দিনের খবর প্রথম পাতা

বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় দেশের ৯৯% জনগোষ্ঠী

ইসমাইল আলী: ২০২১ সালের মধ্যে দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। গত মাসে দেশে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে (নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ) ৯৯ শতাংশ। গত নভেম্বরে এ হার ছিল ৯৮ শতাংশ।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি দেশে বিদ্যুৎ গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন কোটি ৯৪ লাখ। গত নভেম্বরে এ সংখ্যা ছিল তিন কোটি ৮৭ লাখ। আর ২০০৯ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকারের দায়িত্ব গ্রহণকালে বিদ্যুৎ সুবিধাপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর হার ছিল মাত্র ৪২ শতাংশ। আর গ্রাহকসংখ্যা ছিল এক কোটি আট লাখ। অর্থাৎ এক যুগে দেশে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে দুই কোটি ৮৬ লাখ গ্রাহক তথা ৫২ শতাংশ জনগোষ্ঠী।

বিদ্যুৎ সুবিধাভোগীর পাশাপাশি মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্বিগুণ ছাড়িয়ে গেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ২০১৯-২০ অর্থবছর দেশে মাথাপিছু বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫১২ কিলোওয়াট ঘণ্টা। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ২২০ কিলোওয়াট ঘণ্টা। এছাড়া আবাসিকের পাশাপাশি এক যুগের ব্যবধানে দেশে সেচ গ্রাহক বেড়েছে দুই লাখ ১২ হাজার। ২০০৯ সালের শুরুতে এ খাতে গ্রাহক ছিল দুই লাখ ৩৪ হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার লাখ ৪৬ হাজার।

এদিকে ২০০৯ সালে দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল চার হাজার ১৩০ মেগাওয়াট। গত মাস শেষে তা দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৩৯৫ মেগাওয়াট। তবে ক্যাপটিভ দুই হাজার ৮০০ ও অফ-গ্রিড নবায়নযোগ্য উৎস ৩৯৯ মেগাওয়াট যোগ করলে দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৫৯৪ মেগাওয়াট।

সূত্র জানায়, সারাদেশকে শতভাগ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনতে গত ১৪ ডিসেম্বর চিঠি দিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের কোনো পর্যবেক্ষণ বা পরামর্শ থাকলে, তা অবহিত করার অনুরোধ জানিয়ে ওই চিঠি দেয়া হয়।

এতে বলা হয়, “আপনার নির্বাচনী এলাকায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো পর্যবেক্ষণ বা পরামর্শ থাকলে তা যথা শিগগির জানানোর জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিদ্যুৎ খাতে উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত থাকলে অচিরেই ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ, ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ সেøাগানের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।”

জানতে চাইলে নসরুল হামিদ শেয়ার বিজকে বলেন, দেশের শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনতে দ্রুত কাজ করে যাচ্ছে সরকার। এক দিনে আবাসিকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া এক্ষেত্রে অন্যতম উদ্যোগ। এরই মধ্যে ৯৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসে গেছে। বাকিদেরও দ্রুত এ সুবিধার আওতায় আনা হবে। এজন্য প্রত্যেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পরামর্শ চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থাগুলো কাজ করে যাচ্ছে।

তথ্যমতে, গত এক যুগে দেশে ১৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। এগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১৭ হাজার ২৩ মেগাওয়াট। এর মধ্যে ২০০৯ উৎপাদনে আসে ১২টি কেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫৬ মেগাওয়াট। ২০১০ সালে আসে ৯টি কেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৭৭৫ মেগাওয়াট। ২০১১ সালে উৎপাদনে আসে সর্বোচ্চ ২২টি কেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা এক হাজার ৭৬৩ মেগাওয়াট। পরের তিন বছর তা কিছুটা কমে যায়। এর মধ্যে ২০১২ সালে উৎপাদনে আসে ১১টি কেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৯৫১ মেগাওয়াট। ২০১৩ সালে আসে ৭টি কেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৬৬৩ মেগাওয়াট। আর ২০১৪ সালে আসে ৭টি কেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ৬৩৫ মেগাওয়াট।

পরের বছরগুলোয় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে ২০১৫ সালে ৭টি কেন্দ্র উৎপাদনে আসে, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা এক হাজার ৩৫৭ মেগাওয়াট। ২০১৬ সালে আসে ৮টি কেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা এক হাজার ১৩২ মেগাওয়াট। আর ২০১৭ সালে উৎপাদনে আসে ৭টি কেন্দ্র, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা এক হাজার ১৮৭ মেগাওয়াট।

২০১৮ সালে ২০টি কেন্দ্র উৎপাদনে আসে, যেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা রেকর্ড তিন হাজার ৭৬৩ মেগাওয়াট। পরের বছর তা কমে দুই হাজার ৪০৪ মেগাওয়াট। আর কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ১৬টি। এছাড়া করোনার মাঝেও ২০২০ সালে ৭টি কেন্দ্র উৎপাদনে আসে, যেগুলোর সক্ষমতা এক হাজার ১৭১ মেগাওয়াট। আর চলতি বছর জানুয়ারি মাসে ২৬৬ মেগাওয়াট সক্ষমতার দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে।

যদিও উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও বিদ্যুৎ চাহিদা সে অনুপাতে বাড়েনি। ফলে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ উৎপাদনও সক্ষমতার চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে দেশে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয় চার হাজার ২৯৬ মেগাওয়াট, ২০১০ সালে চার হাজার ৬৯৯ মেগাওয়াট, ২০১১ সালে পাঁচ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট, ২০১২ সালে ছয় হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট, ২০১৩ সালে ছয় হাজার ৬৭৫ মেগাওয়াট, ২০১৪ সালে সাত হাজার ৪১৮ মেগাওয়াট, ২০১৫ সালে আট হাজার ১৭৭ মেগাওয়াট, ২০১৬ সালে ৯  হাজার ৩৬ মেগাওয়াট, ২০১৭ সালে ৯ হাজার ৫০৭ মেগাওয়াট, ২০১৮ সালে ১১ হাজার ৬২৩ মেগাওয়াট, ২০১৯ সালে ১২ হাজার ৮৯৩ মেগাওয়াট ও ২০২০ সালে ১২ হাজার ৮৯২ মেগাওয়াট।

উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি গত এক যুগে দেশে বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতাও বেড়েছে। এর মধ্যে গত মাসে দেশে গ্রিড উপ-কেন্দ্র ক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ২৩৪ এমভিএ। ২০০৯ সালের শুরুতে তা ছিল ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ। আর বর্তমানে দেশে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার কিলোমিটার। ২০০৯ সালে এর পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার। এছাড়া বর্তমানে দেশে সঞ্চালন লাইন দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৪৭ সার্কিট কিলোমিটার। ২০০৯ সালে এর পরিমাণ ছিল আট হাজার সার্কিট কিলোমিটার।

উল্লেখ্য, বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণ লোকসান তথা সিস্টেম লস ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে বিদ্যুৎ বিতরণে সিস্টেম লস ছিল ১৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে আট দশমিক ৭৩ শতাংশ।

প্রিন্ট করুন প্রিন্ট করুন

সর্বশেষ..