রকৃতপক্ষে নির্ধারণ করছে শ্রমের চাহিদা ও সরবরাহের দ্বন্দ্ব। যা হোক, কথা হচ্ছিল ইনক্রিমেন্টাল ইনকাম গ্রোথ নিয়ে। ওটা দিয়ে আসলে প্রকৃত আয় বাড়ে না কারও। প্রকৃত আয় আবার মাপা হয় ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে। এটা স্থির থাকা অবস্থায়ও ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যেতে পারে, যদি নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম এবং প্রতিদিনের অন্যান্য ব্যয় কমে যায়। কিছু পণ্য ও সেবার দাম যে কমে না, তা তো নয়। তবে বৃদ্ধির প্রবণতাই স্বাভাবিক। সে ক্ষেত্রে কম হারে দাম বাড়লেই মানুষ বর্তে যায়। আর লোকে খুুুশি হয়, যদি তার বেতন বা মজুরি প্রকৃতপক্ষেই বাড়ে। পদোন্নতি হলে স্বভাবতই বেড়ে যায় প্রাপ্তি। এটাকে তাই সেলিব্রেটও করা হয়। অপেক্ষাকৃত ভালো বেতন বা মজুরির আশায় প্রতিষ্ঠান, খাত, এমনকি পেশাও বদল করে থাকে মানুষ। উন্নত পুঁজিবাদী দেশে এ প্রবণতা বেশি। সেজন্য ওইসব দেশে কর্মমুখী শিক্ষা আর প্রশিক্ষণে জোর দেওয়া হয়। বেশি বয়সেও অনেকে উন্নততর জীবনের আশায় এদিকে ঝোঁকে।

এটা ঠিক যে, কর্মসংস্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের এক ধরনের অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটে। সে আয় করে নিজেকে চালায়, অন্যেরও দায়িত্ব নিতে পারে। অন্যকে খাইয়ে-পরিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু নয়, শিক্ষা এবং তাকে নতুন সময়ের উপযোগী কর্মী হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বও সে নিতে পারে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টির ওপরই অবশ্য বেশি জোর দেওয়া হয়ে থাকে। মনে করা হয়, সে আয় এবং অব্যাহতভাবে উন্নতি করতে পারলে গোটা পরিবার উপকৃত হবে। কিন্তু অবস্থা ও মানসিকতা বদলাচ্ছে। এখন নারীর কর্মসংস্থানের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে এ বিচার থেকে যে, দেখা গেছে সাধারণভাবে অর্থসম্পদ ব্যবহারে সে অন্যের দিকে খেয়াল করে বেশি এবং দীর্ঘ মেয়াদে তার আয়ের বেশি প্রভাব পড়ে পরিবারে। নারীকে শুধু শিক্ষিত করে গড়ে তোলা গেলে এবং সে অর্থকরি কোনো কাজে জড়িত না হলেও তার সুপ্রভাব পড়ে সন্তানের ওপর। নারীশিক্ষায় পরিবার ও রাষ্ট্রের বিনিয়োগ তাই কখনও ব্যর্থ হয় না। পরিবর্তিত সময়ে সংসারে কর্মজীবী নারীর চাহিদাও ক্রমবর্ধমান। তৈরি পোশাক শিল্পের মতো কোনো কোনো দ্রুত বিকাশমান খাত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোজগারের মনোভাবও বাড়িয়ে তুলেছে। তাদের পেশা পরিবর্তনকে করে তুলেছে অনিবার্য। ব্যাংক, বিমা, টেলিকমসহ সেবা খাত আবার আকর্ষণ করছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীকে। এসব খাতে নারী-পুরুষের আয়ের অসমতাও কম, যদিও উন্নতির সুযোগে বহুমাত্রিক সমস্যা রয়েই গেছে।

