দিনের খবর প্রচ্ছদ শেষ পাতা

বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান

শেয়ার বিজ ডেস্ক: বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণভবন থেকে গতকাল ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, আটটি ৩৩/১১ কেভি জিআইএস উপকেন্দ্র এবং ১০টি উপজেলায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমার অনুরোধ থাকবে যারা বিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন তারা সাশ্রয়ী হোন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যেন নষ্ট না হয়। বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হলে বিলটাও কম আসবে, সেটা মাথায় রাখতে হবে। কাজেই প্রত্যেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হবেন, সাশ্রয়ী হবেন। আমরা কিন্তু যত টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করি তার চেয়ে অর্ধেকের কম দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যাচ্ছি। বিদ্যুতে এভাবে ভর্তুকি দেওয়া ঠিক নয়। তারপরও মানুষের কল্যাণে, মানুষের সুবিধার জন্য আপনারা বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হবেন সেই আশা করছি।’
সরকারে আসার পর বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আইন করার কথা অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা রাস্তাঘাট, অবকাঠামোগত উন্নয়ন করি। সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎটা অত্যন্ত জরুরি। বিদ্যুৎ যখন গ্রামে-গঞ্জে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায় তখন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। আমাদের লক্ষ্য প্রতিটা গ্রামে উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে দেওয়া আর বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন করা। আমরা কিন্তু সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘প্রতিটা উপজেলা যেন সম্পূর্ণভাবে বিদ্যুৎ পায় সেজন্য আমরা ঘোষণা দিয়েছি, যেন মানুষের মধ্যে একটা উৎসাহ আসে। শতভাগ বিদ্যুৎ ধীরে ধীরে বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলা, উপজেলা থেকে ইউনিয়নে পৌঁছে যাবে, সেটা আমরা পৌঁছাতে পারব।’
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নে তার সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে গ্যাস বিক্রির জন্য এক সময় চাপ আসার কথাও বলেন শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, ‘আগে গ্যাসের স্বল্পতা ছিল। গ্যাস বিক্রি করার জন্য ২০০১ এ আমাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ ছিল। গ্যাস আমাদের। আমরাই ১৯৯৬ সালে সরকারে এসে আন্তর্জাতিক টেন্ডার দেই। বিদেশিরা এসে গ্যাস উত্তোলন কাজ শুরু করে। সেই সময় চাপ এলো যে গ্যাস বিক্রি করতে হবে। দেশের মানুষের চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত গ্যাস থাকলে সেটা বিক্রি করব এ নীতি নিয়ে আমি ছিলাম। কিন্তু বিএনপি তখন এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল, তারা ক্ষমতায় এলে গ্যাস বিক্রি করবে। যেহেতু আমি রাজি হইনি, তার খেসারত দিতে হয়েছে ২০০১ সালে আমরা ক্ষমতায় আসতে পারিনি।’
আমাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস নেই এবং এলএনজি এনে চাহিদা মেটানো হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের চাহিদা মোতাবেক গ্যাস নেই। এখন এলএনজি আমদানি করে চাহিদা মেটাচ্ছি। সঙ্গে আমরা গ্যাস অনুসন্ধান করছি। কূপ খনন করা হচ্ছে, কোথাও পাচ্ছি; কোথাও পাচ্ছি না।’
বিদ্যুৎ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকে আমরা সরকারে আছি। আজ আমরা প্রায় ৯৩ শতাংশ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে পেরেছি। উৎপাদনও আমরা ২২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বাড়াতে সক্ষম হয়েছি। সঞ্চালনও বাড়িয়েছি।’ ৯৬ সালে তার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর বিভিন্ন সেক্টরের মতো বিদ্যুৎ সেক্টরের উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা উদ্যোগ নিয়েছিলাম বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে মানুষের ঘরে ঘরে আলো জ্বালানোর। মনে আছে আমরা তখন পেয়েছিলাম মাত্র এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। বলতে গেলে সব জায়গায় অন্ধকারাচ্ছন্ন।’
তিনি বলেন, ‘পাঁচ বছরে আমরা এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট থেকে চার হাজার ৩০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করে যাই। ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার সময় বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ আমরা শুরু করে গিয়েছিলাম।’ পরে বিএনপি সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘২০০১ এ আমরা সরকারে আসতে পারলাম না। এর আগে আমরা অনেকগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রেখে গিয়েছিলাম। ২০০১ এ যারা ক্ষমতায় এসেছিল তাদেরও একটা লক্ষ্য ছিল কীভাবে নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবে। দুর্নীতি, মানিলন্ডারিং, স্বজনপ্রীতি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস সেই দিকে তাদের দৃষ্টি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যে কাজগুলো শুরু করে গিয়েছিলাম সেগুলোও তারা যদি সম্পন্ন করত তাহলে আরও মানুষ আলো পেত। ২০০৮-এর নির্বাচনে জয়ী হয়ে আমরা যখন ক্ষমতায় আসলাম, তখন দেখলাম বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে সেটা তিন হাজার ২০০ মেগাওয়াটে নেমে গেছে।’ মানুষের চাহিদা মেটানোর জন্য, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য, প্রতি ঘরে ঘরে আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য, দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য যে ব্যাপক কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
গ্রিড লাইন, যেখানে গ্রিড লাইনে সম্ভব নয় সেখানে সোলারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ যখন গ্রামে-গঞ্জে পৌঁছে যায় তখন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মানুষ ঘরে বসে নিজেরাই অনেক কাজ করতে পারে। প্রত্যেকটা এলাকায় কিন্তু উন্নতি হয়। আমাদের লক্ষ্য শুধু রাজধানীকে উন্নত করা নয়। প্রতি গ্রামকে উন্নত করা।’
ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ কিনছি। জলবিদ্যুতের জন্য আমরা ভারত, ভুটান, নেপাল প্রত্যেকের সঙ্গে আলোচনা করছি। ইতোমধ্যে আমরা ভারতের কাছ থেকে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা কিনছি।’ বিদ্যুতের জন্য ভুটান ও নেপালে বিনিয়োগ করতে সরকারের চিন্তা-ভাবনা এবং এ নিয়ে চলমান আলোচনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, গতকাল বাঘাবাড়ি ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, জামালপুর ১১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, বগুড়া ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র, কাপ্তাই সাত দশমিক চার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। আর শতভাগ বিদ্যুতায়িত নতুন ১০ উপজেলা হলো দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট, চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ, জয়পুরহাটের জয়পুরহাট সদর, আক্কেলপুর, পাঁচবিবি, রাজশাহীর পবা, নারায়ণগঞ্জ জেলার নারায়ণগঞ্জ সদর, রূপগঞ্জ, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর, নোয়াখালীর কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জের গোদলাইলে লক্ষ্মীনারায়ণ কটন মিল, মণ্ডলপাড়া, দাপা (ফতুল্লা), নন্দলালপুর, রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে হসপিটাল/কলোনি, মুগদাপাড়া হসপিটাল, বনশ্রী, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত ১১টি গ্রিড উপকেন্দ্র উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে বিভিন্ন এলাকা থেকে গণভবনে সংযুক্ত থাকা কর্মকর্তা ও উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন।
গণভবন প্রান্তে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান।

সর্বশেষ..