দিনের খবর প্রচ্ছদ প্রথম পাতা

বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ভর্তুকি সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা

২০১৯-২০ অর্থবছর

ইসমাইল আলী: গত অর্থবছর জুন শেষে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৯৬৬ মেগাওয়াট। যদিও এ সক্ষমতার মাত্র ৪২ শতাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। বাকি (৫৮ শতাংশ) সময় কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রাখা হয়। এর পরও গত অর্থবছর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) লোকসান গুনেছে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। আর এ ঘাটতি পূরণে পিডিবিকে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা।

এদিকে উচ্চ দামে কিনে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় গত এক দশকে পিডিবির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ২১০ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে পিডিবিকে ঋণ দেওয়া হয়েছে ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। পাশাপাশি গত তিন অর্থবছর ধরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে সরকার। এ তিন বছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।

তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে পিডিবির গড় ব্যয় কিছুটা কমেছে। এ সময় সংস্থাটির গড় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় দাঁড়ায় পাঁচ টাকা ৮৫ পয়সা, আগের অর্থবছর যা ছিল পাঁচ টাকা ৯৫ পয়সা। আর এ বিদ্যুৎ বিক্রির পাইকারি (বাল্ক) মূল্য ছিল চার টাকা ৮৪ পয়সা। এতে গত অর্থবছর পিডিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় সাত হাজার টাকা।

যদিও গত অর্থবছর পিডিবিকে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে সাত হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। এতে লোকসান পুষিয়ে এই প্রথম প্রায় ৫০০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে সংস্থাটি। এদিকে গত অর্থবছর বেসরকারি খাতে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়েছে ১০ হাজার ৮৫২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। অথচ এ সময় বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল মাত্র ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত অর্থবছর বেসরকারি কেন্দ্রগুলো বসিয়ে রাখা হয় ৬১ শতাংশ সময়।

এদিকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পিডিবির লোকসান ছিল আট হাজার ১৪১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। সংস্থাটির ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ লোকসান। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৩১০ কোটি ১৫ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছিল পিডিবি। আর গত ১০ বছরে সংস্থাটির পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬৩ হাজার ২১০ কোটি ২০ লাখ টাকা।

সূত্রমতে, উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনে লোকসান করলেও ঘাটতি মেটাতে এত দিন ঋণ দেওয়া হতো পিডিবিকে। তবে ২০১৭-১৮ অর্থবছরই পিডিবিকে প্রথমবারের মতো ৯৫৬ কোটি ২০ লাখ টাকা ভর্তুকি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। এর পরের অর্থবছর রেকর্ড ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে পিডিবিকে। এর পরিমাণ সাত হাজার ৯৬৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এতে তিন বছরে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আসার পর বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ায় গত অর্থবছর লোকসান কমেছে বলে মনে করছেন পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, সরবরাহ বাড়ায় সামিট মেঘনাঘাট এবং চট্টগ্রামের শিকলবাহা ও রাউজান কেন্দ্র দুটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। আগে এসব কেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো ডিজেল। এ তিনটি কেন্দ্রের প্রভাবে সার্বিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। তবে জটিলতা তৈরি হয়েছে ডিজেলচালিত নতুন এক হাজার মেগাওয়াটের ছয়টি কেন্দ্র নিয়ে। এসব কেন্দ্রের জন্য লোকসান আশানুরূপ কমেনি।

যদিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিডিবির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে ডিজেলচালিত এক হাজার মেগাওয়াটের কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এখন এসব কেন্দ্র বছরের বেশিরভাগ সময় বসিয়ে রাখা হচ্ছে। এর পরও কেন্দ্রগুলোর জন্য উচ্চ ক্যাপাসিটি চার্জ গুনতে হচ্ছে। দ্বৈত জ্বালানিভিত্তিক না হওয়ায় এসব কেন্দ্রে গ্যাসে উৎপাদনেরও কোনো সুযোগ নেই। ফলে এ কেন্দ্রগুলোর বোঝা কমপক্ষে আরও তিন বছর টানতে হবে।

পিডিবির তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে চার হাজার ৪৩৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা লোকসান দিয়েছিল পিডিবি। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসান ছিল তিন হাজার ৮৭৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সাত হাজার ২৮২ কোটি ৯৯ লাখ, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ছয় হাজার ৮০৯ কোটি ২৫ লাখ, ২০১২-১৩ অর্থবছরে পাঁচ হাজার ৪৩ কোটি ৮৪ লাখ, ২০১১-১২ অর্থবছরে ছয় হাজার ৬৯৩ কোটি ৩৪ লাখ ও ২০১০-১১ অর্থবছরে চার হাজার ৬২০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।

যদিও তার আগের দুই অর্থবছর পিডিবির লোকসান ছিল অনেক কম। এর মধ্যে ২০০৯-১০ অর্থবছরে সংস্থাটি লোকসান গুনে ৬৩৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ও ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৮২৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। তবে সে সময় বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল খুবই কম।

এদিকে ঘাটতি মেটাতে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতি বছর ঋণ নিতে হয়েছে পিডিবিকে। এতে সরকারের কাছে পিডিবির ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৩৭১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ঋণ। এর মধ্যে বাজেটারি সহায়তা বাবদ দেওয়া হয়েছে ৪৩ হাজার ১৬০ কোটি ১২ লাখ টাকা। আর সরকারি ঋণ আট হাজার ২১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। আবার এ ঋণের ওপর তিন শতাংশ সুদও দাবি করছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

যদিও লোকসানের কারণে ঋণ পরিশোধ না করে তা ভর্তুকিতে রূপান্তরের জন্য বরাবরই প্রস্তাব দিয়ে আসছে পিডিবি। প্রতিবারই বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণাতে সরকারের প্রতি এ আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭-১৮ অর্থবছর প্রথম ভর্তুকি দেওয়া শুরু করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

বিপুল ঋণের চাপ সামাল দিতে পিডিবিকে প্রদত্ত পুরো ঋণ মওকুফ বা ভর্তুকিতে রূপান্তরে বিকল্প নেই বলে মনে সংস্থাটির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, পিডিবির পুঞ্জীভূত ঋণ মওকুফ চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আলোচনা চলছে।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..