প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিচক্ষণ নীতিই হোক জ্বালানি নিরাপত্তায় পথপ্রদর্শক

গত মঙ্গলবার রাজধানীতে ইউনাইটেড ন্যাশনস কনফারেন্স অন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আঙ্কটাড) ‘এলডিসি ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি স্থানীয়ভাবে প্রকাশ করে বেসরকারি থিংক ট্যাংক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সেখানে আলোচ্য প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু ঘিরে ও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে যেসব কথাবার্তা হয়েছে, তার কোনোটাই উপেক্ষণীয় নয়। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেছেন, ‘নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্যতা এখনও একটি বড় সমস্যা। এক সমীক্ষায় দেশের ৫৩ শতাংশ কোম্পানি মালিক বলেছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্যতাই তাদের প্রধান সমস্যা। এশিয়ার আরেকটি এলডিসিভুক্ত দেশ কম্বোডিয়ায় এ হার মাত্র ছয় শতাংশ।’ বলার অপেক্ষা রাখে না, এটি আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদেরও প্রাণের দাবি। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মত দিয়েছেন, জ্বালানি খাতের উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে এবং একই সঙ্গে দরকার পড়বে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা। এর সঙ্গে দ্বিমত করা কঠিন। ওই অনুষ্ঠানে সিপিডি যেসব কথাবার্তা বলেছে, বাহ্যত সমালোচনা মনে হলেও সেগুলো আসলে গঠনমূলক আলোচনা। আঙ্কটাডের রিপোর্টটি তৈরি হয়েছিল বেশ ক’বছর আগের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে। সিপিডি কিন্তু বলছে, এই ক’বছরে দেশে বিদ্যুৎ খাতে বেশ উন্নতি হয়েছে। অনেকে অবশ্য মনে করেন, এসব ক্ষেত্রে সরকার যেহেতু সরাসরি একটা পক্ষ, সেহেতু নিরপেক্ষতার খাতিরে তাদের মন্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পরিবেশনের সুযোগ দেওয়া উচিত। তাতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলোর দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্তে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

অনুষ্ঠানে সিপিডির বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ২০৩০ সালে এসডিজি (টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা) অর্জন ও ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নয়নের কাক্সিক্ষত স্তরে উন্নীত করতে চাইলে জ্বালানি খাতের তিন বিষয়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে: এক. অর্থনৈতিক রূপান্তর, দুই. অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থা ও তিন. পরিবেশগত ভারসাম্য। অর্থাৎ আমাদের জ্বালানি উৎপাদন হতে হবে সুলভ মূল্যে, সুশাসনের সঙ্গে ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যে পিছিয়ে রয়েছে, তা স্পষ্ট। অবশ্যই স্বীকার্য, গত প্রায় এক দশকে জ্বালানি ব্যবহারের দিক দিয়ে ব্যাপকভাবে এগিয়েছে বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে বড় অবদান ছিল সরকারের। তা সত্ত্বেও অর্জনগুলো এখনও যে সেভাবে চোখে পড়ে না, তার কারণ এ খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। সেজন্যই সম্ভবত জ্বালানি কাঠামোর গুণগত মানোন্নয়নে খুব একটা নজর দিতে পারছে না তারা। দেশে বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদা এমনিতেই কম নয়; উপরন্তু তা বোধকরি গাণিতিক হারে বাড়ছে। উন্নয়ন জোরদার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটা স্থিতিশীলভাবে বাড়বে বলেই ধারণা। তবে সরকার বিদ্যুৎ তথা জ্বালানি উৎপাদন ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলতে সক্ষম হলেও পুঞ্জীভূত ও নতুন চাহিদার যোগফলের কারণে জোগান দিতে পারছে না সেভাবে। তদুপরি স্বভাবতই বাড়ছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ। প্রশ্ন হলো, তাহলে সরকারের করণীয় কী? সরকার কি বিদ্যমান চাহিদা মেটানোর জন্যই সচেষ্ট থাকবে? নাকি উৎপাদন না বাড়িয়ে বিতরণ সম্প্রসারণে দৃষ্টি দেবে? আবার উভয় ক্ষেত্রেই পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার সমন্বয় কি সম্ভব আদৌ? নিঃসন্দেহে এ এক সুকঠিন চ্যালেঞ্জ। তারপরও আমরা মনে করি, এক্ষেত্রে উৎপাদন, বিতরণ বা পরিবেশ কোনো ইস্যুতেই ছাড় দেওয়া যাবে না, বিশেষত টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে। দায়িত্বটি একা একা পালনও সম্ভব নয়, যতক্ষণ না সরকার, বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীরা পরস্পরের যথেষ্ট সহায়ক হচ্ছে এবং বিচক্ষণ নীতির কার্যকর প্রতিফলন ঘটছে এ খাতে।