বিজয়কেতন

কাজী সালমা সুলতানা: ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধ এক ভিন্ন মাত্রা পেতে শুরু করে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পর্যুদস্ত হতে থাকে দখলদার পাকিস্তানি হানাদাররা। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল মুক্ত হতে থাকে। বিজয়ের এই বার্তা যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের করে তোলে আরও দুর্বার ও অপ্রতিরোধ্য। এদিন দেবীদ্বার, ফুলবাড়ী, ফুলছড়ি, লক্ষ্মীপুর, কমলগঞ্জ ও কামালপুর এলাকা পাকিস্তানের দখলমুক্ত হয়। এর মধ্য দিয়ে সূচিত হয় শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ ঢাকা বিজয়ের পথ।

এই দিন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এক জরুরি লিপিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে জানান, পাকিস্তানের সর্বশেষ আক্রমণের সমুচিত জবাব দিতে ভারতীয় বাহিনী এবং বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর মিলিত ভূমিকা সফল হতে এই দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা দরকার। ভারত ও বাংলাদেশের স্থলবাহিনীর মিলিত প্রত্যাঘাত, ভারতীয় বিমানবাহিনীর আক্রমণ ও নৌবাহিনীর অবরোধের মাধ্যমে পূর্বাঞ্চলের যুদ্ধের চরিত্র আমূল পরিবর্তিত হয়। পূর্ববর্তী সাত সপ্তাহ ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের নিরবচ্ছিন্ন তৎপরতা এবং ভারত ও  বাংলাদেশের মিলিত বাহিনীর তীব্রতর সীমান্তচাপের ফলে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু হয়। অবশ্য এর আগেই পাকিস্তানি বাহিনী অতর্কিত গোপন আক্রমণের ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। মুক্তিবাহিনীর আট মাস দীর্ঘ সংগ্রামকে চূড়ান্তভাবে জয়যুক্ত করার লক্ষ্যে একাত্তরের এই দিন থেকে ভারতীয় স্থলবাহিনী চারদিক থেকে অভিযান শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ভারতের বিমান ও নৌশক্তি। এর সঙ্গে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সদাতৎপর সহযোগিতা। এসব  শক্তির সংমিশ্রণ ও সহযোগিতা বাংলাদেশে পাকিস্তানি আধিপত্য স্বল্প সময়ের মধ্যে বিলোপ করার জন্য যথেষ্ট ছিল। বস্তুত যুদ্ধারম্ভের সঙ্গে সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত বাহিনীর বিজয় সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ কোনো মহলেরই ছিল না।

৪ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মিলিত যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে পশ্চিম সেক্টর থেকে পাকবাহিনীকে বিভ্রান্ত করার জন্য প্রত্যেক ঘাঁটিতে অবিরাম গোলাবর্ষণ চালানো হয়।

এদিন ভারতীয় বিমান ও নৌবাহিনীর জঙ্গি বিমানগুলো বারবার ঢাকা, চট্টগ্রাম, চালনা প্রভৃতি এলাকায় সামরিক ঘাঁটিগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়। ঢাকায় প্রচণ্ড বিমানযুদ্ধ চলে। পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন আগে ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে মিগ-১৯ বিমানগুলো পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথম রাতের আক্রমণেই পাকিস্তানের বিমানবহরের প্রায় অর্ধেক বিমান ধ্বংস হয়ে যায়।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এদিন দুপুরে জাতির উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে ভারতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে বলেন, আমরা অনেক সহ্য করেছি। এখন শত্রুর প্রতি চরম ধ্বংসাত্মক প্রত্যাঘাত হানার সময় এসেছে। তিনি সেনাবাহিনীর প্রতি প্রতিপক্ষকে চরম আঘাত হানা এবং সীমান্ত অতিক্রম করার নির্দেশ দেন।

এদিন রাওয়ালপিন্ডিতে এক সরকারি মুখপাত্র বলেন, পাকিস্তানের উভয় অংশে যুদ্ধ চলছে। পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় চাপ মোকাবিলা করা হচ্ছে। মুখপাত্র বলেন, পাকিস্তানের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেবে বলে চীন ওয়াদা করেছে।

এদিকে বাংলাদেশের রণাঙ্গনে বড় কোনো অগ্রগতি ঘটার আগেই ওয়াশিংটনে এক বৈঠকে কিসিঞ্জার নিরাপত্তা পরিষদে আহূত অধিবেশনে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি-সংবলিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব পেশ করার জন্য এমনই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, এ ব্যাপারে পাশ্চাত্য মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আলোচনার সময় তাদের ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর উচ্চতর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত বিবৃতিতে উপমহাদেশের সংঘাতের জন্য ভারতকে দায়ী করে। নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি জর্জ বুশ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ভারত ও পাকিস্তানের সৈন্য নিজ নিজ সীমান্তের ভেতরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ মহাসচিবকে ক্ষমতা প্রদান করার জন্য এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু এই প্রস্তাবে সমস্যার মূল কারণ তথা পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী কর্তৃক পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের ওপর দীর্ঘ নির্যাতন এবং তার ফলে সৃষ্ট শরণার্থীদের ভিড় ও সমস্যাজর্জড়িত ভারতের অবস্থা বিবেচনা না করে ভারত ও পাকিস্তানকে একই মানদণ্ডে বিচার করায় সোভিয়েত প্রতিনিধি এই প্রস্তাবকে একতরফা হিসেবে অভিহিত করে ভেটো প্রয়োগ করেন। পোল্যান্ডও এই প্রস্তাবের বিপরীতে ভোট দেয়। ফ্রান্স ও ব্রিটেন ভোটদানে বিরত থাকে।

পূর্বখণ্ডের প্রধান সেনাপতি লে জে অরোরা কলকাতায় বলেন, ভারতীয় সৈন্যদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনী এখন এক হয়ে গেল। কেননা এ যুদ্ধ বাংলাদেশের, যুদ্ধ আমাদের।

এদিন বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও মিত্রবাহিনী যৌথভাবে স্থল ও আকাশপথে আখাউড়া ও কশবা আক্রমণ করে। এ যুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর মতিন, ক্যাপ্টেন মুর্শিদ, লে ইব্রাহিম, লে বদিউজ্জামান, লে. সেলিম প্রমুখ কোম্পানি কমান্ডাররা অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধে লে. বদিউজ্জামান, সিপাহী রুহুল আমিন ও সিদ্দিকুর রহমানসহ বহু মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, মূলধারা ৭১ ও ৭১-এর দশ মাস

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯১২৩  জন  

সর্বশেষ..