Print Date & Time : 9 March 2021 Tuesday 6:09 am

বিদায় ফুটবল কিংবদন্তি ম্যারাডোনা

প্রকাশ: November 27, 2020 সময়- 12:23 am

মো. আরাফাত রহমান: আর্জেন্টিনীয় ফুটবল মহাতারকা দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনার মৃত্যু সংবাদ বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মনে বড় আঘাত হয়ে এসেছে। অনেক বিশেষজ্ঞ, ফুটবল সমালোচক, সাবেক ও বর্তমান খেলোয়াড় এবং ফুটবল সমর্থক তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে গণ্য করেন। তিনি ফিফার বিংশ শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় পেলের সঙ্গে যৌথভাবে ছিলেন। ম্যারাডোনাই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি দুবার স্থানান্তর ফি’র ক্ষেত্রে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। প্রথমবার বার্সেলোনায় স্থানান্তরের সময় পাঁচ মিলিয়ন ইউরো এবং দ্বিতীয়বার নাপোলিতে স্থানান্তরের সময় ছয় দশমিক ৯ মিলিয়ন ইউরো। নিজের পেশাদার ক্যারিয়ারে ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্স, বোকা জুনিয়র্স, বার্সেলোনা, নাপোলি, সেভিয়া ও নিওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলেছেন। ক্লাব পর্যায়ে তিনি তার নাপোলিতে কাটানো সময়ের জন্য বিখ্যাত। সেখানে তিনি অসংখ্য সম্মাননা জেতেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি ৯১ খেলায় ৩৪ গোল করেন।

তিনি চারটি ফিফা বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপ, যেখানে তিনি আর্জেন্টিনা দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন এবং দলকে বিশ্বকাপ জয়ে নেতৃত্ব দেন। প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড় হিসেবে স্বর্ণগোলক জেতেন তিনি। প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জয়লাভ করে। আর্জেন্টিনার পক্ষে উভয় গোলই করেন ম্যারাডোনা। দুটি গোলই ফুটবল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে দুটি ভিন্ন কারণে। প্রথম গোলটি ছিল হ্যান্ডবল, যা ‘হ্যান্ড অব গড’ নামে খ্যাত। দ্বিতীয় গোলটি ম্যারাডোনা প্রায় ৬০ মিটার দূর থেকে ড্রিবলিং করে পাঁচ ইংরেজ ডিফেন্ডারকে পাশ কাটিয়ে করেন। ২০০২ সালে ফিফাডটকমের ভোটাররা গোলটিকে শতাব্দীর সেরা গোল হিসাবে নির্বাচিত করেন।

দিয়েগো ম্যারাডোনা ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর বুয়েনোস আইরেস প্রদেশের লানুস শহরের পলিক্লিনিকো এভিতা হাসপাতালে একটি দরিদ্র পরিবারে জš§গ্রহণ করেন। তবে তিনি বেড়ে ওঠেন ভিয়া ফিওরিতোতে, যা বুয়েনোস আইরেসের দক্ষিণ প্রান্তের একটি শান্তিটাউন। তিন কন্যাসন্তানের পর তিনিই ছিলেন বাবা-মায়ের প্রথম পুত্রসন্তান। তার ছোট দুই ভাই ররেছে ও রাউল, যাদের উভয়েই পেশাদার ফুটবল খেলোয়াড়। ম্যারাডোনার বাবার নাম দিয়েগো ম্যারাডোনা সিনিয়র এবং মায়ের নাম দালমা সালভাদর ফ্রাঙ্কো। তার বাবা একজন আমেরিকান ও মা ক্রোয়েশিয়ান।

