প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিক্ষোভের মুখে ভেনিজুয়েলায় নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত 

 

শেয়ার বিজ ডেস্ক: দেশব্যাপী ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত আগামী ২ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত করেছেন। খবর রয়টার্স, বিবিসি।

ভেনিজুয়েলা সরকার সম্প্রতি ১০০ বলিভার নোট বাতিল করে, যা চার মার্কিন সেন্টের সমান। দেশটির মোট নগদ অর্থের ৭৭ শতাংশই ছিল এই নোট। এরপর দেশটির বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা, লুটপাট ও সহিংসতা শুরু হয়। বিক্ষোভ চরম পর্যায়ে পৌঁছলে স্থানীয় সময় গত শনিবার সরকার নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়।

যদিও দেশটির প্রেসিডেন্ট মাদুরো এ বিক্ষোভের জন্য বিরোধী রাজনীতিকদের দায়ী করেন। তিনি বলেন, ছবি ও ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে লুটপাট ও সহিংসতায় বিরোধীদলীয় রাজনীতিকরা জড়িত।

মাদুরো জানান, দাঙ্গাকারীরা কলম্বিয়া সীমান্তের কাছের গুয়াসদালিতো শহরে রাষ্ট্রায়ত্ত দুটি ব্যাংকে আগুন দিয়েছে। মাদুরোর দাবি, এ ঘটনায় নিষিদ্ধ মাফিয়ার সঙ্গে বিরোধী রাজনীতিকরা জড়িত। তাদের পাকড়াও করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কারাবন্দি করা হবে।

ভেনিজুয়েলা সরকার ব্যাংক নোট বাতিল করায় দেশটিতে নগদ অর্থের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। আগেই অর্থনৈতিক সংকটে পর্যুদস্ত দেশটিতে নতুন এই সংকট যোগ হওয়ায় লোকজন মালবাহী ট্রাক লুট করছে এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে।

ভেনিজুয়েলার মূল্যস্ফীতি বিশ্বে সর্বাধিক। দেশটির অর্থ এখন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার আগের নোটের চেয়ে দুইশগুণ বেশি মূল্যমানের অর্থ বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করছে। তবে নতুন নোট বাজারে আসার আগেই পুরনো ১০০ বলিভার নোট বাতিল করায় সরকারের পরিকল্পনা কার্যত ভেস্তে যেতে বসেছে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলার মুদ্রা বলিভার রেকর্ডমূল্য হারিয়েছে। মুদ্রার দরপতনের পর দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ৫০০ ও ২০০০ বলিভারের নোট ছাড়ে। কিন্তু দেশটিতে চলমান খাবার সংকটে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। খাবার নিয়ে লুটতরাজ আর হানাহানি সেখানে নিত্য ঘটনা।

এ পরিস্থিতিতে খাদ্য পাচার বন্ধ ও খাবার সংকট নিয়ন্ত্রণের আশা নিয়ে ১০০ বলিভার নোট বদলে কয়েন করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর জন্য সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো বলছেন, নোট বদলের সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর হলে পাচারকারীরা অর্থ বদলানোর সুযোগ পাবে না। পাচারকারীদের কাছে ১০০ বলিভার নোট থাকলে অচল নোট নিয়ে তাদের ঘুরতে হবে।

এ নিয়ে সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মারাকাইবোতে বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল মেরেছে বলে জানা গেছে। পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাতুরিনে বহু লোক সড়ক অবরোধ করে লুটপাট চালায়। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে কয়েকশ জনকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একজন নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ারও খবর পাওয়া গেছে।

স্থানীয় কৃষক জুয়াল কার্লোস লিয়াল বলেন, বাজারে গিয়ে দেখি সামরিক বাহিনী সেটি ঘিরে রেখেছে। মুরগির একটি ট্রাক লুট হয়ে গেছে। পূর্বাঞ্চলীয় পুয়ের্তো লা ক্রুজ শহরে লোকজন ব্যাংকে এসে টাকা তুলতে চাইলে তারা তা পাননি। এ অবস্থায় সেখানে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে বলে স্থানীয় দোকানদার জেনেসিস জানান। তিনি বলেন, পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়ে দাঙ্গা দমনের চেষ্টা করে। লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে পুলিশ সব দোকান বন্ধ করার নির্দেশ দেয়।

টুইটারে ভেনিজুয়েলার বহু রাজ্যে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। রাজধানী কারাকাসের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সামনে ১০০ বলিভার নোট বদলের জন্য লোকজনকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে দেখা গেছে। কিন্তু এসে তারা দেখতে পায়, তারা নতুন নোট পাবে না; শুধু পুরোনো নোট বাতিল করার বিশেষ ভাউচার পাবে। ২১ বছর বয়সী খাদ্য বিক্রেতা জেসাস গার্সিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছিলেন, ‘দুনিয়াটা যেন উল্টে গেছে। স্বাভাবিকভাবে এখানে কোনো খাবার নেই। খাবার কেনার পয়সাও নেই।’ তেলের দাম ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় সরকার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন মাদুরো। আমদানিনির্ভর দেশটিতে খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আইএমএফ বলছে, ভেনিজুয়েলায় এবার মূল্যস্ফীতি ৪৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এতে মাদুরোর জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে। সংকটের জন্য তিনি বিরোধীদের দায়ী করেছেন। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে কলম্বিয়া ও ব্রাজিল সীমান্ত। এই দুটি দেশ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহ করতেন বহু ভেনিজুয়েলান। সীমান্ত পার হয়ে আসা কার্মেন রদ্রিগুয়েজ বলেন, আমরা কষ্ট পাচ্ছি। আমরা ক্ষুধার্ত। আমাদের ওষুধ নেই। আমাদের কিছু নেই, কিছুই নেই। এখন আবার অর্থের সমস্যা। এমনকি আমরা খাবারটুকুও কিনতে পারছি না।