প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

বিদ্যুতে ভর্তুকি বকেয়া পড়েছে ২২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা

তহবিল সংকট

ইসমাইল আলী: কয়েক বছর ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়েই চলেছে। কিন্তু বিদ্যুতের দাম সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) লোকসান বাড়ছে। এজন্য বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণও বাড়ানো হচ্ছে। গত অর্থবছর রেকর্ড পরিমাণ লোকসান করে পিডিবি। এর বিপরীতে রেকর্ড ভর্তুকিও বরাদ্দ রাখে সরকার। তবে ভর্তুকি ছাড় করছে না অর্থ মন্ত্রণালয়।

সরকারের কাছে ভর্তুকি বাবদ প্রায় ২২ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা পাওনা বকেয়া হয়ে গেছে পিডিবির। এর প্রভাব পড়েছে সংস্থাটির আর্থিক অবস্থার ওপর। বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়েছে তারা। ফলে বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল নিয়মিত পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি। সংস্থাটির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এতে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছর পিডিবিকে ভর্তুকি দেয়া হয় ১১ হাজার ৭৭৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা। তবে ছাড় করা হয়েছিল ছয় হাজার ৩৫২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ফলে ওই অর্থবছর ভর্তুকি বাবদ বকেয়া জমে পাঁচ হাজার ৪২৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। আর গত অর্থবছর পিডিবিকে ভর্তুকি দেয়া হয় ২৯ হাজার ৬৫৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। তবে ছাড় করা হয়েছে ১২ হাজার ৮০০ কোটি চার লাখ টাকা। ফলে বকেয়া পড়েছে ১৬ হাজার ৮৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

পিডিবির হিসাব বিভাগের মতে, গত অর্থবছর ছাড়কৃত ভর্তুকির মধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য রয়েছে বকেয়া পাঁচ হাজার ৪২৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। আর গত অর্থবছর নিট ভর্তুকি ছাড় হয়েছে সাত হাজার ৩৭৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছর শেষে ২২ হাজার ২৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ভর্তুকি বকেয়া রয়ে গেছে। আর দুই অর্থবছর মিলিয়ে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ দেয়া হয় ৪১ হাজার ৪৩৬ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। তবে ছাড় হয়েছে ১৯ হাজার ১৫২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

পিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত ফেব্রুয়ারির পর থেকে ভর্তুকির অর্থ নিয়মিত ছাড় করছে না অর্থ মন্ত্রণালয়। এতে বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়েছে পিডিবি। অর্থ ছাড়ের যে অবস্থা তাতে বকেয়া জমে থাকা ২২ হাজার ২৮৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ছাড় হতে হতে চলতি অর্থবছর শেষ হয়ে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে নেয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সূত্র জানায়, পিডিবি নিজস্ব কেন্দ্রে উৎপাদনের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের রেন্টাল ও আইপিপি (ইন্ডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) থেকে বিদ্যুৎ কেনে। এছাড়া সরকারি অন্যান্য কোম্পানির কেন্দ্র থেকেও বিদ্যুৎ কেনা হয়। তবে ভর্তুকি ছাড় না করায় বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিল বকেয়া পড়েছে। সব মিলিয়ে পাঁচ মাসে (মে-সেপ্টেম্বর) পিডিবির বকেয়া বিল জমেছে ৩৩ হাজার ৩৩৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে মে ও জুন মাসের বকেয়া ১০ হাজার ১৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা

পিডিবির তথ্যমতে, চলতি বছর মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ এবং অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় (ভিওএমপি) বাবদ বকেয়া পড়েছে আট হাজার ৮১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। আর জ্বালানি বিল বকেয়া পড়েছে ২৪ হাজার ৫১৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের বিল বকেয়া ১৯ হাজার ৩৩৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, কয়লার বিল তিন হাজার ১৩৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা, গ্যাস বিল এক হাজার ৮৯১ কোটি ৩১ লাখ টাকা এবং সৌর বিদ্যুতের বিল ১৬০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, মে মাসের কিছু বিল পরিশোধ করেছে পিডিবি। তবে এখনো ওই মাসের ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ভিওএমপি বকেয়া রয়েছে এক হাজার ২৩৩ কোটি সাত লাখ টাকা এবং জ্বালানি বিল বকেয়া পড়েছে এক হাজার ৭০৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। একইভাবে জুনের ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ভিওএমপি বকেয়া ছিল এক হাজার ৭৭০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা এবং জ্বালানি বিল বকেয়া পড়েছে পাঁচ হাজার ৩০৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের ক্যাপাসিটি চার্জ ও ভিওএমপি বাবদ বকেয়া পড়েছে যথাক্রমে এক হাজার ৮৫৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, এক হাজার ৯৫২ কোটি ৪৬ লাখ টাকা এবং দুই হাজার কোটি টাকা। আর জ্বালানি খরচ বাবদ ওই তিন মাসের বকেয়া যথাক্রমে পাঁচ হাজার ৬৬১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, পাঁচ হাজার ৯৪৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা এবং পাঁচ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এ হিসাবে মে মাসে বিল বকেয়া রয়েছে দুই হাজার ৯৪০ কোটি ৪১ লাখ টাকা, জুনের সাত হাজার ৭৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, জুলাইয়ের সাত হাজার ৫২১ কোটি ১৪ লাখ টাকা, আগস্টের সাত হাজার ৮৯৭ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং সেপ্টেম্বরের সাত হাজার ৯০০ কোটি টাকা।

পিডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, গত অর্থবছর পিডিবির লোকসান হয় ৩১ হাজার আট কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৫০৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে লোকসান বেড়েছে ১৯ হাজার ৪৯৯ কোটি ২০ লাখ টাকা বা ১৬৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছর লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে যাচ্ছে। প্রথম দুই মাসেই (জুলাই ও আগস্ট) পিডিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় আট হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। অথচ ২০১৯-২০ অর্থবছরে (পুরো বছরে) লোকসান ছিল মাত্র সাত হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এভাবে লোকসান বাড়লে আর ভর্তুকি ছাড় না করলে উৎপাদন কার্যক্রম চালানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।