অর্থনৈতিক মুক্তির আশায় মানুষকে আত্মকর্মসংস্থানেও ঝাঁপিয়ে পড়তে দেখা যায়। এটাকে সরকারের দিক থেকে উৎসাহিতও করা হচ্ছে। নিজে একটা কিছু করে অন্যের কাজেরও সুযোগ তৈরি করছে অনেকে। এজন্য নিজের সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে ধারকর্জ করে বা ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করছে ঋণ অনেকে। বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোও অনেক ক্ষেত্রে সহায়তা জুগিয়ে আসছে। জামানতবিহীন ঋণের ধারণাও তৈরি হয়েছে দেশে। তার সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে তর্ক আছে। তবে প্রচেষ্টাটিকে সাধুবাদ দিতে হবে। ‘এসএমই’ বলতে আমরা যা বুঝে থাকি, সেখানে আত্মকর্মসংস্থানের বহু প্রয়াস দেখতে পাবো। তাতে সাফল্য কম নেই। আমাদের কৃষি খাতেও ছোট ও মাঝারি উদ্যোগগুলো বেশি সুফল দিচ্ছে নাকি প্রধানত পরিচর্যার কারণে। বৃহৎ উদ্যোগ বা ব্যবসায় দরকার হয় দক্ষ ম্যানেজারির। মূল উদ্যোক্তারা সেখানে দৃশ্যপটে সেভাবে থাকেন না। আমাদের পোশাক শিল্পেও ‘মিড লেভেল ম্যানেজমেন্ট’ একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ব্যবসা সফল করার ক্ষেত্রে। এ কাজেও কম কর্মসংস্থান হচ্ছে না। তাদের সিংহভাগ অবশ্য পুরুষ। এখানে নারীর ব্যাপক অন্তর্ভুক্তি বড় গুণগত বদল আনবে হয়তো। যা হোক, কথা হচ্ছিল আত্মকর্মসংস্থান নিয়ে। এই যে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশের বাইরে যাচ্ছে বৈধ-অবৈধ সমস্ত উপায়ে, অনেক ক্ষেত্রে সহায়-সম্বল বিক্রি বা বেশি সুদে ঋণ করে, সেটাও আত্মকর্মসংস্থানের প্রয়াস বলে বিবেচিত হতে পারে। সরকার চাইলে অনেক আগেই এক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয়টা যুক্তিসঙ্গত করতে পারতো। এ খাতে প্রতিষ্ঠা করতে পারতো শৃঙ্খলা। তাহলে এর সুফল বেশি করে মিলতো দরিদ্র ও স্বল্পবিত্ত জনগোষ্ঠীতে। সামাজিক শ্রেণি উত্তরণে সহায়তা পেতো তারা।

কিছু খাত এদেশে দ্রুততার সঙ্গে এগোচ্ছে। এটা ভালো যে, তার মধ্যে রয়েছে রফতানিমুখী খাত। মাঝে পাটে আমরা মার খেয়েছি তো কী হয়েছে; সেটা বিপুলভাবে পুষিয়ে দিয়েছে তৈরি পোশাক খাতে বড় অগ্রগতি। একে ঘিরে আবার বিস্তার ঘটেছে কত না ব্যবসার! বিপুল জনগোষ্ঠীর এ দেশে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের দ্রুত বিকাশ একদিকে যেমন জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করবে, তেমনি বহু মানুষকে তা একযোগে কাজ দিতে সক্ষম। এটা তাদের যুক্ত করে দিতে পারে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে। এতে অবশ্য অনিশ্চয়তা রয়েছে। ওই বাজারে চাহিদার উত্থান-পতনের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে পড়ে এখানে কর্মরতরা। কৃষিতেও অনিশ্চয়তা কম নেই। নিজে উৎপাদন করে নিজে খাওয়া বা স্বনির্ভর কৃষক এখন নেই বললেই চলে। তারাও প্রায় সবাই সম্পর্কিত হয়ে পড়েছে ক্রমবর্ধমান দেশীয় বাজারের সঙ্গে। কিছু কৃষিপণ্য তো রফতানিও হয়ে থাকে। এ প্রবণতা বাড়বে বৈ কমবে না। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণও দেশে বাড়বে। সেখানেও রয়েছে চাহিদার উত্থান-পতন। আর কৃষিতে তো রয়েছেই অস্থিতিশীল আবহাওয়ার প্রভাব। বছরজুড়ে কর্মসংস্থানের সুযোগও এখানে অনুপস্থিত। সে কারণে ওই খাত থেকে শ্রমের একটা সচলতা থেকেই যায় শহর-বন্দরের কিছু পেশায়। স্থায়ীভাবে দক্ষ শ্রমিক ম্যানুফ্যাকচারিং আর সেবা খাতগুলোয় স্থানান্তরের একটা প্রবণতাও রয়েছে। দক্ষ শ্রমশক্তি আমরা হারাচ্ছি তাদের বিদেশযাত্রার কারণেও। বিভিন্ন দেশের দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে এরাই আবার অদক্ষ বা আধাদক্ষ বলে বিবেচিত হচ্ছে। কর্মমুখী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতার উন্নয়ন তাই বড় একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এটা মোকাবিলা করা না গেলে আমাদের কৃষি খাতেও উৎপাদনশীলতার উন্নয়ন থমকে দাঁড়াবে।

প্রথাগত কৃষির পাশাপাশি কিছু খাত বা উপখাতে আমরা ভালো করছি। যেমনÑসবজি ও মাছচাষ, এমনকি পোলট্রি ও গোসম্পদ উন্নয়ন। ধান-চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর এ ধারা অব্যাহত রাখতে পারছি, এটা আশার কথা। বেসরকারি খাতেই কিন্তু এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এখানে ব্যাপকভাবে রয়েছে আত্মকর্মসংস্থানের প্রয়াস আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বলিষ্ঠ ভূমিকা। আমাদের লক্ষ্মীমন্ত নারীর নিবিড় শ্রম আর সেবাপ্রয়াসও এক্ষেত্রে দেখতে পাবো। অবশ্য এর যথাযথ মূল্যায়নে সক্ষমতা অর্জন করতে বোধকরি আরও সময় লেগে যাবে। সম্পদ ও সম্পর্কে নারীর মালিকানা, অংশীদারত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বাড়ার সঙ্গে তার কাজের মূল্যায়নের সম্পর্ক রয়েছে। রয়েছে এটা বুঝে ওঠার ব্যাপারও। অপ্রাতিষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক যেসব খাতে সে নিয়োজিত, সেখান থেকে অর্জিত আয়ে তার কর্তৃত্বের প্রশ্নও জড়িত রয়েছে নারীর মূল্যায়ন আর ক্ষমতায়নে। আমাদের দেশেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যন্ত্র আর প্রযুক্তির প্রয়োগ তার সমান অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে চলেছে অবশ্য। সমান মজুরি লাভ, অন্তত অর্থনৈতিক সমানাধিকারের প্রশ্ন তাই আশা করা যায় জোরালো হবে।

বিজয়ের এ মাসে পেছনে তাকিয়ে নিশ্চয়ই আমরা দেখতে চাইবো, কী ছিল স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পেছনে আমাদের প্রেরণা। এটা যে শুধু রাজনৈতিক স্বাধিকার অর্জনের প্রশ্ন ছিল, তা নয়। অর্থনৈতিক মুক্তি তথা একটি বিকাশমান অর্থনীতির আয়-উন্নতিতে ক্রমে আরও ভালো অবস্থানে যাওয়ার স্বপ্নও ছিল আমাদের। কৃষি ও গ্রামভিত্তিক দরিদ্র আর স্বল্পবিত্ত একটি জনগোষ্ঠী বিশ্বের কাছে তার এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন-সম্ভাবনাই তুলে ধরেছিল একাত্তরে। স্বাধীনতা অর্জনে তার দৃঢ় একাত্মতা অর্জনেরও এটা ছিল কারণ। সে স্বপ্ন একেবারে ব্যর্থ হয়নি। কৃষিনির্ভরতা ও নিম্ন প্রবৃদ্ধি থেকে শিল্প আর সেবা খাতনির্ভর একটি মাঝারি প্রবৃদ্ধির অর্থনীতিতে ইতোমধ্যেই পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। আর এর মধ্যে কাজের সুযোগ ও শ্রমের এক ভিন্নতর সচলতা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাতে দারিদ্র্য পরিস্থিতির একটা উন্নতিও লক্ষণীয়। অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে সে প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যেতো সন্দেুহ নেই। এখানেই আছে রাষ্ট্র তথা সরকারের ভূমিকার প্রশ্ন। তার কাজ ব্যবসায়িক কাজে অংশগ্রহণ একেবারে কমিয়ে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে এসে বেসরকারি খাতের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা। তাতে সম্পদের বণ্টন ও পুনর্বণ্টনে কিছুটা হলেও ন্যায়নীতির প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব। এটাও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল, যা সংবিধানে হয়েছিল স্বীকৃত।