দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বিজয় নিশান উড়ছে ঐ

কাজী সালমা সুলতানা: আজ ২ ডিসেম্বর। ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনীর সুসংগঠিত আক্রমণ মানুষের মাঝে বিজয়ের আভাস এনে দিয়েছিল। এই  আভাস আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি বাহিনীর মরিয়া তৎপরতায়। ‘জয় বাংলা’ সেøাগান বুকে ধারণ করে দেশের দামাল ছেলেদের কণ্ঠে তখন ছিল একটিই উচ্চারণ ‘স্বাধীনতা’। এদিকে ভারতের পশ্চিম সীমান্তবর্তী বিমানবন্দরগুলোয় আক্রমণ চালানো এবং পূর্ব-পাঞ্জাব, জম্মু ও কাশ্মীরে স্থল আক্রমণ চালানোর আগে ২ ডিসেম্বর পাকিস্তানি মার্কিন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির প্রথম ধারা অনুযায়ী ‘আক্রান্ত দেশ’ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ চায় পাকিস্তান। পাকিস্তান চাইছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সপ্তম নৌবহর নিয়ে এগিয়ে আসবে যুদ্ধে তাদের সহযোগিতা করতে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তখন পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না। এদিন মুক্তির সংগ্রামে উত্তাল ছিল বাংলার মাটি। গেরিলা যুদ্ধের পাশাপাশি সম্মুখ যুদ্ধেও মুক্তিবাহিনীর আক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর অপ্রতিরোধ্য বাঙালির বিজয়ের পথে পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে থাকে।

বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল লড়াইয়ে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটতে থাকে। আর অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনেক মুক্তাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। এদিকে পাকিস্তানি বাহিনী পঞ্চগড়ে রিংয়ের আকারে প্রথম ও দ্বিতীয় ডিফেন্স লাইন তৈরি করে। মুজিব ব্যাটারির যোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সহায়তায় গভীর রাতে পঞ্চগড় আক্রমণ করায় তারা পঞ্চগড় ছেড়ে চলে যায়।

এদিন মুক্তিবাহিনী ঘোড়াশালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবস্থানের ওপর চারদিক থেকে আক্রমণ করে ২৭ জন সৈন্যকে হত্যা করে। আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এলেও পাকিস্তানি বাহিনী তাদের বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে ওঠে মুক্তিবাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ করে। এই আক্রমণে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে আসতে বাধ্য হয়। মুক্তিবাহিনী পুনরায় তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে তিন দিক থেকে আক্রমণ করলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা উত্তরে ফটিকছড়ি ও রাউজান থানা এবং দক্ষিণে আনোয়ারার অধিকাংশ স্থান তাদের দখলে আনতে সক্ষম হয়। পরে মুক্তিবাহিনী পটিয়া থানা তাদের দখলে আনার জন্য মরণপণ যুদ্ধে লিপ্ত হয়।

মুক্তিবাহিনী বিড়িসিড়ির বিজয়পুরে পাকিস্তানি অবস্থানের ওপর অ্যামবুশ করে হানাদার বাহিনীর পাঁচজনকে হত্যা করে। এখান থেকে মুক্তিবাহিনী রাইফেলসহ ২১ জন রাজাকারকে ধরতে সক্ষম হয়।

ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী নয়াদিল্লিতে কংগ্রেস দলের এক কর্মিসভায় ভাষণদানকালে বলেন, সময় বদলে গেছে। তিন-চার হাজার মাইল দূর থেকে বর্ণের প্রাধান্য দিয়ে তাদের (পাকিস্তান) ইচ্ছামতো হুকুমনামা জানাবে, তা মেনে নেওয়া যায় না। ভারত আর নেটিভ রাজ্য নয়। আজ আমরা আমাদের জাতীয় স্বার্থের জন্য দেশের সর্বোচ্চ প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করব, ওই সব বৃহৎ দেশগুলোর ইচ্ছানুযায়ী নয়। তিনি বলেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশ ছেড়ে গেলেই লাখ লাখ বাঙালি স্বদেশে ফিরে গিয়ে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারবে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কমান্ডার মোছলেহ উদ্দিন ভালুকা থেকে একদল রাজাকার সঙ্গে নিয়ে কাঁঠালি গ্রামে লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করতে এলে মুক্তিবাহিনীর সেকশন কমান্ডার গিয়াসউদ্দিন এবং তিন নম্বর সেকশন কমান্ডার আবদুল ওয়াহেদের নেতৃত্বে পরিচালিত অতর্কিত আক্রমণে ৩ জন পাকিস্তানি হানাদার এবং ৭ জন রাজাকার নিহত হয়। এছাড়া এ আক্রমণে ৭ জন পাকিস্তানি সৈন্য আহত হয়। পরে পাকিস্তানি হানাদাররা মৃতদেহগুলো নিয়ে পালিয়ে যায়।

এদিকে আখাউড়া, পঞ্চগড়, ভুরুঙ্গামারী, কমলাপুর, বনতারা, শমশেরনগর ও পার্বত্য চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে প্রচণ্ড সংঘর্ষে হানাদার বাহিনী পিছু হটে যায়। এতে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন মেজর সদরউদ্দিন, ক্যান্টেন শাহরিয়ার, লেফটেন্যান্ট মাসুদ, লেফটেন্যান্ট মতিন, সুবেদার খালেক।

এদিকে এদিন বোমা বিস্ফোরণে ঢাকার রামপুরা বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র, চট্টগ্রামের পাঁচটি বিদ্যুৎ সাবস্টেশন ও দুটি পেট্রোল পাম্প বিধ্বস্ত হয়।

পাকিস্তান পিপলস পার্টি ও পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান শাখার নেতারা পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করতে অবিলম্বে পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্ত থেকে ভারত আক্রমণ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতি আবেদন জানায়। ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিবাহিনী ঘোড়াশালে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের ওপর চারদিক থেকে আক্রমণ করে ২৭ জন পাকিস্তানি হানাদারকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী।

তথ্যসূত্র :  বাঙালির জাতিরাষ্ট্র, মূলধারা ৭১ ও ৭১-এর ১০ মাস

তথ্যসূত্র: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..