বিদেশিদের উদ্বুদ্ধ করতে অর্থনৈতিক কূটনীতিকে প্রাধান্য দিচ্ছে সরকার

বিনিয়োগ সম্মেলন উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কূটনীতির মাধ্যমে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব। আমরা ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছি দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এসব অঞ্চল রপ্তানি বৃদ্ধি করবে। কর্মসংস্থান হবে। বিনিয়োগকারীদের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার অর্থনৈতিক কূটনীতি ও যোগাযোগকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

গতকাল প্রধানমন্ত্রী দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন বাংলাদেশ ২০২১ উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন। রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বিনিয়োগ সম্মেলনটির আয়োজন করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। বেলা ১০টায় শুরু হওয়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগের জন্য অবকাঠামো, পুঁজিবাজার ও ফাইন্যান্স, সেবা, তথ্য-প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, উৎপাদন, চামড়া, স্বয়ংক্রিয় ও হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ, পাট-বস্ত্র ও ব্লু-ইকোনমি মিলিয়ে ১১টি খাত চিহ্নিত করেছি। আমি আশা করি, এ সম্মেলনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা এসব খাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্যিক অগ্রাধিকার চুক্তি মুক্তবাণিজ্য চুক্তি ও সমন্বিত অর্থনৈতিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের কাজ করে যাচ্ছি। ইতোমধ্যে ভুটানের সঙ্গে পিটিএ সই করেছি। বাংলাদেশ বিশ্বে ৩৮টি দেশে একতরফা শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পাচ্ছে। ৩৬টি দেশের সঙ্গে দ্বৈত করার্পণ পরিহার চুক্তি বলবৎ আছে। আমার বিভিন্ন বাণিজ্য জোটের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। বাংলাদেশের প্রতি আস্থার ফলে সাত শতাংশেরও বেশি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে পুনর্বিনিয়োগের মাধ্যমে। আমরা জাতীয় শিল্পনীতিসহ খাত অনুযায়ী শিল্প নীতিমালা প্রণোয়ন করেছি। শ্রম আইন ২০১৮ প্রণয়ন করেছি। প্রতিটি প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টিকে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। রপ্তানিমুখী শিল্পের বৃদ্ধির জন্য বন্ড ব্যবস্থাপনাকে অটোমেশন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ৩৯টি হাই-টেক পার্ক নির্মাণ করেছি। পর্যায়ক্রমে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল আমরা গড়ে তুলছি। অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহে ২৭ দশমিক শূন্য সাত বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব পেয়েছি। মীরসরাই, সোনাগাজী, সীতাকুণ্ডু উপজেলায় বঙ্গবন্ধু শিল্পনগর গড়ে তুলেছি। আড়াইহাজারে জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চলে এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে।’

‘আমরা বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আইন প্রণয়ন করেছি এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করেছি। বর্তমানে ৬৯টি পিপিপি প্রকল্পে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রস্তাব বাস্তবায়নের অপেক্ষায়’ বলে উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৯ সাল থেকে ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ৩৫টি সংস্থার ১৫৪টি বিনিয়োগ সংস্থার সেবা অনলাইনে প্রদানের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা এসডিজি প্রোগ্রেস অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। আমরা প্রায় ৯৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছি। আমাদের ১২ কোটির বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানবসম্পদ সৃষ্টির মাধ্যমে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আহরণের প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি। ২০২৫ সালের মধ্যে পাঁচ বিলিয়ন ডলারে আইটি পণ্য রপ্তানি করার লক্ষ্য আমরা স্থির করেছি।’

তিনি বলেন, ‘মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছি, পদ্মা সেতু নির্মাণকাজ প্রায় সমাপ্তির পথে, যা আমরা স্ব-অর্থায়নে করেছি। ঢাকায় মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, সৈয়দপুর বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমানবন্দরে রূপান্তর, কক্সবাজারে আরও একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ, চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল, মাতারবাড়ী ও পায়রায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।’

আমাদের অর্থনীতির আকার এখন ৪১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৬ দশমিক পাঁচ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু আয় ২৫৫৪ মার্কিন ডলার। আমরা ডেল্টা শতবর্ষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’

এ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ বিশ্বের ১৫টি দেশের দুই হাজার ৩৩৫ জন নিবন্ধন করেছেন। গতকাল দিনব্যাপী পাঁচটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। দুই দিনব্যাপী সম্মেলনটি শেষ হবে আজ সোমবার। এর আগে ২০১৬ সালে ঢাকায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এবারের সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকসহ (এআইআইবি), আইএফসি ও বৈশ্বিক অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা উপস্থিত থাকার পাশাপাশি অনলাইনে অংশ নেন।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন   ❑ পড়েছেন  ৯৬৪  জন  

সর্বশেষ..