১০ বছর বয়সে যখন তিনি এস্ত্রেয়া রোজার হয়ে খেলছিলেন, তখন তাকে খুঁজে বের করেন এক স্কাউট। তিনি আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের যুবদল দ্য লিটল অনিয়নের একজন মূল খেলোয়াড়ে পরিণত হন। ১২ বছর বয়সে বল-বয় হিসেবে প্রথম বিভাগের খেলার অর্ধবিরতির সময় বল দিয়ে জাদুকরী কারুকার্য দেখিয়ে তিনি দর্শকদের সন্তুষ্ট করতেন। ১৯৭৬ সালের ২০ অক্টোবর নিজের ১৬তম জš§দিনের ১০ দিন আগে আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে ম্যারাডোনার অভিষেক হয়। সেখানে তিনি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছিলেন এবং ১৬৭ খেলায় ১১৫টি গোল করেন। এরপর তিনি এক মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বোকা জুনিয়র্সে পাড়ি জমান। ১৯৮১ মৌসুমের মাঝামাঝি সময় বোকায় যোগ দিয়ে ১৯৮২ সালে তিনি প্রথম লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতেন। ১৯৮২ বিশ্বকাপের পর পাঁচ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে বার্সেলোনায় যোগ দেন ম্যারাডোনা। ১৯৮৩ সালে কোচ সিজার লুইস মেনত্তির অধীনে বার্সেলোনা এবং ম্যারাডোনা রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে কোপা দেল রে এবং অ্যাথলেটিক বিলবাওকে হারিয়ে স্পেনীয় সুপার কাপ জেতেন। তবে বার্সায় ম্যারাডোনা কিছুটা খারাপ সময় কাটিয়েছেন। প্রথমে তাকে হেপাটাইটিসের সঙ্গে লড়তে হয়, এরপর তাকে পড়তে হয় গোড়ালির ইনজুরিতে। অবশ্য চিকিৎসা শেষে দ্রুতই মাঠে ফিরে আসেন ম্যারাডোনা।

বার্সেলোনায় ম্যারাডোনা ৫৮ খেলায় ৩৮টি গোল করেন। ১৯৮৪ সালে আরেকটি রেকর্ড স্থানান্তর ফি’তে সিরি এ ক্লাব নাপোলিতে যোগ দেন তিনি। নাপোলিতে ম্যারাডোনা তার পেশাদার ক্যারিয়ারের শিখরে পৌঁছান। তিনি খুব দ্রুত ক্লাবের সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন এবং সেই সময়টিই ছিল নাপোলির ইতিহাসের সফলতম যুগ। ম্যারাডোনার অধীনে নাপোলি ১৯৮৬-৮৭ ও ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে সিরি এ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে এবং ১৯৮৯-৮৮ ও ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে তারা রানার-আপ হয়। এছাড়া ম্যারাডোনার সময়ে নাপোলি একবার কোপা ইতালিয়া জেতে এবং একবার রানার-আপ হয় এবং ১৯৯০ সালে ইতালীয় সুপার কাপ জেতে। ১৯৮৭-৮৮ মৌসুমের সিরি এ’তে ম্যারাডোনা সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। পরবর্তী সময়ে নাপোলিতে থাকাকালে তার বিভিন্ন অর্জনের প্রতি সম্মান জানিয়ে নাপোলির ১০ নম্বর জার্সিটি দাপ্তরিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

১৯৯২ সালে ম্যারাডোনা নাপোলি ছেড়ে দেন। স্পেনীয় ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ এবং ফরাসি ক্লাব অলিম্পিকে মার্শেই তার প্রতি আগ্রহী হলেও তিনি স্পেনীয় ক্লাব সেভিয়াতে যোগ দেন। সেখানে তিনি এক বছর ছিলেন। ১৯৯৩ সালে তিনি লিওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে খেলেন এবং ১৯৯৫ সালে তিনি বোকা জুনিয়র্সে ফিরে আসেন এবং সেখানে দুই বছর খেলেন। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কিছু আগে ম্যারাডোনা টটেনহাম হটস্পারের হয়েও মাঠে নামেন ইন্টারন্যাজিওনালের বিপক্ষে। খেলায় টটেনহাম ২-১ গোলে জয়লাভ করে। তিনি গ্লেন হোডেলের সঙ্গে খেলেন, যিনি ম্যারাডোনার জন্য তার ১০ নম্বর জার্সিটি ছেড়ে দিয়েছিলেন। আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে ম্যারাডোনা টানা চারটি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনা বিজয়ী হয় এবং ১৯৯০ সালে হয় রানার্স-আপ।

