সম্পাদকীয়

বিদ্যুতের ক্যাপাসিটি চার্জের লাগাম টানা আবশ্যক

দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ নিয়ে একপ্রকার সিদ্ধান্তহীনতা লক্ষণীয়। কখনও নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। আবার বেসরকারি খাতে স্থাপিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। গত এক দশকে শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ থেকেই প্রচুর আয় করেছে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। সরকারের নীতি হচ্ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত থেকে ভর্তুকি পুরো তুলে নেওয়া। অথচ সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাব সাদা চোখেই প্রতিভাত হচ্ছে।

গতকাল শেয়ার বিজে প্রকাশিত ‘বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনা: এক দশকে ক্যাপাসিটি চার্জ ৫৯ হাজার ৬১২ কোটি টাকা’ শীর্ষক প্রতিবেদন নতুন করে সামনে এনেছে। খবরে বলা হয়, ২০০৯ সালের পর থেকেই বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। আবার মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পরও বেশ কয়েকটি রেন্টাল-কুইক রেন্টাল কেন্দ্রের চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। আর এ বিদ্যুৎ কেনায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) প্রতি বছর মোটা অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় আমাদের উচিত বিদ্যুতের চাহিদা ও পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো ক্রমেই বন্ধ করা এবং মাস্টারপ্ল্যান জরুরিভাবে পর্যালোচনা করা। চলতি বছরের প্রথম দিকে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘গত ১০ বছরে সরকার বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিয়েছে ৫২ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।’ আবার গত বছরের শেষে একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো গত ১০ বছরে উঠিয়ে নিয়েছে ৫১ হাজার ১৫৭ কোটি টাকা। অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য পিডিবি ক্যাপাসিটি চার্জ ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এ খাতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় তা ম্লান করে দেয়। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য সরকারের বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকার একদিকে কম দামে জ্বালানি সরবরাহ করছে, অন্যদিকে বেশি দামে কিনছে বিদ্যুৎ। সেই বিদ্যুৎ আবার ভোক্তার কাছে সরকার বিক্রি করছে অর্ধেকেরও কম মূল্যে। এভাবে কেনাবেচার মধ্য দিয়ে বছরে মোটা অঙ্কের অর্থ গচ্চা দিচ্ছে সরকার। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল) চালু রাখতে সরকার রাষ্ট্রীয় অর্থ লোকসান দিচ্ছে বলেই অভিযোগ।

জনদুর্ভোগ কমাতে বিদ্যুৎ চুরির পাশাপাশি অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে হবে। নতুন সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালন ও বিতরণ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ব্যবহার ব্যবস্থাপনা উন্নত করে সাশ্রয়ী হতে হবে। গত ছয় বছরে প্রায় ৬২ হাজার কোটি টাকা বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া দিয়েছে সরকার। এসব কেন্দ্রের পূর্ণ সক্ষমতা তো দূরে থাক, ৩০ শতাংশও চালানো সম্ভব হয়নি। শ্বেতহস্তী পালনের চেয়ে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..