সম্পাদকীয়

বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ভর্তুকি প্রদান অগ্রহণযোগ্য

আধুনিক সভ্যতার প্রধানতম অনুষঙ্গ বিদ্যুৎ। বর্তমান বিশ্বে বিদ্যুৎবিহীন একটি দিনও কল্পনা করা যায় না। বিদ্যুৎই সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল চালিকাশক্তি। কাজেই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও এর সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া আবশ্যক। বাংলাদেশও সেটি করেছে। কিন্তু অগ্রাধিকারের সুযোগে অর্থের অপচয় কোনোভাবেই কাম্য নয়। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাতে এমন অপচয় চলছে বলেই প্রতীয়মান হয় দৈনিক শেয়ার বিজে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে।

পত্রিকাটিতে গতকাল ‘২০১৯-২০ অর্থবছর: বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ভর্তুকি সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকা’ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করায় প্রতি বছরই লোকসান গুনতে হয় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)। আর সেই লোকসান গুনতে প্রতি বছরই সরকারকে বিপুল অঙ্কের অর্থ ভর্তুকি দিতে হয়। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে এভাবে ভর্তুকি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এ কথা অনস্বীকৃর্য যে, গত ১০ বছরে দেশে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। নানামুখী উদ্যোগের ফলে প্রায় শতভাগের কাছাকাছি জনগোষ্ঠীর কাছে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। শিল্প-কারখানায়ও বিদ্যুৎ প্রাপ্তি সহজতর হয়েছে। কিন্তু এসবের বিনিময়ে নিশ্চয় এ খাতে অর্থ অপচয়ের বিষয়টিকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত হবে না।

এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, দেশের জনগণের কষ্টার্জিত অর্থেই দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। একসময় দেশের বাজেট ছিল অনেকাংশেই অনুদান-নির্ভর। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ এখন স্বাবলম্বী হয়েছে। এখন বিপুল অঙ্কের বাজেট প্রণয়নের জন্য কোনো উন্নয়ন সহযোগীর কাছে হাত পেতে বসে থাকতে হয় না। দেশের মানুষের টাকায়ই বাজেট বাস্তবায়ন অনেকাংশে সম্ভব হয়ে উঠেছে। কাজেই যাদের অর্থে এমন উন্নয়ন সাধিত হচ্ছে, দিন শেষে তাদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা আবশ্যক বলে মনে করি।

১০ বছর আগে বিদ্যুৎ খাতে যে ভঙ্গুর পরিস্থিতি ছিল, এখন আর তা নেই। সে সময় জরুরি প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে বিদ্যুৎ খাতে আগ্রাসী বিনিয়োগ দরকার ছিল। তাই বেসরকারি খাতকে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে উৎসাহিত করতে নানা ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কালের পরিক্রমায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। বর্তমানে দেশে বিদ্যুতের যে চাহিদা, তার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি। তাই যেসব কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি, সেগুলোর কার্যক্রম ধীরে ধীরে সংকুচিত করা উচিত। বিদ্যুতের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা অনেক বেশি। তাই এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয় বলে মনে করি। কারণ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মুনাফার চিন্তা করে বিনিয়োগ করে। আর সরকারের প্রধান উদ্দেশ্য জনকল্যাণ। জনকল্যাণের লক্ষ্যেই বেসরকারি খাতকে বিদ্যুতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়েছিল। আর এখন জনগণের করের টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্যেই ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বেসরকারি খাত নির্ভরতা কমিয়ে ভর্তুকির বোঝা হালকা করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করি।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..