Print Date & Time : 2 July 2022 Saturday 10:16 am

বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে না ১১ হাজার শিল্প-কারখানা: বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন

ইসমাইল আলী: গত সাত বছরে দেশের বিদ্যুৎ খাতে অগ্রগতি হয়েছে যথেষ্ট। এ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় আড়াইগুণ হয়েছে। সর্বোচ্চ উৎপাদন বেড়ে হয়েছে তিনগুণ। তবে শিল্প খাতে বিদ্যুতের সংযোগ বাড়েনি আশানুরূপ। এমনকি আবেদনের পর বছর পেরিয়ে গেলেও অনেক সময় মেলে না কাক্সিক্ষত সংযোগ। বর্তমানে এ সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ১১ হাজার। আবেদন করেও বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে না এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংযোগ না পাওয়ায় বসে আছে এসব শিল্প-কারখানা। আবার ক্যাপটিভ সংযোগ বন্ধ থাকায় বিকল্প কোনো উপায়েও উৎপাদনে যেতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। অথচ ব্যাংক ঋণের সুদ গুনতে হচ্ছে নিয়মিত। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা।

শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে সম্প্রতি বৈঠক করে বিদ্যুৎ বিভাগ। বৈঠকে জানানো হয়, প্রতি মাসে বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য অপেক্ষমাণ (পেন্ডিং) আবেদনের সংখ্যা বাড়ছে। জুলাইয়ে শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য অপেক্ষমাণ কারখানার সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ হাজার ৫০০। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৮০০তে। অক্টোবরে অপেক্ষমাণ বিদ্যুৎ সংযোগের তালিকা আরও বেড়ে ১১ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

এর মধ্যে ঢাকা ও আশপাশের এলাকা এবং বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকার শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য অপেক্ষমাণ তালিকার সংযোগসংখ্যা তুলনামূলক কম। তবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্প-কারখানায় বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষমাণ শিল্প-কারখানার সংখ্যা অনেক বেশি।

তথ্যমতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) কাছে শিল্প-কারখানায় বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষমাণ কোম্পানি রয়েছে ৪৫টি। রাজধানীর একাংশ ও আশপাশের এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ঢাকা ইলেকট্রিক পাওয়ার সাপ্লাই কোম্পানির (ডেসকো) কাছে অপেক্ষমাণ এ সংখ্যা ৫০। আর ঢাকা বিভাগ ও বৃহত্তর চট্টগ্রাম এলাকার বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) কাছে আবেদন পড়ে আছে ২৯টি।

শিল্প-কারখানার বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য সবচেয়ে বেশি অপেক্ষমাণ রয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ওজোপাডিকো) কাছে। খুলনা ও বরিশাল বিভাগ এবং বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় বিদ্যুৎ বিতরণের দায়িত্বে থাকা এ কোম্পানির কাছে ছয় হাজার ৯৩৭টি আবেদন সংযোগের জন্য পড়ে আছে। আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আবেদন জমা আছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (পবিবো) কাছে। সংস্থাটির কাছে তিন হাজার ৯৪৮টি আবেদন জমা আছে।

সব মিলিয়ে ১১ হাজার ৯টি শিল্প-কারখানা বিদ্যুৎ সংযোগ পাচ্ছে না। এসব প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ সংযোগ দিলে প্রায় ৫০ মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। এর বাইরে পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য ৪৮৭টি প্রতিষ্ঠান অপেক্ষমাণ রয়েছে। ছাড়পত্র পাওয়ার পর এসব শিল্প-কারখানায়ও বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে হবে।

জানতে চাইলে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ শেয়ার বিজকে বলেন, বর্তমানে নিয়মিত শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। তবে চাহিদার তুলনায় এ সংখ্যা কম। ফলে বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষমাণ শিল্প-কারখানার সংখ্যা বাড়ছে। তবে সব শিল্প-কারখানায় দ্রুত বিদ্যুৎ পৌঁছে দিতে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়। এজন্য দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সূত্রমতে, বিদ্যুতের জন্য অপেক্ষমাণ শিল্প-কারখানার সংখ্যাই শুধু বাড়ছে না, সংযোগের জন্য অপেক্ষার সময়ও বাড়ছে। আগে তিন থেকে চার মাসে এ সংযোগ পাওয়া গেলেও এখন তাতে এক বছরের বেশি সময় লাগছে। বর্তমানে শিল্প খাতে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানে বিলম্বের ক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার ওপরে বাংলাদেশের অবস্থান। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ ধরনের কালক্ষেপণের কারণে বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

সংস্থাটির ‘ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট-২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, নতুন শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগ পেতে বাংলাদেশে প্রায় ৪০৪ দিন তথা এক বছর দুই মাসের মতো সময় লাগে। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ সংযোগের আবেদনের পর মাত্র এক মাস ১৭ দিনে সংযোগ পাওয়া যায়। এছাড়া শ্রীলঙ্কায় তিন মাস ১০ দিন (১০০ দিন), পাকিস্তানে সাত মাস (২১৫ দিন), নেপালে দুই মাস ১০ দিন (৭০ দিন), থাইল্যান্ডে ৩৭ দিন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় মাত্র ১৮ দিনে নতুন সংযোগ পান শিল্প-কারখানা মালিকরা।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, দুর্নীতি, ঘুষ এবং সুশাসন ও জবাবদিহিতার অভাবই বিদ্যুৎ সংযোগ বিলম্বের জন্য মূলত দায়ী। উৎপাদন সক্ষমতা বড়লেও ঘুষ নেওয়ার প্রবণতা থেকে বের হতে পারছেন না আমলারা। এজন্য নানা অজুহাত ও নথিপত্র চাওয়া হয়। এগুলো সঠিকভাবে জমা দেওয়া হলে প্রক্রিয়াগত বিভিন্ন অজুহাত তোলা হয়। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক সময় কাছাকাছি বিদ্যুৎ সংযোগ লাইন না থাকার কথা বলেও বিলম্ব করা হয়। তবে ঘুষ দেওয়া হলে শিল্প-কারখানায় অনেক দ্রুত মেলে সংযোগ।

প্রসঙ্গত, উৎপাদন ঘাটতির কারণে ২০১০ সালের নভেম্বরে শিল্প খাতে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ সীমিত করার নির্দেশ দেয় সরকার। তবে পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায় গত বছরের ২৭ আগস্ট তা প্রত্যাহার করা হয়। সে সময় দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদানের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। সর্বশেষ ১০ নভেম্বর ডেসকোর এক অনুষ্ঠানে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে আবেদন পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর নির্দেশ দেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। তবে সে নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি।