সম্পাদকীয়

বিকাশ নয়, বিকাশে হুন্ডি বন্ধ করুন

গতকালের শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘বিকাশে অর্থ উত্তোলন বন্ধের দাবি ব্যাংকারদের : কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অসম্মতি’ শীর্ষক খবরটি এরই মধ্যে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকবে। প্রতিবেদনটির ভিত্তি রোববার দেশের শীর্ষ ২০ রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈঠকে উত্থাপিত একটি প্রস্তাব। সচেতন পাঠকরা খেয়াল করে থাকবেন, সম্প্রতি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে আমাদের রেমিট্যান্স আহরণ। স্থানীয় অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সের অবদানের কথা নতুন করে বলার কিছু নেই। এ কথা ঠিক, এর দৃশ্যমান ভূমিকা খানিকটা হ্রাস পেয়েছে সম্ভবত বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম দীর্ঘদিন ধরে কম থাকায়; যেহেতু আগে রেমিট্যান্স থেকে অর্জিত আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হতো জ্বালানি ক্রয়ে। যা হোক, বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা পালনকারী এই রেমিট্যান্স সম্প্রতি লক্ষণীয়ভাবে কমলো কেন তার ব্যাখ্যায় একেকজন বলছেন একেক কথা। কারও কারও মতে, সমস্যাগ্রস্ত মধ্যপ্রাচ্যে আশানুরূপভাবে জনশক্তি রফতানি না হওয়া এবং বিকল্প বাজার এখনও চিহ্নিত করা সম্ভব না হওয়াতেই কমেছে রেমিট্যান্স। কেউ কেউ বলছেন, ওই পরিস্থিতিতেও আমাদের পক্ষে রেমিট্যান্স আয়ে বলিষ্ঠতা অব্যাহত রাখা যেত, যদি অদক্ষ ও অর্ধ-দক্ষের পরিবর্তে দক্ষ শ্রমিক বেশি পাঠাতে পারতাম আমরা। এক্ষেত্রে একশ্রেণির ব্যাংকারের যুক্তি হলো, বিকাশের মতো সেবার সুযোগ নিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ প্রেরণের ঘটনা বাড়ছে বলেই কমেছে রেমিট্যান্স। এখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বায়ন তথা অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না, সেটি এখনও অজানা অবশ্য। তবু বলা যেতে পারে, উল্লিখিত কোনো কারণই রেমিট্যান্স হ্রাসের একমাত্র কারণ নয়; বরং সেগুলোর প্রতিটি আংশিক কারণ হতে পারে।
বিধিবহির্ভূত হুন্ডি ব্যবহারপূর্বক দেশে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স প্রবাহের খবর যেমন নতুন নয়, তেমনি নতুন নয় হুন্ডির বেলায় বিকাশ নামক আর্থিক সেবা ব্যবহারের অভিযোগও। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিন্তু হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন প্রতিরোধে সচেষ্ট ছিল শুরু থেকেই। পরবর্তী সময়ে হুন্ডির সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের কয়েকটি যোগসূত্র উম্মোচিত হওয়ার পর এর প্রতি নজরদারি বাড়ে আরও। তবে সেটি কখনওই পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি। কিংবা ঘুরিয়ে বলা যায়, ব্যাংকগুলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে এমন কোনো বিকল্প তুলে ধরতে পারেনি, যাতে করে তারা হুন্ডি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন। লক্ষ করা দরকার, ব্যাংকের এ সীমাবদ্ধতাগুলো যখন প্রস্ফুটিত হচ্ছে, তখনই দেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। এর বয়স বেশি নয়; আবার লেনদেনের ব্যয়ও প্রতিযোগিতামূলক তথা নেহাত সস্তা নয়। তারপরও ব্যবস্থাটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ব্যাপকভাবে। উপরন্তু অস্বীকার করা যাবে না, একশ্রেণির গ্রাহক সেবাটি ব্যবহার শুরু করে হুন্ডি লেনদেনের কাজে। এমন বিধিবহির্ভূত লেনদেন অবশ্যই বন্ধ করা দরকার; তবে কাজটি বিকাশ নামক এম-বিজনেসের টুঁটি চেপে ধরে নয়। এরই মধ্যে প্রতিবার লেনদেনে সর্বোচ্চ অর্থের পরিমাণ কমিয়ে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এদিকে একশ্রেণির ব্যাংক নাকি চাইছে বিকাশের কিছু সেবা একেবারে বিনা মূল্যে দিতে। তাতে কতটা কাজ হয়, সেটি দেখার বিষয়। আসলে এখানে প্রধানত প্রয়োজন, বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রবাসীদের প্রণোদিত করা। তাদের দেশপ্রেম কিংবা সচেতনতাবোধ নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো সুযোগ নেই। সুলভে ও সহজে রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ পেলে তারা হুন্ডিমুখো হবেন না বলেই আমাদের বিশ্বাস। ফলে ব্যাংকগুলোর উচিত ব্যবস্থাটি সহজীকরণের ওপর দৃষ্টিপাত করা। তার বদলে কেবল বিকাশ ক্যাশ আউট বন্ধকেই হুন্ডি সমস্যার অব্যর্থ টোটকা হিসেবে মেনে নেওয়া কঠিন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..