১৯৭৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৬ বছর বয়সে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ম্যারাডোনার অভিষেক হয়। ১৯৭৯ সালে ১৮ বছর বয়সে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে ফিফা বিশ্ব যুব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালের ২ জুন স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সিনিয়র দলের হয়ে প্রথম গোল করেন ম্যারাডোনা। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি ফিফা অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপ (১৯৭৯) ও ফিফা বিশ্বকাপ (১৯৮৬) উভয় প্রতিযোগিতায় গোল্ডেন বল জিতেছেন। ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা ছিল ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ। প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী খেলায় ক্যাম্প ন্যু-তে আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় বেলজিয়ামের। কাতালান দর্শকরা তাদের ক্লাব বার্সেলোনায় নতুন যোগ দেওয়া ম্যারাডোনার চমক দেখার জন্য আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু তিনি আশানুরূপ নৈপুণ্য প্রদর্শনে ব্যর্থ হন। দ্বিতীয় পর্বে ইতালি ও ব্রাজিলের বিপক্ষে পরাজিত হয়ে প্রতিযোগিতা থেকে বিদায় নিতে হয় তাদের। প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনার সবকটি খেলায় পুরো সময় মাঠে ছিলেন ম্যারাডোনা।

১৯৮৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ম্যারাডোনা। প্রতিযোগিতার ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় আর্জেন্টিনা। প্রতিযোগিতার পুরোটাজুড়েই ছিল ম্যারাডোনার আধিপত্য। তিনি আর্জেন্টিনার প্রতিটি খেলায় পুরোটা সময়ই মাঠে ছিলেন। পুরো প্রতিযোগিতায় তিনি পাঁচটি গোল করেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করান আরও পাঁচটি। প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম গোল করেন ইতালির বিপক্ষে, গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় খেলায়। কোয়ার্টার-ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নিজেকে কিংবদন্তি হিসেবে প্রমাণ করেন তিনি। প্রতিযোগিতায় আর্জেন্টিনার ১৪টি গোলের ১০টিতেই ম্যারাডোনার অবদান ছিল, গোলপোস্টে আর্জেন্টিনার পুরো দলের নেওয়া মোট শটের অর্ধেকেরও বেশি ছিল তার তৈরি করা। পুরো প্রতিযোগিতাজুড়ে ছিল তার দাপট। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের আতঙ্কের কারণ ছিলেন তিনি। প্রতিযোগিতা শেষে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ম্যারাডোনাকে গোল্ডেন বল পুরস্কার দেওয়া হয়। তাকে একক প্রচেষ্টায় বিশ্বকাপ জয়ী হিসেবে ব্যাপকভাবে গণ্য করা হয়। তার প্রতি সম্মান জানিয়ে স্তাদিও অ্যাজতেকা কর্তৃপক্ষ স্টেডিয়ামটির সামনে ম্যারাডোনার গোল অব দ্য সেঞ্চুরির একটি প্রতিমূর্তি নির্মাণ করেছে।

১৯৯০ বিশ্বকাপে আবার আর্জেন্টিনার অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন ম্যারাডোনা। কিন্তু গোড়ালির ইনজুরির কারণে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের মতো নৈপুণ্য তিনি দেখাতে পারেননি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা শুধু দুটি খেলায় মাঠে নামেন। এর মধ্যে গ্রিসের বিপক্ষে তিনি একটি গোল করেন। ড্রাগ টেস্টে এফিড্রিন ডোপিংয়ের কারণে তাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়। নিজের আত্মজীবনীতে ম্যারাডোনা ওই টেস্ট সম্পর্কে বলেন, তার ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক তাকে এনার্জি ড্রিংক রিপ ফুয়েল দেওয়ার কারণে তিনি ড্রাগ টেস্টে ধরা পড়েছেন। ফিফা তাকে

১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করে এবং আর্জেন্টিনাও দ্বিতীয় পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের পর ম্যারাডোনার ১৭ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে।

২০০০ সালে ফিফা ম্যারাডোনাকে শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত করে। ২০১০ সালের ২২ মার্চ লন্ডনের সংবাদপত্র দ্য টাইমস তাকে বিশ্বকাপের সেরা দশ খেলোয়াড়ের তালিকায় প্রথম স্থান প্রদান করে। ম্যারাডোনাকে ক্রীড়া জগতের সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সংবাদ হিসেবে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গের অন্যতম মনে করা হতো। তারপরও শত বিতর্ক ছাপিয়ে ম্যারাডোনা তার শৈল্পিক ফুটবলের জন্য বিশ্বের কোটি কোটি ভক্তের হƒদয়ে বেঁচে থাকবেন চিরকাল, তরুণ ফুটবলারদের জন্য হয়ে থাকবেন আদর্শ।

সহকারী কর্মকর্তা, ক্যারিয়ার অ্যান্ড প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস বিভাগ

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়