প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিদেশে বাংলাদেশিদের বিনিয়োগ

গত বুধবার অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে স্থানীয় বেসরকারি শিল্পোদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপকে মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগের ব্যাপারে যে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, সেটি সুখবর বৈকি। এটি স্থানীয় উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। ১৯৪৭ সালের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশনের বিধি মোতাবেক বাংলাদেশ থেকে বিদেশে বিনিয়োগ বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন। দ্বারটি উম্মোচিত হয় ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় ওই রেগুলেশনে সামান্য পরিবর্তন এনে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া হয়। অবশ্য সুযোগটি এখনও অবাধ এবং সবার জন্য অবারিত নয়। আকিজ গ্রুপকে বিদেশে বিনিয়োগের অনুমোদনের পাশাপাশি নানা শর্ত জুড়ে দেওয়ার খবরও রয়েছে। সত্যি বলতে, বিদেশে বিনিয়োগে যেসব প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখাচ্ছে, বাছাই করে তাদের মধ্য থেকে অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। প্রক্রিয়াটিকে অবশ্য ইতিবাচকভাবেই দেখতে চান অনেকে। কেননা এর সঙ্গে প্রাথমিকভাবে ‘ক্যাপিটাল ফ্লাইট’সহ নানা ইস্যু যুক্ত; যদিও উদারপন্থি অর্থনীতিবিদদের ধারণা পুঁজি পাচার ঠেকাতেও বিদেশে বিনিয়োগের পথ উম্মুক্ত করা দরকার। আমরা মনে করি, এ দুই মতই অধিকতর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

বাংলাদেশি একাধিক শিল্প গ্রুপ বিদেশে বিনিয়োগ করতে চাইছে তা ইতিবাচক এ দৃষ্টিকোণ থেকে যে, তার মানে আমাদের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে বিদেশের ময়দানে প্রতিযোগিতা গড়ে তোলার। বলার অপেক্ষা রাখে না, যত বেশি বাংলাদেশি কোম্পানি বিদেশে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করবে, ততই উজ্জ্বল হবে দেশের মুখ। পাশাপাশি এমন বিনিয়োগের সুবাদে দেশে আসবে বৈদেশিক মুদ্রা ও উন্নত প্রাযুক্তিক জ্ঞান। ফলে যেসব উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ী বিদেশের মাটিতে পা ফেলেছেন কিংবা ফেলতে চাইছেন, তাদের খুব সতর্ক থাকা উচিত যেন তাদের কোনো কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন না করে। তাদের নিশ্চয়ই স্মরণ রয়েছে, বিদেশে বিনিয়োগের বেলায় সংশ্লিষ্ট দেশের আইনকানুন অনুসরণ করতে হবে এবং পাশাপাশি শ্রদ্ধা রাখতে হবে বাংলাদেশি আইনের প্রতি। এদিক থেকে বিদেশে বাংলাদেশি উদ্যোক্তা কর্তৃক বিনিয়োগে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জের বৈকি। এর মোকাবিলায় কেবল উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী নন, বাংলাদেশ সরকারেরও তদারকি অব্যাহত রাখা উচিত। খেয়াল রাখতে হবে, বিদেশে কার্যপরিচালনারত বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো যেন কোনোরকম অনভিপ্রেত ব্যবসায়িক অনুশীলনে জড়িয়ে না পড়ে। এক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা কম। ফলে উভয় তরফেই ভুলভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক। প্রথমত চেষ্টা থাকতে হবে, ভুল যথাসম্ভব কম করার। দ্বিতীয়ত, ভুল হয়ে গেলে দ্রুত সেটা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশি দূতাবাসগুলো প্রায়ই দেশের উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের খোঁজ নেয় না; ‘ঝামেলা’য় পড়লে যা করার ব্যবসায়ীদেরই করতে হয়। আমরা আশা করি, এমন প্রবণতা দূরীকরণে কার্যকর উদ্যোগ নেবেন নীতিনির্ধারকরা। ইতোমধ্যে তা নেওয়া না হলে শিগগিরই নেওয়া হোক, নইলে এর ফল শুভ হওয়ার কথা নয়। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জনবল রফতানির অভিজ্ঞতা এখানে স্মরণযোগ্য। উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ-কাঠামো বজায় না রেখে একটা সময় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির। শুরুর কয়েকটা বছর কাজটি যে ভালোভাবে চলেনি, সেটা বলা যাবে না। প্রথম দিকে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সুনামের সঙ্গেই জনশক্তি রফতানি করেছে সেখানে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে একশ্রেণির প্রতিষ্ঠানের অপচর্চা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছিল যে, মালয়েশিয়া সরকার এখান থেকে জনশক্তি আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। পরে অনেক দেনদরবার করে সরকার নিজে উদ্যোগী হলে মালয়েশিয়া ‘জিটুজি’ পদ্ধতিতে আবার জনশক্তি আমদানি শুরু করে। আমরা আশা করি, বিদেশে পুঁজি বিনিয়োগের বেলায় তেমন কিছু ঘটবে না। তা যেন আসলেই না ঘটে, সে ব্যাপারে সরকার ও উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ী সবাইকে সতর্ক থাকতে বলব আমরা।