সম্পাদকীয়

বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ান

২০০৯ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত সময়ে দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও এর সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়ানো হয়নি সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন। ফলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও কোনো কোনো সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে। তাতে বেড়ে উঠছে জনভোগান্তি ও অর্থনীতির ক্ষতি। এর মধ্য দিয়ে নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতাই স্পষ্ট হয়। গতকাল প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে আমরা উল্লেখ করেছিলাম, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ থাকলেও এর বিতরণ এবং এ-সংশ্লিষ্ট সেবার মনোন্নয়ন ঘটানো না গেলে ব্যবহারকারীদের ভোগান্তি কমবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা চাইবো, সক্ষমতার সঙ্গে সংগতি রেখে বাড়ানো হোক সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন। এজন্য যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেটাও সরকারের কাছে প্রত্যাশা করি। তাহলে বিদ্যমান সমস্যার কিছুটা হলেও সমাধান হবে।

বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী শেয়ার বিজকে বলেছেন, স্বাভাবিকভাবেই দ্বিগুণ থাকতে হয় বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণ সক্ষমতা। বর্তমানে এটা রয়েছে সমান সমান। পুরোনো হয়ে গেছে বেশ কিছু লাইন। এজন্য সেগুলো নিতে পারছে না বাড়তি লোড। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণে দৃষ্টি দেওয়া হলে বর্তমান সমস্যার সূচনা হতো বলে মনে হয় না। আমরা আশা করবো, এ পরিস্থিতি সচেতন ও সতর্ক হতে সহায়তা করবে নীতিনির্ধারকদের। অনুন্নত বিতরণ ব্যবস্থার কারণে বেড়ে ওঠে বিদ্যুতের অদক্ষ ব্যবহারও। অপচয়ও হয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এমন কার্যক্রম ঠেকাতেও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। স্বল্প সময়ে এক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হবে না। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েই এগোতে বলবো সংশ্লিষ্টদের। বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে উৎপাদন ও আমদানি বৃদ্ধির যেসব প্রকল্প ও প্রচেষ্টা বিদ্যমান, সেগুলোর বাস্তবায়ন হলে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে বলে মনে হয় না।

বস্তুত বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও রয়েছে বিদ্যুৎসেবার বাইরে। তাদের সিংহভাগের বাস গ্রামে। বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্ক কাছে না থাকায় শহরবাসীর তুলনায় তাদের খরচ করতে হয় অনেক বেশি অর্থ। এটা জোগানোর সামর্থ্য যাদের নেই, বিদ্যুৎসেবার বাইরে থাকতে হচ্ছে তাদের। আমরা জানি, ২০২১ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। গ্রামের বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কহীন অঞ্চলে এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন অনেকটা সহজ হবে। এজন্য যে বিপুল অর্থ প্রয়োজন কোন উৎস থেকে তা জোগান দেওয়া হবে, সে ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নীতিনির্ধারকদের কাছে আমরা চাইব।

বলা বাহুল্য, ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের এলাকাভেদে আঘাত হানে মাঝেমধ্যে। সামান্য ঝড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়তে দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে। প্রাকৃতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও বিদ্যুৎহীনতা থেকে শিগগির মুক্তি মেলে না। শহর-গ্রাম নির্বিশেষে বিতরণ ব্যবস্থা কতটা নাজুক, তা বোঝার জন্য এ উদাহরণই যথেষ্ট। অনুন্নত বিতরণ ব্যবস্থাপ্রসূত লোডশেডিংয়ে প্রতিবছর মোট জাতীয় উৎপাদন (জিডিপি) কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সংগত কারণে সে বিষয়ে গবেষণা দরকার। কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের এ ইস্যুতে এরই মধ্যে গবেষণা করেছে কি না, আমাদের জানা নেই। এ ব্যাপারে হালনাগাদ তথ্য থাকলে গুরুত্ব উপলব্ধি করা সহজ হবে সংশ্লিষ্টদের জন্য। এজন্য বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও এ খাতে বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রয়োজনীয় গবেষণাও এখানে কার্যক্রম পরিচালনাকারী দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে আমরা প্রত্যাশা করি। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দেশের শতভাগ মানুষকে এর আওতায় আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা যে সচেষ্ট, তাতে সন্দেহ নেই। পরিকল্পনাগত দুর্বলতা ও অদূরদর্শিতার যেসব চিত্র এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে শিগগির পদক্ষেপ নেওয়া না হলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না।

 

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..